সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির শত শত অভিযোগ: আসল ঘটনা কী?

সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির শত শত অভিযোগ

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) শত শত দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে বিচারক বদলি ও জামিন বাণিজ্য এবং সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ। দুদক বর্তমানে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই-বাছাই করছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় সদ্য বিদায়ী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) রীতিমত অভিযোগের স্তূপ জমা হয়েছে। অভিযোগের ধরন ও পরিধি এতটাই ব্যাপক যে, তা দেশের সচেতন মহলকে হতবাক করে দিয়েছে। অনেকেই নিজেদের পরিচয় গোপন করে অভিযোগ করলেও, বেশ কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরা সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহ লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন।

পাঠকদের পরিষ্কার ধারণার জন্য নিচে সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলো তুলে ধরা হলো:

কার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ উঠেছে?

  • ড. মুহাম্মদ ইউনূস (সাবেক প্রধান উপদেষ্টা): গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তিনি আয়কর ফাঁকি দেওয়া এবং অবৈধভাবে অর্থ সরানোর উদ্দেশ্যে নিজের নামে আলাদা একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন, যার মূল কাজ পারিবারিক সদস্যদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া। এছাড়া বিদেশেও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে।
  • ড. আসিফ নজরুল (সাবেক আইন উপদেষ্টা): তার বিরুদ্ধে এক ডজনেরও বেশি গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা, উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান ও সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিচারক এবং সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অন্যতম। এছাড়াও ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে এক ভিআইপি আসামিকে এবং গান বাংলা টিভির কর্ণধার কৌশিক হোসেন তাপসকে জামিন করিয়ে দেওয়ার মতো ‘জামিন বাণিজ্য’-এর অভিযোগও উঠেছে।
  • সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা): পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ এবং ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনসহ অন্তত আটটি অভিযোগ জমা পড়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তার স্বামী (সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু)-এর বিপুল সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
  • মো. ফাওজুল কবির খান (সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা): সামিট গ্রুপের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে ‘কমিশন বাণিজ্য’ করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
  • নূরজাহান বেগম (সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা): সরকারি হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি ও ওষুধ কেনাকাটায় টেন্ডার জালিয়াতি এবং পূর্ববর্তী সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।
  • আসিফ মাহমুদ (সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা): সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এই তরুণ নেতার বিরুদ্ধে ওঠা প্রায় ১০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে ঘুষ গ্রহণ, বিদেশে অর্থপাচার এবং বেআইনি ক্রিপ্টোকারেন্সি (বিটকয়েন) লেনদেনের মতো অত্যাধুনিক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
  • মাহফুজ আলম (সাবেক তথ্য উপদেষ্টা): বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়নের ক্ষেত্রে বড় অংকের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে এই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে।

দুদক ও টিআইবি’র পদক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া

এত বড় বড় অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে আসলেই কি এসব দুর্নীতি হয়েছে, নাকি এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে?

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবস্থান:

দুদক জানিয়েছে, তারা প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই-বাছাই করছে। যেহেতু অভিযুক্তদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান বেশ স্পর্শকাতর, তাই প্রাথমিক অনুসন্ধানে যেসব অভিযোগের শক্ত ভিত্তি বা সত্যতা পাওয়া যাবে, কেবল সেগুলোকেই আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় আনা হবে।

টিআইবি’র বক্তব্য:

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট জানিয়েছেন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে যদি আইনের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো কোথায় জমা পড়েছে?

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যান্য উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির লিখিত অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে।

২. ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ কী?

সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মূলত বিচারক ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্য এবং টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালী আসামিদের জামিন করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

৩. আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কত টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে?

সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, অর্থপাচার এবং বিটকয়েন লেনদেনসহ প্রায় ১০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।

৪. এসব অভিযোগ কি প্রমাণিত হয়েছে?

না, অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা যাচাই-বাছাই করছে। ভিত্তি পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য প্রেস (The Press) – সংবাদ প্রতিবেদন

Leave a Comment

Scroll to Top