ট্রাম্পের নতুন ‘ভোটার নাগরিকত্ব’ ও ‘মেইল-ইন ব্যালট’ নির্বাহী আদেশ

ট্রাম্পের নতুন 'ভোটার নাগরিকত্ব' ও 'মেইল-ইন ব্যালট' নির্বাহী আদেশ

৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন নির্বাহী আদেশ (Executive Order) জারি করেছেন। এই আদেশের মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন ফেডারেল নির্বাচনে কেবলমাত্র বৈধ মার্কিন নাগরিকরাই যেন ভোট দিতে পারেন, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা। এর অধীনে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) ও সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (SSA) মিলে একটি ‘স্টেট সিটিজেনশিপ লিস্ট’ (State Citizenship List) বা নাগরিক তালিকা তৈরি করবে। এছাড়া, জালিয়াতি রোধে ডাকযোগে বা মেইল-ইন (Mail-In) ভোটের ক্ষেত্রে ইউএস পোস্টাল সার্ভিস (USPS)-এর মাধ্যমে বিশেষ বারকোডযুক্ত খামের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যারা আগ্রহী, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি, গ্রিন কার্ড হোল্ডার এবং নতুন মার্কিন নাগরিকদের মনে এই নতুন আদেশ নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় এবং বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব এই নতুন আদেশের অর্থ কী এবং এটি আপনার ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

আদেশের পটভূমি ও মূল উদ্দেশ্য

মার্কিন সংবিধানে ফেডারেল নির্বাচনে শুধুমাত্র মার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। নতুন এই আদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো এই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়ানো।

নতুন নিয়মের প্রধান ৩টি পরিবর্তন

১. ‘স্টেট সিটিজেনশিপ লিস্ট’ বা নাগরিক তালিকা তৈরি

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS), সোশ্যাল সিকিউরিটি (SSA) এবং অন্যান্য ফেডারেল ডেটাবেস ব্যবহার করে একটি তালিকা তৈরি করবে।

  • এই তালিকায় শুধু তাদের নাম থাকবে যারা নিশ্চিতভাবে মার্কিন নাগরিক এবং যাদের বয়স নির্বাচনের দিন ১৮ বছর বা তার বেশি হবে।
  • নির্বাচনের অন্তত ৬০ দিন আগে প্রতিটি স্টেট বা অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে এই তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
  • গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই তালিকায় নাম থাকা মানেই আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার হয়ে যাননি। ভোট দেওয়ার জন্য আপনাকে আপনার স্টেটের নিয়ম অনুযায়ী আলাদাভাবে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন (Voter Registration) করতে হবে।

২. মেইল-ইন (Mail-In) বা ডাকযোগে ভোটের কড়াকড়ি

করোনা মহামারির পর থেকে মেইল-ইন ভোট বেশ জনপ্রিয় হলেও, এখন এতে কিছু কঠোর নিয়ম যুক্ত হচ্ছে:

  • বিশেষ খাম ও বারকোড: প্রতিটি মেইল-ইন ব্যালটের খামে ‘Official Election Mail’ লোগো এবং ট্র্যাকিংয়ের জন্য একটি বিশেষ ‘Intelligent Mail Barcode’ থাকতে হবে।
  • USPS-এর নতুন নিয়ম: পোস্টমাস্টার জেনারেলকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়মাবলি তৈরি করতে বলা হয়েছে। যে স্টেটগুলো ডাকযোগে ভোট নিতে চায়, তাদের নির্বাচনের অন্তত ৯০ দিন আগে USPS-কে জানাতে হবে এবং ৬০ দিন আগে ভোটারদের একটি তালিকা জমা দিতে হবে।
  • তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও ব্যালট ডাকঘর (USPS) গ্রহণ বা পরিবহন করবে না।

৩. কঠোর শাস্তি ও ফান্ড বাতিল

যেসব নির্বাচনী কর্মকর্তা অযোগ্য ব্যক্তিদের (যেমন: অনাগরিকদের) ব্যালট দেবেন, কিংবা যারা অবৈধভাবে ব্যালট ছাপানো বা বিতরণের সাথে যুক্ত থাকবেন, মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেবেন। যেসব অঙ্গরাজ্য বা স্থানীয় প্রশাসন এই নিয়ম মানবে না, তাদের ফেডারেল ফান্ড বা অনুদান বাতিল করা হতে পারে।

বাংলাদেশি প্রবাসী ও অভিবাসীদের ওপর এর প্রভাব

এই আদেশটি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সরাসরি অভিবাসী সম্প্রদায়ের আইনি অবস্থানের সাথে জড়িত।

  • মার্কিন নাগরিক (US Citizens / Dual Citizens): আপনি যদি জন্মসূত্রে বা ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে আপনার চিন্তার কিছু নেই। শুধু নিশ্চিত করুন যে আপনি সঠিকভাবে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত আছেন।
  • গ্রিন কার্ড হোল্ডার (Permanent Residents): গ্রিন কার্ড হোল্ডারদের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। আপনি যদি ভুল করেও ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেন বা ভোট দেন, তবে আপনার গ্রিন কার্ড বাতিল হতে পারে এবং আপনাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিপোর্ট (Deport) বা বিতাড়িত করা হতে পারে।
  • স্টুডেন্ট (F1) ও ওয়ার্কিং ভিসাধারী (H1B/L1): আপনাদের জন্য ভোট দেওয়া বা ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি একটি ফেডারেল অপরাধ।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: আমি কীভাবে জানব যে আমার নাম ‘নাগরিক তালিকায়’ (State Citizenship List) আছে কিনা?

উত্তর: এই আদেশে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের নিজেদের তথ্য দেখতে পারবেন এবং প্রয়োজনে নির্বাচনের আগে তা সংশোধন বা আপডেট করতে পারবেন।

প্রশ্ন: নন-সিটিজেন বা অনাগরিকরা ভোট দিলে কী শাস্তি হতে পারে?

উত্তর: মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী এটি একটি বড় অপরাধ (Felony)। এর ফলে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো অভিবাসন সংক্রান্ত মারাত্মক পরিণতি (যেমন: গ্রিন কার্ড বা ভিসা বাতিল এবং ডিভোর্টেশন) হতে পারে।

প্রশ্ন: মেইল-ইন ভোটের নতুন নিয়ম কবে থেকে কার্যকর হবে?

উত্তর: এই আদেশের দিন (৩১ মার্চ ২০২৬) থেকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পোস্টমাস্টার জেনারেল একটি প্রস্তাবিত নিয়মাবলি তৈরি করবেন এবং ১২০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত নিয়ম জারি করা হবে। অর্থাৎ, আগামী ফেডারেল নির্বাচনের আগেই এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে।

প্রশ্ন: অঙ্গরাজ্যগুলোকে কতদিন ব্যালটের খাম সংরক্ষণ করতে হবে?

উত্তর: নতুন আদেশ অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ভোটগ্রহণের ব্যালট ছাড়া অন্যান্য সমস্ত রেকর্ড (যেমন: ব্যালটের খাম) অন্তত ৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে প্রয়োজনে অডিট বা তদন্ত করা যায়।

পরামর্শ: মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থা বেশ জটিল এবং একেক অঙ্গরাজ্যের নিয়ম একেক রকম হতে পারে। আপনি যদি আপনার ভোটাধিকার বা নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস নিয়ে নিশ্চিত না হন, তবে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করার আগে অবশ্যই একজন অভিবাসন আইনজীবী (Immigration Attorney) অথবা আপনার স্থানীয় নির্বাচন অফিসের (Local Election Office) সাথে যোগাযোগ করুন।

তথ্যসূত্র: হোয়াইট হাউস এক্সিকিউটিভ অর্ডার (৩১ মার্চ ২০২৬)

Leave a Comment

Scroll to Top