দেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও উদ্বেগের শেষ নেই। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০টি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম ও তাদের কাছে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
এই আর্টিকেলে আমরা অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খেলাপি ঋণের সর্বশেষ তালিকা, সংসদ সদস্যদের ঋণের হিসাব এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কীভাবে ও কেন এই তালিকা সংসদে উত্থাপিত হলো?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবম দিনের অধিবেশনে একটি প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
- প্রশ্নকর্তা: কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপি সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ একটি লিখিত প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
- উত্তরদাতা: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে শীর্ষ খেলাপিদের এই তালিকা ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
- সভাপতিত্ব: সেদিনের সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বাংলাদেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা
সংসদে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড
২. এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড
৩. এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
৪. এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস লিমিটেড
৫. সোনালী ট্রেডার্স
৬. বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো)
৭. গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেড
৮. চেমন ইস্পাত লিমিটেড
৯. এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড
১০. ইনফিনাইট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
১১. কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড
১২. দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড
১৩. পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড
১৪. পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড
১৫. প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড
১৬. কেরানীগঞ্জ ফুডস প্রাইভেট লিমিটেড
১৭. মুরাদ এন্টারপ্রাইজ
১৮. সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি
১৯. বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড
২০. রংধনু বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড
বর্তমান সংসদ সদস্যদের ব্যাংক ঋণের পরিস্থিতি কী?
সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে, জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্যদের ব্যাংক ঋণের হিসাব কী? সংসদে অর্থমন্ত্রী এই বিষয়েও সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন:
- মোট ঋণের পরিমাণ: বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
- আদালতের নির্দেশনার প্রভাব: এর মধ্যে আদালতের স্থগিতাদেশ বা নির্দেশ অনুযায়ী ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকাকে খেলাপি ঋণ হিসেবে দেখানো হয়নি।
অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণের প্রভাব
শীর্ষ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশাল অঙ্কের টাকা আটকে থাকার কারণে সরাসরি ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। এর প্রধান কয়েকটি নেতিবাচক দিক হলো:
- ব্যাংকের তারল্য সংকট: হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলোর নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাধা: ব্যাংকে টাকার সংকট থাকলে দেশের সাধারণ ও ছোট ব্যবসায়ীরা সহজে ঋণ পান না, ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়।
- মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ ফেলে।
- উন্নয়ন প্রকল্প ধীরগতি: সরকার ও বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক চাকা ধীর হয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
১. বাংলাদেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত? অর্থমন্ত্রীর সর্বশেষ (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ২০টি প্রতিষ্ঠানের কাছেই আটকে আছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। পুরো দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।
২. শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম কোন গ্রুপের? তালিকায় ‘এস আলম গ্রুপ’ এর নাম সবচেয়ে বেশিবার উঠে এসেছে। তাদের এডিবল অয়েল, ভেজিটেবল অয়েল, সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ এবং কোল্ড রোলড স্টিলসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান শীর্ষ ২০-এর তালিকায় রয়েছে।
৩. બેক্সিমকো কি ঋণখেলাপির তালিকায় আছে? হ্যাঁ, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো) এবং বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড—উভয় প্রতিষ্ঠানই শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
৪. খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে? সরকার সাধারণত অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। তবে অনেক সময় বৃহৎ ঋণখেলাপিরা উচ্চ আদালতে রিট করে বা স্থগিতাদেশ নিয়ে ঋণ পরিশোধ থেকে বিরত থাকে।
শেষকথা
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শীর্ষ এই ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি যেমন চাঙ্গা হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। সঠিক নীতিমালা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

