মহররমের ১০ তারিখ কবে ২০২৬?

মহররমের ১০ তারিখ কবে ২০২৬

বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪৮ হিজরি সনের মহররম মাস শুরু হয়েছে ১৭ জুন ২০২৬ (বুধবার) থেকে। সেই হিসাবে মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ পবিত্র আশুরা পালিত হবে ২৬ জুন ২০২৬, শুক্রবার। এই দিনটি বাংলাদেশে নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটির দিন।

বাংলাদেশে মহররমের ১০ তারিখ কবে?

১৬ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফজলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, স্পারসো (মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান) এবং দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে নিশ্চিত করা হয় যে দেশের আকাশে মহররম মাসের চাঁদ দেখা গেছে।

এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:

  • ১ মহররম, ১৪৪৮ হিজরি: বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
  • ৯ মহররম (তাসুয়া): বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • ১০ মহররম (আশুরা): শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
  • ১১ মহররম: শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

অর্থাৎ বাংলাদেশে এ বছর আশুরা পড়েছে সপ্তাহান্তের ঠিক আগে, শুক্রবারে — যা সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলে একটি দীর্ঘ অবকাশের সুযোগও তৈরি করেছে অনেকের জন্য।

সৌদি আরব ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে আশুরা কবে?

বাংলাদেশের তারিখের সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশের তারিখে একদিনের পার্থক্য রয়েছে, যা চাঁদ দেখার ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণে স্বাভাবিক। সৌদি আরবে মহররম মাস শুরু হয়েছিল ১৬ জুন ২০২৬ থেকে, ফলে সেখানে ১০ মহররম বা আশুরা পালিত হয়েছে ২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার

দেশ / অঞ্চলমহররম শুরু (১ মহররম)আশুরা (১০ মহররম)
বাংলাদেশ১৭ জুন ২০২৬ (বুধবার)২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার)
সৌদি আরব ও অধিকাংশ আরব দেশ১৬ জুন ২০২৬ (মঙ্গলবার)২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)

মনে রাখবেন: আপনি যদি বাংলাদেশে অবস্থান করেন এবং রোজা বা অন্যান্য আমল পালন করতে চান, তাহলে বাংলাদেশ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষিত তারিখ অর্থাৎ ২৬ জুন অনুসরণ করাই সঠিক পদ্ধতি। প্রবাসী হলে নিজ দেশের স্থানীয় মসজিদ বা ইসলামিক কর্তৃপক্ষের ঘোষণা মেনে চলুন।

কেন প্রতি বছর তারিখ ভিন্ন হয়?

ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জি সম্পূর্ণরূপে চন্দ্র মাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে প্রতিটি মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ (হিলাল) খালি চোখে দেখা যাওয়ার মাধ্যমে। চান্দ্র বছর সৌর বছরের (ইংরেজি ক্যালেন্ডার) তুলনায় প্রায় ১০-১১ দিন ছোট হওয়ায় প্রতি বছর হিজরি তারিখগুলো ইংরেজি ক্যালেন্ডারে প্রায় ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। এ কারণেই মহররমের ১০ তারিখ প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন ইংরেজি তারিখে পড়ে, এবং একই কারণে বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখা যাওয়ার সময় ভিন্ন হওয়ায় এক-দুই দিনের পার্থক্যও দেখা যায়।

আশুরা কী এবং এর গুরুত্ব কেন এত বেশি?

আরবি ‘আশারা’ শব্দের অর্থ দশ, আর ‘আশুরা’ মানে দশম। ইসলামি পরিভাষায় হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকেই আশুরা বলা হয়।

ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন:

  • হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি এবং নীল নদ পাড়ি দিয়ে নিরাপদে পৌঁছানো।
  • নবী নুহ (আ.)-এর প্লাবন শেষ হওয়া এবং তাঁর কিশতি জুদি পর্বতে নোঙর করা।
  • ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের শাহাদাতের ঘটনা, যা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে গভীরভাবে বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর কারণেই আশুরা মুসলিম বিশ্বে আত্মত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার শিক্ষা বহনকারী একটি বিশেষ দিন হিসেবে পরিচিত।

আশুরার রোজা কবে রাখবেন?

হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু ১০ মহররম একদিন রোজা না রেখে এর সঙ্গে আরও একদিন রোজা রাখা সুন্নত। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের রীতি থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে ৯ তারিখের সঙ্গে ১০ তারিখ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। ফিকহবিদদের মতে এক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য:

  1. ৯ ও ১০ মহররম একসঙ্গে রোজা রাখা — বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি পড়বে ২৫ ও ২৬ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতি ও শুক্রবার)
  2. ১০ ও ১১ মহররম একসঙ্গে রোজা রাখা — অর্থাৎ ২৬ ও ২৭ জুন ২০২৬ (শুক্র ও শনিবার)

দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করলেই সুন্নত আদায় হয়ে যায়; তবে ফিকহবিদদের অগ্রাধিকার সাধারণত ৯ ও ১০ তারিখের সংমিশ্রণের দিকে।

আশুরার রোজার ফজিলত

হাদিসে এসেছে, রমজানের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের আশা নিয়ে আসে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। শুধুমাত্র ১০ তারিখ একা রোজা রাখাও জায়েজ, তবে ৯ বা ১১ তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে রাখাই অধিক উত্তম ও সুন্নতসম্মত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।

২০২৬ সালে আশুরা উপলক্ষে সরকারি ছুটি

বাংলাদেশে প্রতি বছর আশুরার দিনটি নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে নির্ধারিত থাকে। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী এ বছর ২৬ জুন ২০২৬ (শুক্রবার) আশুরা উপলক্ষে সরকারি ছুটি কার্যকর থাকবে। যেহেতু এই তারিখটি এমনিতেই সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে পড়েছে, তাই অতিরিক্ত বাড়তি ছুটির সুযোগ এ বছর তৈরি হচ্ছে না, তবে শুক্র-শনি মিলিয়ে দুই দিনের বিরতি পাওয়া যাবে।

মহররম মাসে করণীয় কিছু আমল

  • নফল রোজা রাখা, বিশেষত ৯-১০ অথবা ১০-১১ মহররম।
  • অতিরিক্ত নফল নামাজ, জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করা।
  • দান-সদকা করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
  • পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হওয়া।
  • ইস্তিগফার ও তওবার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা।
  • অহেতুক বিবাদ-সংঘাত এড়িয়ে চলা, যেহেতু মহররম একটি সম্মানিত মাস হিসেবে বিবেচিত।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: মহররমের ১০ তারিখ ২০২৬ সালে কোন দিন পড়েছে? উত্তর: বাংলাদেশে মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরা পড়েছে ২৬ জুন ২০২৬, শুক্রবার।

প্রশ্ন: আশুরা ও মহররমের ১০ তারিখ কি একই জিনিস? উত্তর: হ্যাঁ। আশুরা মানে হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররমের দশম দিন, দুটি শব্দ একই দিনকে নির্দেশ করে।

প্রশ্ন: সৌদি আরব ও বাংলাদেশের আশুরার তারিখে কেন পার্থক্য থাকে? উত্তর: চাঁদ দেখা যাওয়ার ভৌগোলিক অবস্থানের পার্থক্যের কারণে দুই দেশের মহররম মাস শুরুর তারিখে এক দিনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে, ফলে আশুরার তারিখেও একদিনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

প্রশ্ন: আশুরার দিন কি রোজা রাখা ফরজ? উত্তর: না, আশুরার রোজা ফরজ নয়, এটি একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত আমল হিসেবে বিবেচিত।

প্রশ্ন: শুধু ১০ মহররম একদিন রোজা রাখলে কি হবে? উত্তর: শুধু ১০ তারিখ রোজা রাখা জায়েজ আছে, তবে হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী এর সঙ্গে ৯ বা ১১ তারিখ যোগ করে রোজা রাখা অধিক উত্তম।

প্রশ্ন: ২০২৬ সালে মহররম মাস কবে শেষ হবে? উত্তর: চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে মহররম মাস আনুমানিক ১৪ অথবা ১৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

প্রশ্ন: আশুরা উপলক্ষে বাংলাদেশে কি সরকারি ছুটি আছে? উত্তর: হ্যাঁ, প্রতি বছরের মতো এ বছরও নির্বাহী আদেশে ২৬ জুন ২০২৬ আশুরার দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে।

শেষকথা

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী ২০২৬ সালে মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ পবিত্র আশুরা পড়েছে ২৬ জুন, শুক্রবার, যেখানে সৌদি আরবসহ অনেক দেশে এটি পালিত হয়েছে একদিন আগে, ২৫ জুন বৃহস্পতিবার। নিজ দেশের সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করে রোজা ও অন্যান্য আমল পালন করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সঠিক পন্থা। তারিখ যেহেতু চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল, তাই প্রতিবছর সর্বশেষ তথ্যের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সরকারি ঘোষণা যাচাই করে নেওয়াই উত্তম।

তথ্যসূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ১৬ জুন ২০২৬ তারিখের সরকারি ঘোষণা; দেশীয় গণমাধ্যম (বাংলা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, ইত্তেফাক, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা)-এর প্রতিবেদন।

এই কনটেন্টটি সরকারি ঘোষণা ও একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নতুন কোনো সরকারি সংশোধনী এলে তা অনুযায়ী আপডেট করা হবে। ধর্মীয় বিধান সংক্রান্ত যেকোনো জটিল প্রশ্নে স্থানীয় আলেম বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

Leave a Comment

Scroll to Top