রিজিকে বরকত লাভের উপায়: যে ভুলগুলো এড়িয়ে না চললে সংসারে শান্তি আসবে না

রিজিকে বরকত লাভের উপায় যে ভুলগুলো এড়িয়ে না চললে সংসারে শান্তি আসবে না

রিজিক হলো বেঁচে থাকার উপকরণ (যেমন: অর্থ, খাবার, সম্পদ), আর ‘বরকত’ (Barakah) হলো সেই উপকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত মানসিক প্রশান্তি, স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা। বর্তমানে আমাদের আয় ও সম্পদ বাড়লেও সংসারে শান্তি নেই, কারণ আমরা শুধু রিজিক চাই, বরকত চাই না। হারাম উপার্জন, ফজরের পর ঘুমানোর অভ্যাস, ঘরে সালামের প্রচলন না থাকা এবং পবিত্রতার অভাবের কারণে জীবন থেকে বরকত হারিয়ে যায়। বরকত ফেরাতে ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া, সূরা ইখলাস পড়া এবং সব কাজ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করা অপরিহার্য।

আধুনিক এই সময়ে আমাদের আয় বেড়েছে, ঘরের আসবাবপত্র বেড়েছে, কিন্তু সংসার থেকে সুখ ও প্রশান্তি যেন অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে। এর পেছনের মূল কারণ হলো, আমরা প্রতিনিয়ত সম্পদের পেছনে ছুটছি, কিন্তু সেই সম্পদে স্থায়িত্ব বা ‘বরকত’ নিশ্চিত করার নিয়মগুলো মেনে চলছি না।

আজকের এই নির্দেশিকায় কোরআন, সুন্নাহ এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে রিজিকে বরকত লাভের উপায়, কারণ এবং দৈনন্দিন জীবনে তা প্রয়োগের বিস্তারিত ধাপগুলো তুলে ধরা হলো।

রিজিক এবং বারাকা (বরকত) কী?

অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, বরকত মানেই শুধু ব্যাংক ব্যালেন্স দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

  • রিজিক (Rizq): এটি হলো একটি উপাদান বা উপকরণ। যেমন- খাবার, টাকা বা চাকরি।
  • বারাকা (Barakah): এটি হলো সেই উপকরণের মাধ্যমে শান্তি লাভ করা। যেমন- অল্প খাবারে ক্ষুধা নিবারণ হওয়া, কোনো রোগব্যাধি না হওয়া বা অল্প আয়ে মাস পার হয়ে যাওয়া।

বরকতের প্রধান ৫টি রূপ:

১. সংখ্যায় বৃদ্ধি পাওয়া।

২. দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব লাভ করা।

৩. মানসিক প্রশান্তি বা ‘সুকুন’ পাওয়া।

৪. কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা।

৫. কঠিন কাজ সহজে সম্পন্ন হওয়া এবং বিপদাপদ থেকে মুক্ত থাকা।

জীবন থেকে বরকত কমে যাওয়ার ৫টি প্রধান কারণ

আমাদের দৈনন্দিন কিছু ভুলের কারণেই অজান্তে সংসার থেকে বরকত চলে যাচ্ছে।

১. সকাল বেলা (ফজরের পর) ঘুমানোর অভ্যাস:

আমাদের সমাজে ফজরের পর ঘুমানোর প্রবণতা অনেকটা মহামারীর রূপ নিয়েছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ১ ঘণ্টা ঘুম শরীরে ৪ ঘণ্টার সমান এনার্জি দেয়। কিন্তু সকাল ৬টার পর প্রতি ১ ঘণ্টার ঘুম শরীরকে ২ ঘণ্টা পরিমাণ ড্যামেজ বা ক্লান্ত করে দেয়। সকালে ঘুমালে শরীর নষ্ট হয় এবং দিনের কাজের বরকত হারিয়ে যায়।

২. হারামে লিপ্ত থাকা ও গোপন গুনাহ:

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে গোপন গুনাহ বা পাপাচার মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গুনাহ সরাসরি মানুষের রিজিক ও বরকতকে ধ্বংস করে দেয়।

৩. ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ না করা:

যেই ঘরে কুকুর, প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্য থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। ফেরেশতা না এলে সেই ঘরে বরকত আসাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৪. পরিবারে সালামের প্রচলন না থাকা:

আমরা বাইরে সবাইকে সালাম দিলেও নিজের ঘরে স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের সালাম দেই না। ঘরে সালাম না দেওয়া বরকত কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ।

৫. অতিরিক্ত বিলাসিতা ও অপচয়:

প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলাসিতা এবং সম্পদ অপচয় করা বরকত নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ।

রিজিকে বরকত ও সংসারে শান্তি আনার কার্যকরী উপায়

সংসারে যদি দারিদ্র্য ও অশান্তি দূর করে স্থায়ী শান্তি আনতে চান, তবে নিচের ৩টি ধাপ নিয়মিত অনুসরণ করুন:

  • ধাপ ১: ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দিনবাইরে থেকে ঘরে ঢোকার সময় কেউ থাকুক বা না থাকুক, ‘বিসমিল্লাহ’ বলে সালাম দিন। কেউ না থাকলে ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে সালাম দিন।
  • ধাপ ২: সূরা ইখলাস পাঠ করুনসালাম দেওয়ার পরপরই মাত্র ৪ আয়াতের ছোট্ট ‘সূরা ইখলাস’ পাঠ করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই আমলটি করলে সেই ঘরে কখনো দারিদ্র্য প্রবেশ করবে না।
  • ধাপ ৩: পবিত্রতা (তাহারাত) বজায় রাখাবিশেষ করে যারা পরিবারের জন্য খাবার রান্না করেন (যেমন- স্ত্রী বা মা), তাদের সব সময় পবিত্র অবস্থায় রান্না করা উচিত। অপবিত্র অবস্থায় তৈরি করা খাবারে বরকত থাকে না, যার প্রভাব পড়ে উপার্জনকারী স্বামীর জীবনেও।

সময় ও কর্মজীবনে বরকত আনার সুন্নাহভিত্তিক রুটিন

সময়ের সঠিক ব্যবহার না করতে পারলে কর্মজীবনে সফলতা আসে না। উদ্যোক্তা বা চাকরিজীবী হিসেবে সফলতা পেতে চাইলে সুন্নাহ মেনে ২৪ ঘণ্টার রুটিন সাজানো উচিত:

  • মাগরিব থেকে দিন শুরু করুন: আরবি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী দিন শুরু হয় সূর্যাস্তের পর। মাগরিবের পর রাতের খাবার খেয়ে নিন এবং পরিবারকে সময় দিন। এতে মানসিক এনার্জি বাড়বে।
  • এশার পর দ্রুত ঘুমানো: এশার নামাজের পর অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ুন।
  • তাহাজ্জুদ ও আধ্যাত্মিক কানেকশন: শেষ রাতে উঠে রবের কাছে প্রার্থনা করুন। দিন শুরু করার আগে স্রষ্টার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করলে সারা দিনের কাজে অভাবনীয় বরকত পাওয়া যায়।
  • ফজর থেকে জোহর (Deep Work): ফজরের পর থেকে জোহর পর্যন্ত সময়টা হলো কাজের মূল সময়। এই সময়ে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পেশাগত কাজ বা ব্যবসা পরিচালনা করুন।
  • পেশা বা ব্যবসায় স্থিরতা (Istiqamat): ঘন ঘন ব্যবসা বা পেশা পরিবর্তন করবেন না। যে কাজে একবার বরকত আসা শুরু করে, তার পেছনে লেগে থাকাই হলো সফলতা বা কারামতের লক্ষণ।

সাধারন জিজ্ঞাসা

১. বরকত লাভের দোয়া বা আমল কী?

সবচেয়ে সহজ আমল হলো যেকোনো কাজ শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা। ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া এবং সূরা ইখলাস পাঠ করা। এছাড়াও আল্লাহর কাছে নির্দিষ্টভাবে রিজিকের পাশাপাশি ‘বরকতের’ জন্য দোয়া করতে হবে।

২. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সাথে রিজিকে বরকতের সম্পর্ক কী?

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো একে অপরের পরিপূরক। স্বামী যদি স্ত্রীকে ধৈর্যের পরীক্ষা হিসেবে নেন এবং স্ত্রী যদি স্বামীকে সম্মান করেন, তবে সংসারে শান্তি বিরাজ করে। স্ত্রীর পবিত্র অবস্থায় ঘরের কাজ ও রান্না করার ওপর স্বামীর উপার্জনের বরকত অনেকাংশে নির্ভর করে।

৩. আধুনিক যুগে সময়ে বরকত পাওয়া যায় না কেন?

আমরা আমাদের দিন শুরু করি সকাল বেলা থেকে, যেখানে সুন্নাহ অনুযায়ী দিন শুরু হওয়া উচিত মাগরিব থেকে। এছাড়া ফজরের পর ঘুমানোর কারণে দিনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টুকু নষ্ট হয়ে যায়, ফলে সময়ে বরকত পাওয়া যায় না।

৪. কোন কোন খাবারে বরকত বেশি থাকে?

কোরআন ও হাদিসের আলোকে জয়তুনের তেল, খেজুর, মধু, দুধ এবং তালবিনা (জবের গুঁড়া দিয়ে তৈরি এক প্রকার স্যুপ)-কে বিশেষভাবে বরকতময় খাবার বলা হয়েছে।

(নোট: এই আর্টিকেলের সকল তথ্য কোরআন, সহীহ হাদিস এবং ইসলামী স্কলারদের গবেষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা পাঠকের বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে সহায়ক।)

Leave a Comment

Scroll to Top