| জুমার দিনের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো (১) গোসল করা, (২) সুগন্ধি ব্যবহার, (৩) উত্তম পোশাক পরা, (৪) আগে মসজিদে যাওয়া, (৫) মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা, (৬) বেশি বেশি দরুদ পড়া, (৭) সূরা কাহফ তিলাওয়াত, (৮) বেশি দোয়া করা, (৯) আজানের পর বেচা-কেনা বন্ধ রাখা, (১০) দান-সদকা করা এবং (১১) বেশি বেশি জিকির করা। এই আমলগুলো সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। |
জুমার দিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জুমার দিন অর্থাৎ শুক্রবার ইসলামের দৃষ্টিতে সপ্তাহের সেরা দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘সূর্য যেসব দিনে উদয় হয় তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৫৪)। এই দিনে হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং এই দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।
প্রতিটি মুসলমানের জন্য জুমার দিনের নির্দিষ্ট কিছু আমল পালন করা ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের অংশ। এই আমলগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এগুলোর মধ্যে রয়েছে অসীম সওয়াব, গুনাহ মাফের সুযোগ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ।
জুমার দিনের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ আমল বিস্তারিত
নিচে হাদিস ও ইসলামিক স্কলারদের মতামতের ভিত্তিতে জুমার দিনের ১১টি প্রমাণিত আমল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. গোসল করা — জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত
জুমার দিনে গোসল করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেকের ওপর জুমার দিনে গোসল করা কর্তব্য।’ (সহিহ বুখারি: ৮৫৮; সহিহ মুসলিম: ৮৪৬)।
যাদের ওপর গোসল ফরজ হয়েছে (যেমন স্বপ্নদোষ বা সহবাসের কারণে), তাদের জন্য জুমার আগে গোসল করা ফরজ। অন্যদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত, বিশেষত যারা মসজিদে যাবেন তাদের জন্য।
| ফজিলত: জুমার দিনে গোসল করে মসজিদে গেলে প্রতিটি পদক্ষেপে গুনাহ মাফ হয় এবং সওয়াব লেখা হয়। |
২. সুগন্ধি ব্যবহার করা — মসজিদের পরিবেশ সুন্দর রাখুন
জুমার দিনে সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং এটি অত্যন্ত পছন্দ করতেন। মসজিদে যাওয়ার আগে আতর ব্যবহার করুন যাতে মসজিদের পরিবেশ সুন্দর ও পবিত্র থাকে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মহিলারা ঘরের বাইরে সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন, কেননা এটি ফিতনার কারণ হতে পারে।
৩. উত্তম পোশাক পরিধান করা — শ্রেষ্ঠ দিনে সেরা সাজ
জুমার দিনে সাধ্যমতো সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরা উচিত। আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে পরিষ্কার ও মার্জিত পোশাক পরা ইসলামের শিক্ষা।
সাদা পোশাক পরা বিশেষভাবে উত্তম কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদা পোশাক পছন্দ করতেন। পুরুষদের জন্য সাদা পাঞ্জাবি বা জুব্বা পরা সুন্নতের অনুসরণ।
৪. আগে আগে মসজিদে যাওয়া — প্রথম কাতারের ফজিলত
জুমার নামাজের জন্য আগে আগে মসজিদে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে প্রথম সময়ে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কুরবানি করল, দ্বিতীয় সময়ে যে যায় সে যেন একটি গরু কুরবানি করল…’ (সহিহ বুখারি: ৮৮১)।
মসজিদে আগে গেলে প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের সুযোগ হয়, তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও নফল নামাজ পড়া যায় এবং শান্ত মনে খুতবা শোনা যায়।
৫. মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা — নীরবতাই ইবাদত
জুমার খুতবা শোনা ওয়াজিব। ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন তখন কথা বলা, সালাম দেওয়া, জবাব দেওয়া বা অন্য কোনো কাজ করা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘যে ব্যক্তি খুতবার সময় নুড়ি পাথর স্পর্শ করে, সে অনর্থক কাজ করে এবং তার জুমা বাতিল হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৫৭)।
খুতবার সময় পবিত্র মনোযোগ দিয়ে বসে থাকুন। কোনো সহজ কাজও যেন খুতবার মনোযোগ নষ্ট না করে।
৬. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা — নবীর প্রতি ভালোবাসা
জুমার দিনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত উত্তম আমল। তিনি নিজেই বলেছেন — ‘তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়।’ (আবু দাউদ: ১০৪৭; সহিহ ইবনে হিব্বান)।
দরুদে ইব্রাহিম পড়া সবচেয়ে উত্তম। ফজরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত যতটা সম্ভব দরুদ পড়ুন।
৭. সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা — নূরময় সপ্তাহের গ্যারান্টি
জুমার দিন সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা একটি বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মাঝে নূর আলোকিত হবে।’ (মুসতাদরাক হাকিম, বায়হাকি — হাদিসটি হাসান পর্যায়ের)।
সূরা কাহফ পড়ার উত্তম সময় হলো জুমার রাত (বৃহস্পতিবার রাত) থেকে শুরু করে জুমার দিন সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত।
| বিশেষ নোট: সূরা কাহফের প্রথম ও শেষ ১০টি আয়াত মুখস্থ করা দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষার কারণ বলে হাদিসে এসেছে। (সহিহ মুসলিম: ৮০৯) |
৮. বেশি বেশি দোয়া করা — কবুলের বিশেষ মুহূর্ত
জুমার দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোনো মুসলমান যদি সেই সময়ে সালাতে থেকে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ তা দেবেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫২৯৫; সহিহ মুসলিম: ৮৫২)।
অনেক আলেমের মতে এই বিশেষ মুহূর্তটি আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত। এই সময়ে বেশি বেশি দোয়া করুন।
৯. আজানের পর বেচা-কেনা বন্ধ রাখা — ফরজ হুকুম
জুমার নামাজের জন্য আজান দেওয়ার পর বেচা-কেনা করা হারাম। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেছেন — ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে সালাতের জন্য আজান দেওয়া হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচা-কেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জানতে।’ (সূরা জুমআ: ৯)।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে আজানের পরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে লিপ্ত থাকা ইসলামে নিষিদ্ধ। ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রেখে মসজিদে যাবেন।
১০. দান-সদকা করা — জুমার দিনে দানের বিশেষ বরকত
জুমার দিনে দান-সদকা করা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘প্রতিটি দিন দুইজন ফেরেশতা নামেন এবং একজন বলেন — হে আল্লাহ! দানকারীকে উত্তম প্রতিদান দিন।’ (সহিহ বুখারি: ১৪৪২)।
জুমার দিনে সামর্থ্য অনুযায়ী গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করুন, মসজিদের দানবাক্সে দান করুন অথবা বিশ্বস্ত কল্যাণমূলক সংস্থায় অনুদান দিন।
১১. বেশি বেশি জিকির করা — আল্লাহর স্মরণে মুখর থাকুন
জুমার দিনে সারাদিন বেশি বেশি জিকির করা উচিত। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ — এই জিকিরগুলো যেকোনো কাজের ফাঁকে পড়া যায়।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন — ‘যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর জিকিরে তাদের হৃদয় শান্ত হয়।’ (সূরা আর-রাদ: ২৮)। জুমার দিনে জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করুন।
জুমার দিনের আমলের সময়সূচি
জুমার দিনের আমলগুলো সঠিক সময়ে করা আরও বেশি ফজিলতপূর্ণ। নিচে একটি কার্যকর সময়সূচি দেওয়া হলো:
ফজরের পর. দরুদ শরিফ ও জিকির শুরু করুন। — সূরা কাহফ তিলাওয়াত শুরু করুন।
জোহরের দুই ঘণ্টা আগে. গোসল করুন। — সুগন্ধি ব্যবহার করুন, উত্তম পোশাক পরুন এবং মসজিদে রওনা দিন।
মসজিদে প্রবেশের পর. তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ুন। — নফল নামাজ আদায় করুন, দোয়া ও দরুদ পড়তে থাকুন।
খুতবার সময়. সম্পূর্ণ নীরব থাকুন। — মনোযোগ দিয়ে শুনুন, কোনো কথা নয়।
জুমার নামাজ শেষে. দান করুন। — বিশেষ দোয়া করুন।
আসর থেকে মাগরিব. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। — এই সময়ে বেশি করে দোয়া করুন।
মহিলাদের জন্য জুমার দিনের আমল
মহিলাদের ওপর জুমার নামাজ ফরজ নয়, তবে জুমার দিনের অন্যান্য আমলগুলো তাদের জন্যও সমানভাবে ফজিলতপূর্ণ। মহিলারা ঘরে থেকে নিচের আমলগুলো করবেন:
- গোসল করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা
- সূরা কাহফ তিলাওয়াত করা
- বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া
- বেশি বেশি দোয়া করা
- জিকির ও তাসবিহ পড়া
- দান-সদকা করা
- পরিবারের সদস্যদের জুমার আমলে উৎসাহিত করা
- জোহরের ৪ রাকাত ফরজ নামাজ ঘরে আদায় করা
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: জুমার দিনে কোন সময়ে দোয়া কবুল হয়?
উত্তর: অধিকাংশ আলেমের মতে, আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের আজানের আগ পর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ মুহূর্ত। এই সময়ে যেকোনো বৈধ দোয়া বেশি বেশি করুন।
প্রশ্ন: জুমার দিনে সূরা কাহফ কখন পড়তে হয়?
উত্তর: বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত (জুমার রাত) থেকে শুরু করে শুক্রবার সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময়ে পড়া যায়।
প্রশ্ন: জুমার দিনে গোসল করা কি ফরজ?
উত্তর: যাদের ওপর গোসল ফরজ হয়েছে তাদের জন্য গোসল ফরজ। অন্যদের জন্য জুমার দিনে গোসল করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
প্রশ্ন: জুমার নামাজের আগে কত রাকাত সুন্নত পড়তে হয়?
উত্তর: জুমার নামাজের আগে ৪ রাকাত সুন্নত (কাব্লাল জুমা) পড়া সুন্নত এবং নামাজের পরে ৪ রাকাত বা ২ রাকাত সুন্নত পড়া উচিত।
প্রশ্ন: জুমার দিনে বেচা-কেনা করা কি হারাম?
উত্তর: দ্বিতীয় আজান (খুতবার আজান) দেওয়ার পর থেকে জুমার নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত বেচা-কেনা হারাম। এটি কুরআনের সূরা জুমআর ৯নং আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন: মহিলাদের জুমার নামাজ কি পড়তে হবে?
উত্তর: না, মহিলাদের ওপর জুমার নামাজ ফরজ নয়। তারা ঘরে জোহরের ৪ রাকাত ফরজ নামাজ পড়বেন। তবে জুমার অন্যান্য আমলগুলো তাদের জন্যও সমানভাবে ফজিলতপূর্ণ।
প্রশ্ন: জুমার দিনে কতটুকু দরুদ পড়া উচিত?
উত্তর: নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই — যত বেশি পড়া যায় তত ভালো। ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত যতটুকু সম্ভব দরুদে ইব্রাহিম পড়ুন।
শেষকথা
জুমার দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বিশেষ উপহার। এই দিনের ১১টি আমল যদি আমরা নিষ্ঠার সাথে পালন করি, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমাদের গুনাহ মাফ হবে, দোয়া কবুল হবে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — ‘যে ব্যক্তি ভালোভাবে ওজু করে জুমার নামাজ পড়তে আসে এবং নীরবে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার পূর্ববর্তী জুমা থেকে এই জুমা পর্যন্ত এবং আরও তিন দিনের গুনাহ মাফ করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৫৭)।
আসুন, প্রতিটি জুমাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পালন করি এবং পরিবার ও প্রতিবেশীদেরও এই আমলগুলো পালনে উৎসাহিত করি। আল্লাহ আমাদের সকলকে জুমার আমলগুলো সঠিকভাবে পালন করার তওফিক দান করুন। আমিন।
Disclaimer and References: এই আর্টিকেলটি ইসলামিক কনটেন্ট টিম কর্তৃক প্রস্তুত করা হয়েছে। সকল হাদিস রেফারেন্স সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য বিশ্বস্ত হাদিস গ্রন্থ থেকে যাচাই করা হয়েছে। আর্টিকেলে কোনো তথ্যগত ভুল পেলে আমাদের জানান।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

