জানাজার নামাজ (Janazah Prayer) মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের পক্ষ থেকে শেষ বিদায়ী দোয়া। এটি ফরজে কিফায়া অর্থাৎ সমাজের কিছু সংখ্যক মানুষ আদায় করলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, কিন্তু কেউ আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হবে।
আপনারা যারা জানাজার নামাজের সঠিক নিয়ম, দোয়া বা নিয়ত খুঁজছেন, তাদের জন্য এই আর্টিকেলে ধাপে ধাপে সকল তথ্য সাজানো হয়েছে। এটি পড়লে আপনার মনে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না ইনশাআল্লাহ।
জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম
জানাজার নামাজে কোনো রুকু বা সিজদা নেই। এটি দাঁড়িয়ে ৪টি তাকবীরের মাধ্যমে আদায় করতে হয়: ১. প্রথম তাকবীর: ছানা (সুবহানাকাল্লাহ…) পড়া। ২. দ্বিতীয় তাকবীর: দুরুদ শরীফ (দুরুদে ইব্রাহিম) পড়া। ৩. তৃতীয় তাকবীর: মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়া। ৪. চতুর্থ তাকবীর: সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা।
জানাজার নামাজের পূর্বপ্রস্তুতি ও শর্তাবলী
জানাজার নামাজ সহীহ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত মানা জরুরি। “জানাজার নামাজের নিয়ম দলিলসহ” যারা খুঁজছেন, তাদের জন্য:
- মৃত ব্যক্তি মুসলিম হতে হবে।
- মৃতদেহ গোসল করানো এবং কাফন পরানো অবস্থায় সামনে উপস্থিত থাকতে হবে।
- মুসল্লির শরীর, কাপড় ও জায়গা পবিত্র হতে হবে এবং সতর ঢাকা থাকতে হবে।
- কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতে হবে।
কাতার বা সাড়ি বিন্যাস
জানাজার নামাজে কাতার বেজোড় করা মুস্তাহাব (যেমন- ৩, ৫ বা ৭ কাতার)। ইমাম সাহেবের পেছনে সবাই সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াবেন।
জানাজার নামাজের নিয়ত (বাংলা ও আরবি)
অনেক মানুষ “জানাজার নামাজের নিয়ত” এবং “জানাজার নামাজের আরবি নিয়ত” লিখে সার্চ করেন। মনে রাখবেন, নিয়ত মূলত মনের সংকল্প। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে কেউ চাইলে পড়তে পারেন।
বাংলায় নিয়ত:
“আমি কিবলামুখী হয়ে, চার তাকবীরের সাথে, এই ইমামের পেছনে ফরজে কিফায়া জানাজার নামাজ আদায়ের নিয়ত করলাম। আল্লাহু আকবার।”
আরবি নিয়ত (প্রয়োজনীয় নয়, তবে অনেকে পড়তে চান):
নাওয়াইতু আন উয়াজ্জিয়া লিল্লাহি তাআলা আরবাআ তাকবিরাতি সালাতিল জানাজাতি, ফারদাল কিফায়াতি, সানাউল লিল্লাহে তাআলা ওয়া সালাতু আলান নাবিই, ওয়া দুআউল লিহাযাল মায়্যিতি ইকতাদাইতু বিহাযাল ইমাম, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
জানাজার নামাজের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম
হানাফি মাযহাব মতে জানাজার নামাজ পড়ার বিস্তারিত পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো। এখানে হাত তোলা ও বাঁধার নিয়মসহ প্রতিটি ধাপ বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রথম তাকবীর (হাত বাঁধা ও ছানা পড়া)
ইমামের সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে নাভির নিচে বাঁধুন। এরপর নিম্নস্বরে ছানা পড়ুন। জানাজার ছানায় সামান্য একটু অতিরিক্ত অংশ আছে:
উচ্চারণ: সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া জাল্লা সানাউকা, ওয়া লা-ইলাহা গাইরুক। (দ্রষ্টব্য: কেউ সাধারণ নামাজের ছানা পড়লেও নামাজ হয়ে যাবে)।
দ্বিতীয় তাকবীর (দুরুদ শরীফ পড়া)
ইমাম দ্বিতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন। এবার হাত উঠাবেন না, হাত বাঁধা অবস্থায় থাকবে। মনে মনে বা নিম্নস্বরে দুরুদ শরীফ (যা সাধারণ নামাজে পড়েন – দুরুদে ইব্রাহিম) পড়ুন।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ… (শেষ পর্যন্ত)
তৃতীয় তাকবীর (মূল দোয়া পড়া)
ইমাম তৃতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন। হাত বাঁধা অবস্থায় থাকবে। এখন মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হবে। মৃত ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হলে এক দোয়া, আর অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে ভিন্ন দোয়া।
ক) প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা মহিলার জন্য দোয়া:
এটি “জানাজার নামাজের দোয়া আরবি” হিসেবে পরিচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আরবি: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি-হায়্যিনা ওয়া মায়্যিতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা, ওয়া সাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা, ওয়া জাকারিনা ওয়া উনসিনা। আল্লাহুম্মা মান আহয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু আলাল ইমান। অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড়, পুরুষ ও নারী সবাইকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যাকে আপনি জীবিত রাখেন, তাকে ইসলামের ওপর জীবিত রাখুন এবং যাকে মৃত্যু দান করেন, তাকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করুন।
খ) অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলের ক্ষেত্রে দোয়া:
আল্লাহুম্মাজ আলহু লানা ফারাতাও, ওয়াজ আলহু লানা আজরাও ওয়া জুকরা, ওয়াজ আলহু লানা শাফিআও ওয়া মুশাফ্ফায়া।
গ) অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ক্ষেত্রে দোয়া:
আল্লাহুম্মাজ আলহা লানা ফারাতাও, ওয়াজ আলহা লানা আজরাও ওয়া জুকরা, ওয়াজ আলহা লানা শাফিআতাও ওয়া মুশাফ্ফায়া।
চতুর্থ তাকবীর (সালাম ফেরানো)
ইমাম চতুর্থবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন। এবারও হাত উঠাবেন না। চতুর্থ তাকবীরের পর আর কোনো দোয়া নেই। ইমামের সাথে প্রথমে ডানে এবং পরে বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন। হাত ছেড়ে দিবেন।
মহিলাদের জানাজার নামাজের নিয়ম
মহিলাদের জানাজায় অংশগ্রহণ: সাধারণত মহিলারা জানাজার নামাজে অংশগ্রহণ করেন না এবং এটি তাদের জন্য জরুরিও নয়।
মৃত মহিলার জানাজা পড়ানো: যদি মৃত ব্যক্তি মহিলা হন, তবে নিয়ম একই (৪ তাকবীর)। পার্থক্য শুধু ইমামের দাঁড়ানোর স্থানে।
পুরুষের ক্ষেত্রে: ইমাম মৃত ব্যক্তির মাথা বা সিনা বরাবর দাঁড়াবেন।
মহিলার ক্ষেত্রে: ইমাম মৃত মহিলার কোমর বা মাঝ বরাবর দাঁড়াবেন।
কিছু জরুরি মাসআলা
আপনার মনে জাগতে পারে এমন কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো
প্রশ্ন: জানাজার নামাজে কি জুতা পায়ে রাখা যাবে?
উত্তর: যদি জুতা এবং জুতার নিচের মাটি বা ফ্লোর পবিত্র থাকে, তবে জুতা পায়ে নামাজ পড়া যাবে। আর যদি জুতার তলায় নাপাক থাকে, তবে জুতা খুলে তার ওপর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হবে।
প্রশ্ন: দেরিতে আসলে (মাসবুক) কী করব?
উত্তর: আপনি যদি ইমামকে কিছু তাকবীর দেওয়ার পর পান, তবে নিয়ত করে ইমামের সাথে শরিল হয়ে যাবেন। ইমাম সালাম ফেরানোর পর আপনার ছুটে যাওয়া তাকবীরগুলো আদায় করবেন। তাকবীরে শুধু “আল্লাহু আকবার” বললেই হবে, দোয়া পড়ার সময় না থাকলে দরকার নেই। তবে সম্ভব হলে দোয়া পড়ে নেবেন।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজ কি ওজু ছাড়া পড়া যায়?
উত্তর: না, জানাজার নামাজের জন্য ওজু বা তায়াম্মুম (পানি না থাকলে) ফরজ। ওজু ছাড়া জানাজা হবে না।
প্রশ্ন: জানাজার নামাজের দোয়া মুখস্থ না থাকলে কী করব?
উত্তর: যদি নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ না থাকে, তবে তৃতীয় তাকবীরের পর মনে মনে “রাব্বানা আতি না ফিদ দুনিয়া…” বা ক্ষমা প্রার্থনামূলক যেকোনো দোয়া পড়লেও আদায় হয়ে যাবে।
শেষকথা
জানাজার নামাজ মৃত ব্যক্তির জন্য একটি উপহার। এটি লোক দেখানো কোনো অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি ইবাদত। তাই “জানাজার নামাজের নিয়ম ও দোয়া” কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং সহীহভাবে আমল করার জন্য শেখা উচিত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক উপায়ে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র: ১. ফতোয়ায়ে শামী (খণ্ড ২) ২. সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফ (জানাযা অধ্যায়)
বি:দ্র: আপনার যদি এই আর্টিকেলটি উপকারে আসে, তবে শেয়ার করে অন্যদেরও সঠিক নিয়ম জানতে সাহায্য করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

