ঈদ উল আযহার নামাজ কীভাবে পড়বেন?
ঈদুল আযহার নামাজ ২ রাকাত এবং তা ৬টি অতিরিক্ত ওয়াজিব তাকবিরের সাথে আদায় করতে হয়। নিচে এর সংক্ষিপ্ত নিয়ম দেওয়া হলো:
- প্রথম রাকাত: ছানা পড়ার পর ইমামের সাথে ৩ বার অতিরিক্ত তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলে হাত কান পর্যন্ত ওঠাতে হবে। প্রথম ২ বার হাত ছেড়ে দিতে হবে এবং ৩য় বার হাত বাঁধতে হবে। এরপর ইমাম সূরা মেলাবেন এবং রুকু-সিজদাহ করবেন।
- দ্বিতীয় রাকাত: ইমাম সূরা মেলানোর পর রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত ৩ বার তাকবির দিতে হবে এবং প্রতিবারই হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে। ৪র্থ তাকবির দিয়ে হাত না উঠিয়ে রুকুতে যেতে হবে। এরপর সাধারণ নামাজের মতো সিজদাহ ও তাশাহহুদ পড়ে সালাম ফেরাতে হবে।
পবিত্র ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য অন্যতম আনন্দের দিন। বছরে মাত্র দুইবার ঈদের নামাজ পড়তে হয় বলে অনেকেই ঈদের নামাজের নিয়ম, তাকবির সংখ্যা বা নিয়ত ভুলে যান।
আপনি যদি ঈদ উল আযহার নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম খুঁজে থাকেন, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্যই। এখানে বাংলাদেশের হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য অত্যন্ত সহজভাবে, ধাপে ধাপে কুরবানীর ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম, নিয়ত এবং সুন্নাহগুলো তুলে ধরা হলো।
ঈদ উল আযহার নামাজের নিয়ত (Niyyat)
যেকোনো ইবাদতের মূল হলো অন্তরের সংকল্প বা নিয়ত। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে আপনি চাইলে আরবি বা বাংলা যেকোনো ভাষায় নিয়ত করতে পারেন।
বাংলায় নিয়ত:
“আমি কিবলামুখী হয়ে এই ইমামের পেছনে ঈদুল আযহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ছয়টি অতিরিক্ত ওয়াজিব তাকবিরের সহিত আদায় করার নিয়ত করছি; আল্লাহু আকবার।”
আরবিতে নিয়ত:
“নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা, রাকাআতাই সালাতি ইদিল আদহা, মাআ সিত্তাতি তাকবীরাতিম ওয়াজিবাতুল্লাহি তাআলা, ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমাম, মুতাওয়াজজিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারীফাতি— আল্লাহু আকবার।”
ধাপে ধাপে ঈদ উল আযহার নামাজ পড়ার নিয়ম
ঈদের নামাজ জামাতের সাথে ঈদগাহে বা মসজিদে আদায় করতে হয়। এটি পড়ার পদ্ধতি সাধারণ নামাজের চেয়ে কিছুটা আলাদা। চলুন ধাপে ধাপে জেনে নিই:
প্রথম রাকাত (First Rakat)
- তাকবিরে তাহরিমা ও ছানা: ইমাম ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নামাজ শুরু করবেন। আপনিও ইমামের সাথে তাকবির বলে হাত বাঁধবেন এবং নিঃশব্দে ‘ছানা’ (সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…) পড়বেন।
- তিনটি অতিরিক্ত তাকবির: ছানা পড়ার পর ইমাম ৩টি অতিরিক্ত তাকবির দেবেন।
- ১ম তাকবির: ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- ২য় তাকবির: আবারও ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- ৩য় তাকবির: ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে এবার হাত নাভীতে বা বুকে (নিয়ম অনুযায়ী) বেঁধে নিন।
- সূরা তিলাওয়াত: এরপর ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা তিলাওয়াত করবেন। আপনি শুধু নীরবে শুনবেন।
- রুকু ও সিজদাহ: সাধারণ নামাজের মতোই রুকু ও দুটি সিজদাহ সম্পন্ন করে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন।
দ্বিতীয় রাকাত (Second Rakat)
- সূরা তিলাওয়াত: দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব প্রথমে সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা তিলাওয়াত করবেন।
- তিনটি অতিরিক্ত তাকবির (রুকুর আগে): সূরা মেলানো শেষ হলে রুকুতে যাওয়ার আগে ইমাম সাহেব আবারও ৩টি অতিরিক্ত তাকবির দেবেন।
- ১ম তাকবির: ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- ২য় তাকবির: ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- ৩য় তাকবির: ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিন।
- রুকুতে যাওয়ার তাকবির: এবার ৪র্থ বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কান পর্যন্ত না উঠিয়ে সরাসরি রুকুতে চলে যান।
- নামাজ শেষ করা: এরপর সিজদাহ সম্পন্ন করে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু), দরূদ শরীফ এবং দুআ মাসুরা পড়ে সালাম ফেরানোর মাধ্যমে নামাজ শেষ করুন।
(বিশেষ নোট: নামাজের পর ইমাম সাহেব দুটি খুতবা দেবেন। ঈদের খুতবা শোনা মুসল্লিদের জন্য ওয়াজিব/অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। খুতবা না শুনে উঠে যাওয়া অনুচিত।)
ঈদুল আযহার দিনের বিশেষ সুন্নাহ ও করণীয়
ঈদুল আযহার দিনে নামাজে যাওয়ার আগে ও পরে বেশ কিছু নবীজি (সা.) এর সুন্নাহ রয়েছে, যা আমাদের পালন করা উচিত:
- কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া: ঈদুল ফিতরে মিষ্টিমুখ করে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও, ঈদুল আযহায় সকালে কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাহ। নামাজ শেষে কুরবানীর গোশত দিয়ে দিনের প্রথম খাবার গ্রহণ করা উত্তম।
- গোসল করা ও উত্তম পোশাক পরা: ঈদের দিন সকালে ভালোভাবে গোসল করে নিজের কাছে থাকা সবচেয়ে সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাকটি পরিধান করা এবং সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করা।
- তাকবিরে তাশরিক পড়া: জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ) পড়া ওয়াজিব।
- আসা-যাওয়ার পথ পরিবর্তন: এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসা।
সাধারন জিজ্ঞাসা
ঈদের নামাজ কত রাকাত?
ঈদের নামাজ মোট ২ রাকাত। এর কোনো আজান বা ইকামত নেই এবং এর আগে-পরে ঈদগাহে কোনো নফল বা সুন্নত নামাজ নেই।
অতিরিক্ত তাকবির কয়টি ও কখন দিতে হয়?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী অতিরিক্ত তাকবির মোট ৬টি। প্রথম রাকাতে সূরা পড়ার আগে ৩টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা পড়ার পর (রুকুতে যাওয়ার ঠিক আগে) ৩টি তাকবির দিতে হয়।
ঈদের নামাজ ছুটে গেলে কী করবেন?
ঈদের নামাজ জামাত ছাড়া একা পড়া যায় না। যদি কোনো কারণে আপনার নামাজ ছুটে যায় বা আপনি জামাতে শরিক হতে না পারেন, তবে কাছাকাছি অন্য কোনো মসজিদে জামাত হলে সেখানে গিয়ে পড়ে নেওয়া উত্তম। অন্যথায় ব্যক্তিগতভাবে ২ বা ৪ রাকাত নফল নামাজ (চাশতের নামাজ) পড়ে নিতে পারেন।
মহিলাদের কি ঈদের নামাজ পড়া ফরজ?
না, মহিলাদের জন্য ঈদের নামাজ পড়া ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তবে কোনো নিরাপদ ঈদগাহ বা মসজিদে মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ পর্দার সাথে আলাদা ব্যবস্থা থাকলে তারা জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
ঈদের নামাজের খুতবা কখন দেওয়া হয়?
জুমার নামাজে খুতবা আগে দেওয়া হলেও ঈদের নামাজে খুতবা দেওয়া হয় নামাজ শেষ হওয়ার পর। এই খুতবা শোনা মুসল্লিদের জন্য ওয়াজিব সমতুল্য।
শেষকথা
ঈদুল আযহা ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর একটি দিন। কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আশা করি এই গাইডের মাধ্যমে আপনি ঈদ উল আযহার নামাজ পড়ার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত এবং সঠিক ধারণা পেয়েছেন। নামাজে যাওয়ার আগে নিয়মগুলো একবার চোখ বুলিয়ে নিলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। আপনার ঈদ হোক আনন্দময় ও ইবাদতে পরিপূর্ণ। ঈদ মোবারক!
(আপনার যদি ঈদের নামাজ সংক্রান্ত আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে নিচের কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। আমরা দ্রুত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।)
