অন্যের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ নিজের ফোনে বা কম্পিউটারে দেখার জন্য কোনো ম্যাজিক বা রিমোট হ্যাকিং পদ্ধতি নেই, কারণ হোয়াটসঅ্যাপ ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড (End-to-End Encrypted)’। তবে বৈধ ও কার্যকরভাবে মেসেজ দেখার মূলত ৪টি উপায় রয়েছে:
১. Linked Devices / WhatsApp Web: টার্গেট ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে আপনার ফোনের বা কম্পিউটারের QR কোড স্ক্যান করে।
২. Chat Export (চ্যাট এক্সপোর্ট): নির্দিষ্ট কোনো চ্যাট হিস্ট্রি ইমেইলে এক্সপোর্ট করে নেওয়া।
৩. Parental Control Apps: শিশুদের নিরাপত্তার জন্য Google Family Link বা mSpy-এর মতো মনিটরিং অ্যাপ ব্যবহার করে।
৪. Screen Sharing: হোয়াটসঅ্যাপ কল বা অন্য অ্যাপের মাধ্যমে স্ক্রিন শেয়ার করে।
সতর্কতা: এর প্রতিটি পদ্ধতির জন্যই অন্তত একবার টার্গেট ব্যক্তির ফোনটি আনলক অবস্থায় আপনার হাতে থাকা প্রয়োজন।
কেন মানুষ অন্যের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ দেখতে চায়?
বর্তমান সময়ে হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সাধারণত বাবা-মা তাদের সন্তান বিপথে যাচ্ছে কিনা তা দেখতে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি সন্দেহ দূর করতে, অথবা অফিসের কাজের প্রয়োজনে মনিটরিং করতে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন। তবে ইউটিউব বা গুগলে সার্চ করলে অনেক ভুয়া অ্যাপ ও ভিডিও পাওয়া যায়, যা আপনার নিজের ফোনের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
চলুন, আসল সত্য ও কার্যকরী পদ্ধতিগুলো ধাপে ধাপে জেনে নিই।
অন্যের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট নিজের ফোনে দেখার ৪টি পদ্ধতি
নিচের পদ্ধতিগুলো সম্পূর্ণ বৈধ এবং হোয়াটসঅ্যাপের নিজস্ব ফিচার ব্যবহার করেই করা সম্ভব।
১. WhatsApp Web বা Linked Devices ব্যবহার করে (সবচেয়ে সহজ উপায়)
এটি হোয়াটসঅ্যাপের একটি অফিশিয়াল ফিচার। বর্তমানে একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ৪টি ভিন্ন ডিভাইসে ব্যবহার করা যায়।
- ধাপ ১: আপনার ফোন বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে
web.whatsapp.comএ যান। (মোবাইল ব্রাউজার হলে ‘Desktop Site’ অন করে নিন)। - ধাপ ২: স্ক্রিনে একটি QR Code দেখতে পাবেন।
- ধাপ ৩: এবার যার মেসেজ দেখতে চান (যেমন- সন্তানের ফোন) তার হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করুন।
- ধাপ ৪: উপরে ডানদিকের থ্রি-ডট মেনু থেকে “Linked Devices” অপশনে ক্লিক করুন এবং “Link a Device” এ ট্যাপ করে আপনার স্ক্রিনের QR কোডটি স্ক্যান করুন।
- ফলাফল: ব্যাস! এখন থেকে তার ফোনে আসা সব মেসেজ আপনি আপনার ডিভাইস থেকেই লাইভ দেখতে পাবেন।
২. চ্যাট এক্সপোর্ট (Chat Export) ফিচারের মাধ্যমে
আপনি যদি শুধু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির সাথে করা পুরোনো চ্যাটগুলো প্রমাণ হিসেবে দেখতে চান, তবে এটি সেরা উপায়।
- ধাপ ১: যার হোয়াটসঅ্যাপ দেখতে চান, তার ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে নির্দিষ্ট চ্যাট বা গ্রুপে প্রবেশ করুন।
- ধাপ ২: থ্রি-ডট মেনুতে ক্লিক করে “More” অপশনে যান।
- ধাপ ৩: “Export Chat” এ ক্লিক করুন। (মিডিয়া সহ বা ছাড়া অপশন বেছে নিতে পারেন)।
- ধাপ ৪: এবার সেই ফাইলটি আপনার নিজের জিমেইল বা হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করে দিন।
৩. প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপস (Parental Control Apps)
বাবা-মায়েরা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের সুরক্ষার জন্য কিছু থার্ড-পার্টি মনিটরিং অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
- জনপ্রিয় অ্যাপস: mSpy, FlexiSPY বা Google Family Link।
- কিভাবে কাজ করে: এই অ্যাপগুলো সন্তানের ফোনে ইনস্টল করে হাইড (hide) করে রাখতে হয়। এরপর সন্তান কার সাথে মেসেজ করছে, কী ছবি পাঠাচ্ছে, তার নোটিফিকেশন হিস্ট্রি আপনার ফোনে চলে আসবে।
৪. গুগল ড্রাইভ ব্যাকআপ রিস্টোর (Backup Restore)
যদি আপনার কাছে টার্গেট ব্যক্তির ফোন নম্বর (সিম কার্ড) এবং তার জিমেইল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড থাকে, তবে আপনি নতুন ফোনে তার হোয়াটসঅ্যাপ লগ-ইন করে গুগল ড্রাইভ থেকে সমস্ত পুরোনো মেসেজ রিস্টোর করতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিং কি আসলেই সম্ভব?
ইউটিউবে অনেক ভিডিওতে দাবি করা হয় যে শুধু মোবাইল নম্বর দিয়ে অন্যের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ দেখা সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
হোয়াটসঅ্যাপ এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহার করে। এর মানে হলো, যিনি মেসেজ পাঠাচ্ছেন এবং যিনি পড়ছেন— এই দুজন ছাড়া স্বয়ং হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষও মেসেজ পড়তে পারে না। সুতরাং, কোনো থার্ড-পার্টি ফিশিং সাইট বা এপিকে (APK) ফাইলে ক্লিক করে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করবেন না; এতে উল্টো আপনার নিজের ফোনের ডাটা, ব্যাংক ডিটেইলস এবং ছবি হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে।
আপনার হোয়াটসঅ্যাপ গোপনে কেউ দেখছে কিনা কিভাবে বুঝবেন?
যেহেতু আপনি অন্যের মেসেজ দেখার উপায় খুঁজছেন, তাই আপনার মেসেজও যে কেউ দেখছে না, তার নিশ্চয়তা কী? নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এই কাজগুলো করুন:
- হোয়াটসঅ্যাপের সেটিংসে গিয়ে “Linked Devices” অপশন চেক করুন। অচেনা কোনো ডিভাইস লগ-ইন থাকলে সাথে সাথে “Log Out” করে দিন।
- আপনার অ্যাকাউন্টে Two-Step Verification (2FA) চালু করে রাখুন।
- হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচার “Chat Lock” বা “Secret Code” ব্যবহার করে ব্যক্তিগত চ্যাট লুকিয়ে রাখুন।
আইনি ও নৈতিক দিক: বাংলাদেশের সাইবার আইন
বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ (Cyber Security Act) অনুযায়ী, কারও অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত ডিভাইস অ্যাক্সেস করা, মেসেজ পড়া বা হ্যাক করা একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। স্বামী-স্ত্রী বা প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধু হলেও বিনা অনুমতিতে মেসেজ চেক করা আইনি ও নৈতিকভাবে অপরাধ। তাই কেবল অভিভাবক হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সুরক্ষার ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা সমীচীন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: শুধু মোবাইল নাম্বার দিয়ে অন্যের হোয়াটসঅ্যাপ দেখা যায়?
উত্তর: না, এটি সম্ভব নয়। শুধু মোবাইল নাম্বার দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করা যায় না। লগ-ইন করতে হলে ওই নাম্বারে যাওয়া ৬-ডিজিটের ওটিপি (OTP) কোড লাগবেই।
প্রশ্ন ২: ডিলিট হয়ে যাওয়া হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ কিভাবে দেখব?
উত্তর: এর জন্য “Notification History” (অ্যান্ড্রয়েড ১১ বা তার উপরের ভার্সনে) চালু রাখতে পারেন অথবা থার্ড-পার্টি অ্যাপ যেমন ‘WAMR’ ব্যবহার করতে পারেন, যা ডিলিট হওয়া মেসেজ সেভ করে রাখে।
প্রশ্ন ৩: গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ তার ফোন না ছুঁয়ে কিভাবে দেখব?
উত্তর: ফোন একবারের জন্যও হাতে না নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ দেখা অসম্ভব। আপনাকে অন্তত একবার তার ফোন হাতে নিয়ে QR কোড স্ক্যান করতে হবে বা মনিটরিং অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে।
প্রশ্ন ৪: হোয়াটসঅ্যাপে ব্লু টিক (Blue Tick) বন্ধ থাকলে মেসেজ পড়েছে কিনা বুঝব কিভাবে?
উত্তর: আপনি যদি একটি ভয়েস নোট (Voice note) বা অডিও মেসেজ পাঠান, তবে অপর পাশের ব্যক্তি সেটি শুনলেই ব্লু টিক চলে আসবে, যদিও তার “Read Receipts” বন্ধ থাকে।
শেষকথা
“অন্যের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ কিভাবে দেখব”— এই কৌতূহল মেটাতে গিয়ে কখনোই অবৈধ অ্যাপ বা হ্যাকিং লিংকের ফাঁদে পা দেবেন না। আপনি যদি অভিভাবক হন, তবে Linked Devices বা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ব্যবহার করতে পারেন। তবে সম্পর্ক ভালো রাখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো পারস্পরিক বিশ্বাস এবং খোলামেলা আলোচনা। প্রযুক্তি দিয়ে কাউকে জোর করে আটকে রাখা বা নজরদারি করা দীর্ঘমেয়াদে কোনো ভালো ফল আনে না।
(আর্টিকেলটি আপনার ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।)
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

