বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চাকরির ক্ষেত্রে কোটা বৈষম্য দূর করা। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আসন্ন বাজেটে সব খাতের বৈষম্য দূরীকরণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ (প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট) চাঙ্গা করতে জ্বালানি খাত, ট্যাক্স ও কাস্টমস সংস্কার এবং লজিস্টিকস অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দ প্রয়োজন। একই সাথে ধনী-দরিদ্রের আয়ের বৈষম্য কমাতে ‘প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্স’ বা প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা এবং লাক্সারি পণ্যে উচ্চ ট্যারিফ আরোপের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা হলো একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামো। বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ধনী-দরিদ্রের আয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই জনকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখেই সরকার আসন্ন বাজেটের রূপরেখা সাজাচ্ছে।
📉 অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে পুনরুদ্ধার: সরকারের পরিকল্পনা
অর্থনৈতিক মন্দা ও বিনিয়োগের ঋণাত্মক পর্যায় থেকে দেশকে টেনে তুলতে সরকার বেশ কিছু বিনিয়োগবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রীদের মতে, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
- উৎপাদন বৃদ্ধি: করের হার না বাড়িয়েই অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির জন্য উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
- বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ: উৎপাদন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা অর্থনীতিকে পুনর্গঠনে সহায়তা করবে।
- বৈষম্য দূরীকরণ: সব খাতের বৈষম্য দূর করতে আসন্ন বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
⚡ বেসরকারি বিনিয়োগ (Private Investment) চাঙ্গা করার কৌশল
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে বাজেটে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দ রাখতে হবে:
- জাঁলানি খাতের সক্ষমতা: বেসরকারি বিনিয়োগকে চাঙ্গা করতে জ্বালানি খাতে ইমিডিয়েট (তাত্ক্ষণিক) এবং লং টার্ম (দীর্ঘমেয়াদি) ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি।
- ট্যাক্স ও কাস্টমস সংস্কার: বর্তমান ট্যাক্স এবং কাস্টমস ব্যবস্থার জটিলতা ও সমস্যাগুলো দ্রুত দূর করে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে হবে।
- অবকাঠামোগত উন্নয়ন: লজিস্টিকস অবকাঠামো, পোর্ট (বন্দর) এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। যদিও এসবের ফলাফল পেতে ২ থেকে ৩ বছর সময় লাগতে পারে, তবুও এই বাজেট থেকেই কাজ শুরু করা দরকার।
💼 তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ৩টি কার্যকর পদক্ষেপ
বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান এমনিতেই বাড়বে। তবে বর্তমান বেকারত্ব সমস্যার তাৎক্ষণিক (Immediate) সমাধানের জন্য অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ কিছু শর্ট-টার্ম স্কিম বা সরকারি প্রকল্পের পরামর্শ দিয়েছেন:
- রুরাল এমপ্লয়মেন্ট (গ্রামীণ কর্মসংস্থান): গ্রামীণ এলাকার অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে বিশেষ সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা।
- তরুণ ও নারী কর্মসংস্থান: যুবসমাজ এবং নারীদের জন্য ‘এমপ্লয়মেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট স্কিম’ বা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সহায়ক বিশেষ উদ্যোগ বাজেটে রাখা।
- বন্ধ কলকারখানা চালু: যেসব যোগ্য কলকারখানা ঋণের অনিয়ম বা দুর্নীতির কারণে নয়, বরং অন্য কোনো কারণে বন্ধ রয়েছে, সেগুলোকে পুনরায় চালু করে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
💰 আয় বৈষম্য কমাতে ‘প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্স’ ব্যবস্থার তাগিদ
ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের ব্যবধান কমানো জনরোষ প্রশমনের অন্যতম প্রধান শর্ত। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর ব্যবস্থা আয়ের বৈষম্য কমাতে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এর জন্য দরকার একটি কার্যকরী প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন (Progressive Taxation) বা প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা:
“যত দ্রুত আমরা মানুষের ইনকাম লেভেল বা এক্সপেন্ডিচার (ব্যয়) লেভেলের সাথে ট্যাক্স ও ভ্যাট ব্যবস্থাকে লিংক বা সংযুক্ত করতে না পারব, ততদিন বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। এছাড়া, বিলাসজাত বা লাক্সারি প্রোডাক্টের (Luxury Products) ওপর উচ্চ ট্যারিফ আরোপ না করলে করের মাধ্যমে সমাজে সমতা (Equality) আনার প্রচেষ্টা সফল হবে না।”
❓ আপনার জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনের মূল অর্থনৈতিক দাবি কী ছিল?
তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, চাকরির ক্ষেত্রে কোটা বৈষম্য দূর করা এবং ধনী-দরিদ্রের আয়ের বৈষম্য কমিয়ে আনা ছিল অন্যতম প্রধান দাবি।
২. বিনিয়োগ বাড়াতে আসন্ন বাজেটে কোন কোন খাতের সংস্কার প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ট্যাক্স ও কাস্টমসের সমস্যা দূরীকরণ এবং পোর্ট ও মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টের মতো লজিস্টিকস অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন।
৩. তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বাজেটে কী ধরনের প্রকল্প রাখা উচিত?
গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরি, যুব ও নারীদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি স্কিম এবং বন্ধ থাকা যোগ্য কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ বাজেটে থাকা উচিত।
৪. ‘প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্স ব্যবস্থা’ বা প্রগতিশীল কর বলতে কী বোঝায়?
এটি এমন একটি কর ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তির আয় বা ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে করের হারও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, ধনীদের ওপর বেশি কর এবং দরিদ্রদের ওপর করের বোঝা কম থাকে, যা সমাজে সমতা আনে।
৫. লাক্সারি বা বিলাসজাত পণ্যে উচ্চ ট্যারিফ কেন প্রয়োজন?
লাক্সারি পণ্যে উচ্চ ট্যারিফ বা কর আরোপ না করলে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা সফল হয় না, যার ফলে ট্যাক্সের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সোর্স: কাজী ফরিদ আহমদ, বৈশাখী সংবাদ, ঢাকা
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”