ভোটে বা গণভোটে অংশগ্রহণ করা কি শুধুই নাগরিক দায়িত্ব নাকি এর সঙ্গে ধর্মীয় আমানতদারিতার সম্পর্ক আছে? যখন একাধিক ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে এক করে শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের অপশন দেওয়া হয় তখন একজন সচেতন নাগরিক বা মুমিন হিসেবে আপনার করণীয় কী? মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের সাম্প্রতিক আলোচনার আলোকে এই বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হলো।
একনজরে: সঠিক ভোট প্রদানের মূলনীতি
আপনার সময়ের মূল্য আমরা বুঝি। পুরো আর্টিকেল পড়ার সময় না থাকলে মূল কথাগুলো জেনে নিন:
- ভোট একটি আমানত: এটি হেলাফেলার বিষয় নয়; জেনেশুনে ও বুঝে প্রয়োগ করতে হয়।
- বান্ডিল প্রশ্নের সতর্কতা: যখন ভালো ও মন্দ বিষয় একসঙ্গে মিশিয়ে ‘হ্যাঁ/না’ জানতে চাওয়া হয়, তখন অন্ধভাবে সমর্থন না করে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
- প্রতীক বা নাম দেখে নয়: দলের নাম ‘ইসলামী’ হলেই বা মার্কা পরিচিত হলেই চোখ বন্ধ করে ভোট দেওয়া যাবে না।
- নেতা নির্বাচনের মাপকাঠি: যার অন্তরে আল্লাহর ভয়, পরকালের জবাবদিহিতা এবং মানুষের প্রতি দয়ামায়া আছে তাকেই নির্বাচিত করা উচিত।
- করণীয়: ভোট দেওয়ার আগে সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের তৌফিক চাইতে হবে এবং অভিজ্ঞ দ্বীনদার ব্যক্তিদের পরামর্শ নিতে হবে।
গণভোটের জটিলতা: ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’?
মুফতি আব্দুল মালেক সাহেব বর্তমান সময়ের গণভোট বা নির্বাচনের একটি জটিল দিক তুলে ধরেছেন। যখন ব্যালট পেপারে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাবনা বা এজেন্ডাকে একটি মাত্র প্যাকেজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং জনগণকে বলা হয় পুরো প্যাকেজে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলতে, তখন এটি একটি যৌক্তিক সংকটের সৃষ্টি করে।
তিনি একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে দেন:
প্রশ্ন: ঢাকা ও দিল্লি এই দুটিই কি বাংলাদেশের রাজধানী?
উত্তর: আপনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তবে দিল্লিকেও বাংলাদেশের রাজধানী মেনে নেওয়া হয়। আর যদি ‘না’ বলেন তবে ঢাকা যে বাংলাদেশের রাজধানী সেটিও অস্বীকার করা হয়।
ঠিক একইভাবে, যখন ৫-৬টি ভিন্ন বিষয়কে এক করে ‘হ্যাঁ/না’ ভোট চাওয়া হয়, তখন সেখানে কিছু ভালো বিষয় থাকতে পারে আবার কিছু আপত্তিকর বিষয়ও থাকতে পারে। এমতাবস্থায়, মুফতি সাহেবের পরামর্শ হলো কোনো চাপে পড়ে বা বিভ্রান্ত হয়ে ভোট দেবেন না। ‘না’ ভোট দিলেই দেশের উন্নতি আটকে যাবে এমন প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করা ঠিক নয়। দেশের কল্যাণ নির্ভর করে শাসকের নিয়ত এবং জনগণের কিসমতের ওপর।
ইসলামে ভোট প্রদানের গুরুত্ব ও আমানত
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ভোট প্রদান নিছক কোনো রাজনৈতিক খেলা নয়, বরং এটি একটি ‘শাহাদাত’ বা সাক্ষ্য প্রদান এবং ‘আমানত’।
- ভুল সাক্ষ্য দেওয়া গুনাহ: আপনি যাকে ভোট দিচ্ছেন, আপনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে এই ব্যক্তি বা দলটি যোগ্য। যদি তারা অযোগ্য হয় এবং আপনি জেনে-বুঝে তাদের সমর্থন করেন, তবে তাদের অন্যায়ের দায়ভার আপনার ওপরও বর্তাবে।
- অন্ধ অনুকরণ নিষিদ্ধ: কোনো দল তাদের নামের সাথে ‘ইসলাম’ শব্দটি ব্যবহার করলেই বা তাদের ইশতেহারে ইসলামের কথা থাকলেই চোখ বন্ধ করে তাদের ভোট দেওয়া যাবে না। দেখতে হবে—বাস্তবে তারা ইসলামের বিধান কতটুকু মানে এবং তাদের নিয়ত কতটুকু স্বচ্ছ।
সঠিক প্রার্থী বা দল নির্বাচনের মাপকাঠি
ভিডিওর আলোচনায় মুফতি সাহেব নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান গুণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা প্রতিটি ভোটারের যাচাই করা উচিত:
১. আল্লাহভীতি (Taqwa): নেতার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে কি না।
২. আখেরাতের ফিকির: পরকালে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে—এই চিন্তা নেতার মধ্যে আছে কি না।
৩. মাখলুকের প্রতি দয়ামায়া: আল্লাহর বান্দাদের প্রতি নেতার অন্তরে মমতা ও ভালোবাসা আছে কি না।
বিশেষ সতর্কতা: যারা সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, তাদের ইশতেহার এবং যারা ইসলামের কথা বলে তাদের ইশতেহার উভয়টিই যাচাই করে দেখতে হবে। শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
মানুষের সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর
১. ‘না’ ভোট দিলে কি দেশের ক্ষতি হয়?
না, তা সঠিক নয়। মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের মতে, দেশের উন্নতি নির্ভর করে সঠিক পরিকল্পনা ও সৎ নিয়তের ওপর। ‘না’ ভোট দেওয়া নাগরিকদের একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। যদি প্রস্তাবে অসঙ্গতি থাকে তবে ‘না’ দেওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত। এতে দেশের উন্নতি আটকে যায় না।
২. ইসলামী নামধারী দলকে কি চোখ বন্ধ করে ভোট দেওয়া যাবে?
না। দলের নাম বা প্রতীকে ইসলাম থাকলেই তারা যোগ্য এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। আপনাকে যাচাই করতে হবে তারা বাস্তবে ইসলাম ও মানবতার জন্য কাজ করছে কি না। অন্ধভক্তি ইসলাম সমর্থন করে না।
৩. ভোট দেওয়ার আগে একজন মুমিনের করণীয় কী?
ভোট দেওয়ার আগে একজন মুমিনের উচিত:
- আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দোয়া ও ইস্তিখারা করা।
- প্রয়োজনে সালাতুল হাজত পড়া।
- অভিজ্ঞ ও নেককার আলেম বা মুরব্বিদের সাথে পরামর্শ (মাশওয়ারা) করা।
উপসংহার ও দোয়া
পরিশেষে, ভোট বা মতামত প্রদান একটি গুরুদায়িত্ব। কোনো ভয়ভীতি বা লোভে পড়ে নয়, বরং আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে এই অধিকার প্রয়োগ করা উচিত।
আমরা মহান আল্লাহর কাছে সেই দোয়াটিই করব যা মুফতি সাহেব শিখিয়েছেন:
“হে আল্লাহ! যাদের অন্তরে আপনার ভয় নেই এবং আপনার সৃষ্টির প্রতি দয়ামায়া নেই, তাদের হাতে আমাদের ক্ষমতা দিয়েন না। বরং যারা আপনাকে ভয় করে এবং মানুষের কল্যাণকামী, তাদের হাতেই দেশের দায়িত্ব অর্পণ করুন।”
তথ্যসূত্র:
- ভিডিও লেকচার: গণভোট বিষয়ে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের বক্তব্য
- বক্তা: মুফতি আব্দুল মালেক (হাফি.)
- ভিডিও লিংক: https://youtu.be/K6S1Hbdf2Ps
