সম্প্রতি একটি পডকাস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি) একটি “কোচিং সেন্টার” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন, ঢাবির তুলনায় নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বহুগুণ বেশি গবেষণা করে এবং ঢাবি শিক্ষকদের গবেষণাকে ‘প্লেজারাইজড’ বা নকল বলে মন্তব্য করেন। এই অবমাননাকর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সংগঠন ‘সাদা দল’। তারা অবিলম্বে এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
ববি হাজ্জাজের বিতর্কিত মন্তব্য
সম্প্রতি একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়ে ববি হাজ্জাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান মান নিয়ে কিছু বিতর্কিত দাবি উপস্থাপন করেন। তার প্রধান বক্তব্যগুলো ছিল:
- কোচিং সেন্টারের সাথে তুলনা: তিনি ঢাবিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে অভিহিত করেন।
- বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্দনা: তার মতে, ব্র্যাক ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে গবেষণায় অনেক এগিয়ে রয়েছে।
- গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন: ঢাবি শিক্ষকদের গবেষণাকে তিনি ‘প্লেজারাইজড’ (Plagiarized) বা নকল আখ্যা দেন।
- কটাক্ষ: এখানকার শিক্ষার মানকে তিনি “১০ টাকার চা-সিঙ্গারার গল্প” বলে কটাক্ষ করেন।
কেন ক্ষুব্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা?
এই মন্তব্যের পর শিক্ষাঙ্গনে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক সংগঠনগুলো বিভিন্ন ডেটা ও যুক্তির মাধ্যমে এর কড়া জবাব দিয়েছেন।
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের যুক্তিনির্ভর প্রতিবাদ
দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার দেওয়া উল্লেখযোগ্য যুক্তিগুলো হলো:
- দৃষ্টিকোণের সংকীর্ণতা: ববি হাজ্জাজ পূর্বে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করায় তার দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট।
- গবেষণার ইকোসিস্টেমের অভাব: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (যেমন- ব্র্যাক বা নর্থ সাউথ) ট্রাস্টি বোর্ডের মালিকানাধীন। সেখানে শক্তিশালী কোনো পিএইচডি (PhD) প্রোগ্রাম বা গবেষণার ইকোসিস্টেম নেই। শিক্ষকরা মূলত শিক্ষাকর্মী হিসেবে ক্লাস নিতেই ব্যস্ত থাকেন।
- আন্তর্জাতিক প্রকাশনা: নেচার (Nature) বা এপিএস (APS)-এর মতো ফ্ল্যাগশিপ জার্নালে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কয়টি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
- দায়ী কারা? অধ্যাপক মামুনের মতে, ঢাবি যদি আজ ডুবন্ত জাহাজও হয়ে থাকে, তবে তার জন্য দায়ী সরকারের দ্বিচারিতা এবং এমন দায়িত্বহীন মন্ত্রীরাই।
‘সাদা দল’-এর বিবৃতি ও ঢাবির ঐতিহাসিক অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কোনো সুস্থ ও ইতিহাস সচেতন মানুষ এমন মন্তব্য করতে পারে না। তারা বেশ কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন:
- শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান: ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ র্যাংকিং অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বাংলাদেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
- গবেষণা কেন্দ্র: ঢাবিতে বর্তমানে ৫৬টি ব্যুরো ও উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্র নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
- ঐতিহাসিক অবদান: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতিটি বাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিবিড়ভাবে জড়িত। একে ‘কোচিং সেন্টার’ বলা চরম অজ্ঞতা ও অবমাননাকর।
ঢাবি বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: গবেষণায় প্রকৃত চিত্র কী?
তথ্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে (E-E-A-T) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো ‘কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্স’-এর জন্মস্থান। এখনও এখানে ওয়ার্ল্ড ক্লাস গবেষণা পরিচালিত হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত জৌলুস থাকলেও মৌলিক গবেষণায় ঢাবির অবদান এবং ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যা এখনও দেশের প্রেক্ষাপটে সবার ওপরে। তবে ঢাবি শিক্ষকরাও স্বীকার করেন যে, অতিরিক্ত রাজনীতিকরণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সাধারন জিজ্ঞাসা
১. ববি হাজ্জাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ঠিক কী বলেছেন?
ববি হাজ্জাজ একটি পডকাস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন ঢাবির শিক্ষকরা নকল বা প্লেজারাইজড গবেষণা করেন এবং নর্থ সাউথ বা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ঢাবির চেয়ে বেশি গবেষণা করে।
২. অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন ববি হাজ্জাজের মন্তব্যের কী জবাব দিয়েছেন?
অধ্যাপক মামুন বলেছেন, ববি হাজ্জাজের মন্তব্যটি তার সাবেক কর্মস্থল নর্থ সাউথের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলত কোনো পিএইচডি প্রোগ্রাম বা গবেষণার ইকোসিস্টেম নেই, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে।
৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কয়টি উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে?
‘সাদা দল’-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫৬টি ব্যুরো ও উচ্চতর গবেষণা কেন্দ্র নিরলসভাবে কাজ করছে।
৪. বাংলাদেশের সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোনটি?
টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিং (Times Higher Education Ranking) অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম।