ইসরায়েল কেন বারবার যুদ্ধ বাঁধায়? ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ পরিকল্পনার পেছনের অজানা সত্য

ইসরায়েল কেন বারবার যুদ্ধ বাঁধায় ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ পরিকল্পনার পেছনের অজানা সত্য

ইসরায়েল বারবার যুদ্ধ বাঁধায় মূলত তাদের “গ্রেটার ইসরায়েল” (বৃহত্তর ইসরায়েল) পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য। এই ধারণার মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান সীমানা ছাড়িয়ে মিশর, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এবং সৌদি আরবের কিছু অংশ দখল করে একটি বিশাল ইহুদি রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী নেতারা বিশ্বাস করেন, বাইবেলে বর্ণিত নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ড তাদের প্রতিশ্রুত ভূমি। এই ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যেই তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে বারবার আগ্রাসন ও সামরিক অভিযান চালায়।

‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েল কী?

গ্রেটার ইসরায়েল বা বৃহত্তর ইসরায়েল ধারণাটি জায়নবাদীদের একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় লক্ষ্য। এই ধারণার মূলত দুটি সংস্করণ বা রূপ রয়েছে:

  • ছোট পরিসরে গ্রেটার ইসরায়েল: বর্তমান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সীমানার সঙ্গে দখলকৃত গোলান মালভূমি, পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা যোগ করে যে ভূখণ্ড, তাকেই ছোট পরিসরে গ্রেটার ইসরায়েল বলা হয়।
  • বৃহত্তর পরিসরে গ্রেটার ইসরায়েল: ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেলে বর্ণিত নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত সীমানাই হলো বৃহত্তর গ্রেটার ইসরায়েল। এর মধ্যে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ, সমগ্র ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন, পুরো জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ার বড় অংশ এবং ইরাক ও সৌদি আরবের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত।

কীভাবে ইসরায়েল এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে?

ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেনগুরিয়ন থেকে শুরু করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পর্যন্ত সবাই কৌশলে এই ভূখণ্ড প্রসারের কাজ করে যাচ্ছেন। তারা মূলত নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করেন:

১. সীমিত ভূখণ্ড গ্রহণ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি: শুরুতে আন্তর্জাতিক চাপে অল্প ভূখণ্ড নিয়ে রাষ্ট্র গঠন করলেও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা বাড়িয়ে পরবর্তীতে পুরো এলাকা দখল করা।

২. যুদ্ধের মাধ্যমে সীমানা প্রসার: ইসরায়েল তার জন্মলগ্ন থেকেই যুদ্ধকে সীমানা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ এবং ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে তারা পশ্চিম তীর, গাজা, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান মালভূমি এবং সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয়।

৩. অবৈধ বসতি স্থাপন: দখলকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোতে (যেমন পশ্চিম তীর ও গাজা) প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করা হচ্ছে।

৪. আরব দেশগুলোকে বিভক্ত করা (ইনন পরিকল্পনা): আশপাশের শক্তিশালী আরব দেশগুলোকে (যেমন সিরিয়া, লেবানন, ইরাক) ধর্মীয় বা সম্প্রদায়ভিত্তিক (শিয়া, সুন্নি, কুর্দি, খ্রিস্টান) ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত করে দুর্বল করে দেওয়া, যাতে তারা ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে না পারে।

নেতানিয়াহু এবং বর্তমান সরকারের ভূমিকা

ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তার ডানপন্থী জোট সরকার প্রকাশ্যে গ্রেটার ইসরায়েল ধারণাকে সমর্থন করছে।

  • মানচিত্র বিতর্ক: ২০২৩ সালের মার্চে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এমন একটি মানচিত্রের সামনে বক্তব্য দেন, যেখানে জর্ডান ও পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখানো হয়।
  • ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে অস্বীকার: তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে ফিলিস্তিনি বলে কোনো জনগোষ্ঠী নেই এবং পুরো ভূমির ওপর কেবল ইহুদিদের অধিকার রয়েছে।
  • সামরিক ইউনিফর্মে প্রতীক: সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি সৈন্যদের ইউনিফর্মেও “নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস” মানচিত্রের ব্যাজ দেখা গেছে, যা তাদের বৃহত্তর আগ্রাসনের পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়।

সিরিয়া ও গাজায় সাম্প্রতিক আগ্রাসনের কারণ

২০২৪ ও ২০২৫ সালের ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, গ্রেটার ইসরায়েল এখন আর কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় পরিকল্পনা।

  • সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক সীমানা পেরিয়ে সিরিয়ার ভেতরে ঢুকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করছে এবং “দাউদ করিডর” নামে একটি স্থায়ী প্রভাব বলয় তৈরি করছে।
  • গাজায় হামাসকে পরাজিত করার অজুহাতে মূলত সেখানে স্থায়ী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ চলছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. গ্রেটার ইসরায়েল ম্যাপের মধ্যে কোন কোন দেশ রয়েছে?

বৃহত্তর গ্রেটার ইসরায়েলের ম্যাপে বর্তমান ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ছাড়াও মিশর (সিনাই উপদ্বীপ), পুরো জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, এবং ইরাক ও সৌদি আরবের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২. ইসরায়েল কেন গাজা ও পশ্চিম তীর দখল করতে চায়?

ইসরায়েল গাজা ও পশ্চিম তীরকে তাদের বাইবেল প্রতিশ্রুত ভূমির (ছোট পরিসরে গ্রেটার ইসরায়েল) অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। তাই তারা ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে সেখানে স্থায়ী ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়।

৩. ‘ইনন পরিকল্পনা’ (Yinon Plan) কী?

ইনন পরিকল্পনা হলো ১৯৮২ সালের একটি কৌশলগত ছক, যার মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী আরব রাষ্ট্রগুলোকে (ইরাক, সিরিয়া, লেবানন) ছোট ছোট জাতিগত ও ধর্মীয় ভাগে বিভক্ত করে দুর্বল করে দেওয়া, যাতে ইসরায়েল এই অঞ্চলে একক আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।

৪. নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস (Nile to Euphrates) বলতে কী বোঝায়?

বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত পুরো এলাকাটি ঈশ্বর ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধরদের প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে দিয়েছেন বলে জায়নবাদীরা বিশ্বাস করে এবং তারা এই পুরো ভূখণ্ডটি দখল করতে চায়।

Leave a Comment

Scroll to Top