শুভ নৃসিংহ চতুর্দশী হলো ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার শ্রী নৃসিংহ দেবের আবির্ভাব তিথি। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে এই পুণ্য তিথিটি পালিত হবে ৩০শে এপ্রিল, বৃহস্পতিবার। এই দিনে উপবাস থেকে শুদ্ধ চিত্তে নৃসিংহ দেবের আরাধনা, প্রণাম মন্ত্র পাঠ এবং পরের দিন সঠিক নিয়মে পারন করে ব্রত ভঙ্গ করলে জীবনের সকল ভয়, বাধা ও পূর্বজন্মের পাপ দূর হয়। নিচে এই ব্রত পালনের সম্পূর্ণ নিয়ম, মাহাত্ম্য এবং প্রয়োজনীয় মন্ত্রসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
নৃসিংহ অবতার কাহিনী
ভগবান বিষ্ণু তাঁর পরম ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে এবং অহংকারী দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে বধ করতে নৃসিংহ অবতার ধারণ করেন। হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার বরে মানুষ, দেবতা, পশু বা অস্ত্রে অবধ্য ছিলেন। তাই ভগবান অর্ধেক নর এবং অর্ধেক সিংহ রূপ ধারণ করে, গোধূলি লগ্নে, মন্দিরের চৌকাঠে নিজের তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে দৈত্যকে বিদীর্ণ করেন। এটিই হলো বিখ্যাত নৃসিংহ অবতার কাহিনী, যা যুগে যুগে ভক্তদের মনে অগাধ ভক্তি ও সাহসের সঞ্চার করে।
নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত মাহাত্ম্য
শ্রী নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত পালন করার অনেক আধ্যাত্মিক এবং জাগতিক উপকারিতা রয়েছে:
- ভয় ও বাধা মুক্তি: নৃসিংহ দেব হলেন বিপদের পরম ত্রাণকর্তা। এই ব্রত পালনে অকাল মৃত্যু, গ্রহ দোষ ও যে কোনো প্রকার ভয় দূর হয়।
- পাপ নাশ: শাস্ত্র মতে, এই তিথিতে উপবাস থেকে আরাধনা করলে পূর্বজন্মের সকল পাপ মোচন হয়।
- বিশুদ্ধ ভক্তি লাভ: ভক্ত প্রহ্লাদের মতো একনিষ্ঠ ভক্তি ও ভগবানের অহৈতুকী কৃপা লাভ করা যায়।
- শত্রু নাশ: জীবনের নেতিবাচক শক্তি এবং দৃশ্য-অদৃশ্য শত্রুদের থেকে সুরক্ষা মেলে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে শুভ নৃসিংহ চতুর্দশী কবে?
- তারিখ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার।
- তিথি: বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশী তিথি।(বিঃদ্রঃ: স্থানীয় পঞ্জিকা ও ইসকন (ISKCON) ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তিথির শুরু ও শেষের সময়ে কয়েক মিনিটের তারতম্য হতে পারে, তবে বাংলাদেশে মূল ব্রতের উপবাস ৩০ এপ্রিল পালিত হবে।)
নৃসিংহ চতুর্দশী পালনের নিয়ম
নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত পালনের নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করতে হয়। নিচে ধাপে ধাপে তা দেওয়া হলো:
- সঙ্কল্প ও স্নান: ভোরে ঘুম থেকে উঠে গঙ্গা স্নান বা শুদ্ধ জলে স্নান করে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করুন এবং দিনব্যাপী ব্রতের সঙ্কল্প করুন।
- উপবাস: এই দিনে সারাদিন নির্জলা বা অন্তত অন্ন-জল ত্যাগ করে উপবাস থাকতে হয়। যারা শারীরিক কারণে নির্জলা থাকতে পারেন না, তারা ফল, দুধ বা অনুকল্প প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন।
- পূজার প্রস্তুতি: সন্ধ্যায় (গোধূলি লগ্নে, যখন নৃসিংহ দেব আবির্ভূত হয়েছিলেন) পূজার আয়োজন করুন। ফুল, চন্দন, তুলসী পাতা ও ঘৃত প্রদীপ দিয়ে ভগবানকে সাজান।
- মন্ত্র পাঠ ও স্তব: নৃসিংহ দেবের প্রণাম মন্ত্র, নৃসিংহ দেবের অষ্টোত্তর শতনাম (নৃসিংহ দেবের ১০৮ নাম) এবং নৃসিংহ কবচ পাঠ করুন।
- জাগরণ ও কীর্তন: রাতে ঘুমানোর পরিবর্তে হরিনাম সংকীর্তন, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ ও নৃসিংহ দেবের লীলা শ্রবণ করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
নৃসিংহ দেবের প্রণাম মন্ত্র
পূজা এবং প্রার্থনার সময় ভক্তিভরে এই মন্ত্রটি জপ করতে হবে:
“নমস্তে নরসিংহায় প্রহ্লাদাহ্লাদ-দায়িনে।
হিরণ্যকশিপোর্বক্ষঃ শিলাটঙ্ক-নখালয়ে ॥
ইতো নৃসিংহঃ পরতো নৃসিংহো যতো যতো যামি ততো নৃসিংহঃ।
বহির্নৃসিংহো হৃদয়ে নৃসিংহো নৃসিংহমাদিং শরণং প্রপদ্যে ॥”
নৃসিংহ চতুর্দশী পারন মন্ত্র ও নিয়ম
পরের দিন সকালে (পঞ্জিকার নির্দেশিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে) স্নান সেরে ভগবানকে অন্ন, ডাল বা পঞ্চব্যঞ্জন ভোগ নিবেদন করার পর পারন করতে হয়। ব্রত ভঙ্গের পূর্বে এই নৃসিংহ চতুর্দশী পারন মন্ত্র বা প্রার্থনাটি করুন:
“হে পরম করুণাময় নৃসিংহ দেব, আপনার কৃপায় আমার এই ব্রত সম্পন্ন হলো। আমার সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন এবং আমাকে আপনার চরণকমলে শুদ্ধ ভক্তি প্রদান করুন।”
এরপর নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করে পারন সম্পন্ন করবেন।
নৃসিংহ দেবের ১০৮ নাম বা অষ্টোত্তর শতনাম
শ্রী নৃসিংহ দেবের ১০৮ নাম জপ করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ও শক্তিশালী নাম হলো— ওঁ নৃসিংহায় নমঃ, ওঁ মহাবীরায় নমঃ, ওঁ উগ্রায় নমঃ, ওঁ ভয়াপহারিনে নমঃ, ওঁ বজ্রনখায় নমঃ, ওঁ সর্বতোমুখায় নমঃ ইত্যাদি। পূজার সময় এই নামগুলি জপ করলে মানসিক শান্তি ও অসীম আত্মিক শক্তি লাভ করা যায়।
সাধারন জিজ্ঞাসা
নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত কেন পালন করা হয়?
ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা এবং অত্যাচারী হিরণ্যকশিপুকে বধ করার জন্য ভগবান বিষ্ণু যে শ্রী নৃসিংহ রূপ ধারণ করেছিলেন, সেই পবিত্র আবির্ভাব দিবসটিকে স্মরণ করে এবং ভগবানের কৃপা লাভের আশায় এই ব্রত পালন করা হয়।
নৃসিংহ দেবকে কী ভোগ দেওয়া উচিত?
নৃসিংহ দেবকে সাধারণত তুলসী পাতা সমন্বিত পঞ্চামৃত (দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি), ফলমূল এবং মিষ্টি জাতীয় প্রসাদ (যেমন পানকাম বা শরবত) ভোগ দেওয়া হয়। পারনের দিন সাধারণ অন্ন প্রসাদ নিবেদন করা যায়।
বাংলাদেশে নৃসিংহ চতুর্দশী ২০২৬ কবে?
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ৩০শে এপ্রিল, বৃহস্পতিবার এই পবিত্র তিথি পালিত হবে।
তথ্যসূত্র: ইসকন ক্যালেন্ডার (বাংলাদেশ) ২০২৬, সনাতন পঞ্জিকা এবং বৈদিক শাস্ত্র।
