সরকার কি এক ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে চলেছে?

সরকার কি এক ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে চলেছে

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে, যেখানে বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই আলোচনায় উঠে এসেছে সংবিধান, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।

সংবিধান ও নির্বাচন: এক জটিল সমীকরণ

আলোচনায় একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে যে, সংবিধানে যে ধরনের নির্বাচনের কথা বলা নেই, সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কতটা যৌক্তিক ছিল। বিশেষ করে, গণভোটের প্রস্তাব যখন বিএনপির তরফ থেকেই এসেছিল এবং তা মেনে নেওয়ার পর সেখান থেকে সরে আসার সুযোগ থাকে না। সবাই যখন একটি সাধারণ বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কোনো কিছু মেনে নেয়, তখন তা থেকে পিছিয়ে আসা কঠিন।

আজ হয়তো সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে, যদি কখনো বিরুদ্ধ শক্তি বা বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে, তখন কেউই নিরাপদ থাকবে না। কারণ, বর্তমান সংবিধানের মধ্যে অনেকের জন্যই কোনো সুরক্ষা নেই।

রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর নির্ভরতা: একটি ক্ষণস্থায়ী কৌশল?

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রশাসনকে ব্যবহার করে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সরকার যিনি হয়েছিলেন, তিনি শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর নির্ভর করে তিনি টিকে ছিলেন। কিন্তু এই ধরনের নির্ভরতা কতদিন টিকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর নির্ভর করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা ভবিষ্যতে সহজ নাও হতে পারে। যারা এই ক্ষমতা উপভোগ করবে, শুধু তারাই নয়, যারা এতে সহায়তা করবে, তারাও এর পরিণতির ভাগীদার হবে। সুতরাং, পরিস্থিতি বেশ কঠিন।

আইনগতভাবে সংবিধান পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও, বেআইনিভাবে ক্ষমতা দখল করে দেশ চালানো যেতে পারে। যেহেতু একটি দল টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কারো উপর নির্ভর করতে হবে না। এর ফলে তারা যা খুশি তাই করতে পারবে। অতীতে এমন ঘটনার পরিণতি কখনোই ভালো হয়নি।

রাজনৈতিক সংস্কার: কার ক্ষতি, কার লাভ?

রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই সংস্কারগুলো দেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। সাধারণ জনগণ বা বিরোধী দলের এতে কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষতিটা আসলে হয়তো তাদেরই, যারা বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন এবং ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে চান। সংবিধান যেভাবে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রেখেছে, সংস্কার হলে সেই ক্ষমতা ভাগ হয়ে যাবে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী দুইবারের বেশি একই ব্যক্তি হতে পারবেন না, দলনেতা ও দলপ্রধান একসাথে থাকতে পারবেন না—এই ধরনের বিষয়গুলো সংস্কারের আওতায় আসতে পারে।

যদি রাষ্ট্র ও জনগণের কথা ভাবা হয়, তাহলে এই সংস্কারে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু যারা শুধু নিজেদের স্বার্থ দেখছে, তারাই এর বিরোধিতা করছে।

নতুন প্রজন্মের ভাবনা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

আজকের তরুণ প্রজন্মকে আমাদের গ্রহণ করা উচিত। তারা যদি ভুল পথে চালিত হয়, তবে তার দায় আমাদেরই। তাদের শুরুতেই বাদ দিয়ে দেওয়া বা তাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। অনেকেই তাদের চাঁদাবাজ, দেশের ধ্বংসকারী বা ষড়যন্ত্রকারী বলে আখ্যায়িত করে। কিন্তু তারা আন্দোলন করেনি বা বেআইনি কাজ করেছে, এটা বলে তাদের বাদ দিলে চলবে না।

যদি কোনো সরকার আন্দোলন বা ছাত্রদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়, তবে পরবর্তী সরকারও সেই আন্দোলনেরই ফসল। আর সেই সরকারের অধীনে হওয়া নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই, আজকের সরকার যদি বেআইনিভাবে ক্ষমতায় আসে, তবে তারাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিরোধী দলের উত্থান ও সংসদীয় বিতর্ক

জামাত এবং বিএনপি মিলে যে জোট করেছে, সেখানে জামাতের এককভাবে মাত্র তিনটি আসন পাওয়ার পর বিএনপির সাথে জোট করে ১৪ বা ১৮টি আসন পাওয়া একটি বড় উন্নয়ন। তাদের প্রায় ৫২-৫৩টি আসনে জয়লাভ এবং ৩১ শতাংশ ভোট পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, ভোটাররা দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থার বাইরে তৃতীয় একটি শক্তি দেখতে চেয়েছিল।

এই ভোটাররা এখন বিরোধী দলকে সমর্থন করবে। বিরোধী দল হয়তো সংসদ থেকে তাদের যাত্রা শুরু করতে চাইছে। আশা করা যায়, সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা চলতে থাকবে। যদি টু থার্ড মেজরিটির কারণে সবাইকে উপেক্ষা করা হয়, তবে তা অতীতের সরকারের মতোই হবে। আমরা চাই না সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক।

সংবিধানের সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা তত্ত্ববধায়ক সরকারের কোনো বিধান নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে, এমন কথাও বলা নেই। সংবিধানে বলা আছে, সংসদ ভেঙে গেলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু যদি কোনো কারণে নির্বাচন না হয়, তবে আরও ৯০ দিন সময় পাওয়া যাবে। এর বাইরে, যখন মন চায় তখন নির্বাচন করার কোনো সুযোগ সংবিধানে নেই।

এইসব বিষয় বিবেচনা করলে, গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার করে তার মধ্যে প্রবেশ করা উচিত। অন্যথায়, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কাজ করা হবে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে যেকোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু সংবিধানের ৭ এর ‘খ’ অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রথম ভাগের কিছু বিষয় পরিবর্তন করা যাবে না। যেমন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সবখানে থাকা। এটি পরিবর্তন করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে এবং যারা সহায়তা করবে তারাও এর ভাগীদার হবে। সুতরাং, পরিস্থিতি বেশ কঠিন। আইনগতভাবে সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না, কিন্তু বেআইনিভাবে ক্ষমতা চালানো যেতে পারে।

Leave a Comment

Scroll to Top