ফিতরা কত টাকা ২০২৬? ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ নির্ধারিত ২০২৬ সালের ফিতরার হার: সর্বনিম্ন ফিতরা: ১১০ টাকা (গম/আটার ভিত্তিতে) সর্বোচ্চ ফিতরা: ২,৮০৫ টাকা (পনিরের ভিত্তিতে) সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
২০২৬ সালের ফিতরার হার: খাদ্যপণ্যভিত্তিক সম্পূর্ণ তালিকা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন দেশের সব বিভাগের বাজারমূল্য সংগ্রহ করে পাঁচটি খাদ্যপণ্যের ভিত্তিতে ফিতরা নির্ধারণ করেছে। আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো একটি পণ্য বা তার সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করতে পারবেন।
| খাদ্যপণ্য | পরিমাণ | ফিতরার হার |
| গম / আটা | অর্ধ সা’ = ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম | ১১০ টাকা |
| যব | এক সা’ = ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ৫৯৫ টাকা |
| খেজুর | এক সা’ = ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ২,৪৭৫ টাকা |
| কিসমিস | এক সা’ = ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ২,৬৪০ টাকা |
| পনির | এক সা’ = ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম | ২,৮০৫ টাকা |
| বিশেষ দ্রষ্টব্য: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারমূল্যে তারতম্য থাকতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারমূল্যে পরিশোধ করলেও শরীয়াহ অনুযায়ী ফিতরা আদায় হবে। |
ফিতরা কীভাবে নির্ধারণ করা হলো ২০২৬ সালে?
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশন সভাকক্ষে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মাওলানা আবদুল মালেক।
সভায় দেশের সব বিভাগ থেকে সংগৃহীত আটা, যব, খেজুর, কিসমিস ও পনিরের বাজারমূল্যের গড় হিসাব করে এ বছরের ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালের মতো এ বছরও ফিতরার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা কী?
ফিতরা হলো রমজান মাস শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে প্রদেয় একটি ওয়াজিব দান। আরবিতে এটিকে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ‘যাকাতুল ফিতর’ বলা হয়। বাংলাদেশে মানুষ এটিকে সাধারণত ‘ফিতরা’ নামে চেনে।
এই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য দুটো:
- রোজাদারের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হিসেবে পবিত্রতা অর্জন করা
- গরিব ও অসহায় মানুষদের ঈদের দিন আনন্দে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া
কে ফিতরা দেবেন? কার ওপর ওয়াজিব?
ঈদুল ফিতরের দিন সকালে যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবেন, তার ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এই নিসাব হলো সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা বা সমমূল্যের নগদ অর্থ ও ব্যবসাপণ্য। রুপার হিসাবে বর্তমান বাজারে এটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
ফিতরা যাদের পক্ষ থেকে দিতে হবে:
- নিজের পক্ষ থেকে
- নাবালেগ সন্তানদের পক্ষ থেকে
- পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য আলাদাভাবে
নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সব মুসলিমের জন্যই ফিতরা প্রযোজ্য।
ফিতরা কখন দিতে হয়?
ফিতরা দেওয়ার সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের আগে। তবে রমজান মাসে যেকোনো দিন আগেও দেওয়া যায়। ঈদের নামাজের পর দিলে ফিতরা সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় হয় না, বরং নফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে।
সহজ নিয়ম (ধাপে ধাপে):
- রমজানের শেষ দিকে ফিতরার টাকা আলাদা করে রাখুন।
- ঈদের নামাজের আগেই নিজে হাতে বা কোনো বিশ্বস্ত মাধ্যমে পাঠিয়ে দিন।
- প্রতিবেশী বা এলাকার গরিবদের অগ্রাধিকার দিন।
ফিতরা কাকে দেবেন?
ফিতরা সেই সব মানুষদের দিতে হবে যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নন। যারা গরিব বা অভাবী তারাই ফিতরার হকদার।
অগ্রাধিকার যাদের:
- আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে গরিব মানুষ
- প্রতিবেশী
- এলাকার অসহায় মানুষ
যাকাত পাওয়ার যোগ্য ৮টি শ্রেণির মানুষও ফিতরা পাওয়ার যোগ্য।
পরিবারের জন্য মোট ফিতরা কত হবে?
পরিবারের মোট ফিতরার পরিমাণ জানতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা গণনা করুন।
- আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী একটি খাদ্যপণ্য বেছে নিন।
- সেই পণ্যের হার × মোট সদস্য সংখ্যা = মোট ফিতরা।
উদাহরণ (পরিবারে ৫ জন সদস্য):
- গম/আটার ভিত্তিতে: ৫ × ১১০ = ৫৫০ টাকা
- যবের ভিত্তিতে: ৫ × ৫৯৫ = ২,৯৭৫ টাকা
- খেজুরের ভিত্তিতে: ৫ × ২,৪৭৫ = ১২,৩৭৫ টাকা
- পনিরের ভিত্তিতে: ৫ × ২,৮০৫ = ১৪,০২৫ টাকা
যাকাত ও ফিতরার মধ্যে পার্থক্য কী?
অনেকেই যাকাত আর ফিতরা গুলিয়ে ফেলেন। মূল পার্থক্যগুলো এরকম:
যাকাত:
- বার্ষিক সম্পদের উপর নির্ধারিত
- নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর ধরে থাকলে দিতে হয়
- সম্পদের ২.৫% হারে দিতে হয়
ফিতরা (সাদাকাতুল ফিতর):
- রমজান শেষে ঈদুল ফিতরের সাথে সংযুক্ত
- সম্পদ এক বছর থাকার শর্ত নেই
- নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য বা তার মূল্য
বিগত কয়েক বছরে ফিতরার হারের তুলনা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর বাজারদরের ভিত্তিতে ফিতরা নির্ধারণ করে। নিচে বিগত কয়েক বছরের তুলনামূলক হার দেওয়া হলো:
| সাল | সর্বনিম্ন ফিতরা | সর্বোচ্চ ফিতরা |
| ২০২৬ (১৪৪৭ হিজরি) | ১১০ টাকা | ২,৮০৫ টাকা |
| ২০২৫ (১৪৪৬ হিজরি) | ১১০ টাকা | ২,৮০৫ টাকা |
| ২০২৪ (১৪৪৫ হিজরি) | ১১৫ টাকা | ২,৯৭০ টাকা |
| ২০২৩ (১৪৪৪ হিজরি) | ১১৫ টাকা | ২,৬৪০ টাকা |
প্রায়ই জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন
প্রশ্ন: ফিতরা কি নগদ টাকায় দেওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ। খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে তার সমপরিমাণ বাজারমূল্য নগদ টাকায় দেওয়া যায়। বর্তমান যুগে নগদ টাকায় ফিতরা দেওয়াই বেশি প্রচলিত।
প্রশ্ন: সর্বনিম্ন ফিতরা দিলে কি যথেষ্ট হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, সর্বনিম্ন ১১০ টাকা দিলেও শরীয়াহ অনুযায়ী ফিতরা আদায় হবে। তবে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা বেশি দিলে বেশি সওয়াব পাবেন।
প্রশ্ন: শিশুর পক্ষ থেকেও কি ফিতরা দিতে হবে?
উত্তর: হ্যাঁ। পরিবারের কর্তা তার পরিবারের নাবালেগ শিশুসহ সব সদস্যের পক্ষ থেকে ফিতরা দেবেন।
প্রশ্ন: মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইনে ফিতরা পাঠানো যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ। বিশ্বস্ত কোনো সংস্থা বা ব্যক্তির মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন ট্রান্সফারেও ফিতরা পাঠানো জায়েজ।
প্রশ্ন: ফিতরা না দিলে কী হবে?
উত্তর: ফিতরা ওয়াজিব ইবাদত। সামর্থ্য থাকলে না দেওয়া গুনাহ। তাছাড়া রমজানের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতিও পূরণ হয় না।
প্রশ্ন: কোন পণ্যে ফিতরা দেওয়া উত্তম?
উত্তর: আলেমরা বলেন, সামর্থ্য অনুযায়ী যত বেশি দামি পণ্যের হিসাবে দেওয়া যায়, তত বেশি সওয়াব। যারা সচ্ছল, তারা খেজুর, কিসমিস বা পনিরের হিসাবে দিতে পারেন।
প্রশ্ন: ঈদের নামাজের পর ফিতরা দিলে কি হবে?
উত্তর: হাদিস অনুযায়ী, ঈদের নামাজের আগে দিলে তা সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে কবুল হয়। নামাজের পর দিলে সাধারণ নফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে।
প্রশ্ন: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিতরা ২০২৬ কবে ঘোষণা করেছে?
উত্তর: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররমে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির সভায় ২০২৬ সালের ফিতরার হার ঘোষণা করা হয়।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালে সর্বনিম্ন ফিতরা কত?
উত্তর: ২০২৬ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন নির্ধারিত সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা (গম/আটার ভিত্তিতে)।
প্রশ্ন: ফিতরার নিসাব কত?
উত্তর: ঈদের দিন সকালে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে ফিতরা ওয়াজিব। রুপার নিসাব হিসাবে এটি বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
প্রশ্ন: ফিতরা দেওয়ার সঠিক নিয়ম কী?
উত্তর: ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য আলাদাভাবে নিসাবমুক্ত গরিব মুসলমানকে ফিতরা দেওয়াই সঠিক নিয়ম।
উপসংহার
ফিতরা শুধু একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, এটি সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। ২০২৬ সালে সর্বনিম্ন মাত্র ১১০ টাকায় ফিতরা আদায় করা সম্ভব।
তাই সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করুন এবং ঈদের নামাজের আগেই গরিব মানুষের হাতে পৌঁছে দিন। এতে আপনার রোজার পরিপূর্ণতা আসবে এবং সমাজের অসহায় মানুষেরাও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারবেন।
তথ্যসূত্র
- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- প্রথম আলো, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- একাত্তর টিভি, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- দেশ রূপান্তর, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
| Disclaimer: এই আর্টিকেলটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের ভিত্তিতে তৈরি। সকল তথ্য ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নিশ্চিত করা হয়েছে। |
