মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ভেবেছিল খুব দ্রুত ইরানকে পরাজিত করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের প্রথাগত যুদ্ধনীতি পরিবর্তন করে এখন মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, তেল শোধনাগার এবং পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিখুঁত ড্রোন ও সাইবার হামলা চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তির গোপন সহায়তা এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অভাবনীয় রণকৌশলের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বর্তমানে চরম কোণঠাসা। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্মানজনকভাবে পিছু হটার বা পালানোর সব পথ এখন প্রায় বন্ধ।
অপারেশন এপিক ফিউরি এবং ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল
যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ধারণা করেছিল, ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেই হয়তো তাদের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু “অপারেশন এপিক ফিউরি” (Operation Epic Fury) নামের এই যুদ্ধে ইরান অভাবনীয় সামরিক কৌশলের পরিচয় দিয়েছে।
আগের মতো শুধু ইসরাইলকে লক্ষ্য করে প্রথাগত হামলা না চালিয়ে, তেহরান এখন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের সামরিক ছক সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে।
ইরান কীভাবে আক্রমণ চালাচ্ছে?
- মার্কিন মিত্র ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা: কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে ইরান সস্তা কিন্তু অত্যন্ত নিখুঁত ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
- তেল শোধনাগারে আঘাত: জ্বালানি নিরাপত্তাকে টার্গেট করে ইসরাইলের তেল শোধনাগারগুলোকে নিশানা করেছে তেহরান। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের জ্বালানি খাতে আঘাত এলে ইসরাইলও রেহাই পাবে না।
- আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে সাইবার আক্রমণ: সামরিক স্থাপনার বাইরে পশ্চিমা দেশগুলোর বড় বড় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে ইরান, যাতে শত্রুর অর্থনীতির মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেওয়া যায়।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উত্থান ও প্রভাব
অনেকেরই ধারণা ছিল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর ইরান চরম নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগবে। কিন্তু নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যেন পশ্চিমাদের জন্য আগের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। গত ২০ বছর ধরে নিজেকে প্রস্তুত করা এই ধূর্ত নেতা পূর্বের প্রথা ভেঙে আগাম কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই সরাসরি মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ও দুর্বল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোতে আঘাত হানার নির্দেশ দিচ্ছেন।
ইসরাইলের “দাহিয়া নীতি” কেন বুমেরাং হলো?
নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মূল পরিকল্পনা ছিল “প্ল্যান বি” বা ইসরাইলের কুখ্যাত “দাহিয়া নীতি” (Dahiya Doctrine) প্রয়োগ করা। এর মূল লক্ষ্য হলো বেসামরিক জনগণের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে দেশের ভেতরেই সরকারের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দেওয়া।
কিন্তু ইরানে এই নীতি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। হাজার হাজার বোমার আঘাত ইরানকে বিভক্ত করার বদলে গোটা জাতিকে মাতৃভূমি রক্ষায় এক সুতোয় গেঁথে ফেলেছে। পশ্চিমা বিভাজনের রাজনীতি বুঝতে পেরে ইরানিরা এখন নিজেদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত পার্থক্য ভুলে ঢালের মতো ঐক্যবদ্ধ।
পর্দার আড়ালে পরাশক্তি: রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা
এই অসম যুদ্ধে ইরান কিন্তু মোটেও একা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করতে এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় পর্দার আড়াল থেকে রাশিয়া ও চীন ইরানকে সাহায্য করছে। তারা ইরানকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে:
- অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি
- স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা তথ্য
- সাইবার সিকিউরিটি সহায়তা
এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানকে একঘরে করার যে মার্কিন স্বপ্ন ছিল, তা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইরান ও ইসরাইল যুদ্ধে কার ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে? পেন্টাগনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরাইল বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি ডলারের থার্ড (THAAD) ইন্টারসেপ্টর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত মারাত্মকভাবে কমে আসছে।
ইরানের কাছে কি হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে? হ্যাঁ, সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে ইরান এখনো তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর ও অপ্রতিরোধ্য হাইপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করেনি। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল বড় কোনো ভুল করলে এগুলো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।
ইরান কেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোতে সাইবার হামলার পরিকল্পনা করছে? ইরান খুব ভালো করেই জানে যে যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অর্থনীতি পঙ্গু করে দিতে পারলে তারা এমনিতেই পিছু হটতে বাধ্য হবে। তাই সামরিক আঘাতের পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভাঙার ছক কষেছে।
মোজতবা খামেনি কে? মোজতবা খামেনি হলেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা, যিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অত্যন্ত নিখুঁত যুদ্ধকৌশল এবং সমরনীতির কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো বর্তমানে চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে]।
শেষকথা: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের জন্য সম্মানজনকভাবে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ আর খোলা নেই। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু নিজের তৈরি ফাঁদে নিজেই আটকা পড়েছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনকেও এতে টেনে এনেছেন। সংঘাতের এই নতুন সমীকরণে ইরান গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা কেবল মার খেতেই আসেনি, বরং পাল্টা আঘাত কীভাবে ফিরিয়ে দিতে হয় সেই শিল্পটাও তাদের খুব ভালোভাবেই জানা আছে।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
