নির্জলা একাদশী ২০২৬ পালিত হবে বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে। এটি জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথি। একাদশী তিথি শুরু হবে ২৪ জুন সন্ধ্যা ৬:১২ মিনিটে এবং শেষ হবে ২৫ জুন রাত ৮:০৯ মিনিটে। পারণ (উপবাস ভাঙার) সময়: ২৬ জুন ভোর ৫:৪৭ থেকে সকাল ৮:২৮ এর মধ্যে।
নির্জলা একাদশী ২০২৬: এক নজরে তারিখ ও সময়
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| একাদশী তারিখ | ২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার |
| বাংলা তারিখ | ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ |
| একাদশী তিথি শুরু | ২৪ জুন, সন্ধ্যা ৬:১২ |
| একাদশী তিথি শেষ | ২৫ জুন, রাত ৮:০৯ |
| পারণের সময় | ২৬ জুন, ভোর ৫:৪৭ – সকাল ৮:২৮ |
| অধিষ্ঠাত্রী দেবতা | ত্রিবিক্রম (বিষ্ণু) |
| অপর নাম | ভীমসেনী একাদশী, পাণ্ডব নির্জলা একাদশী, পাপনাশিনী একাদশী |
বাংলাদেশের ভক্তদের জন্য নোট: বাংলাদেশ সময় ভারতের IST-র চেয়ে ৩০ মিনিট এগিয়ে। স্থানীয় পঞ্জিকা বা ekadashibarta.com দেখে নিজের এলাকার সঠিক সময় যাচাই করে নিন।
নির্জলা একাদশী কী?
নির্জলা একাদশী হলো বছরের সবচেয়ে কঠিন ও পুণ্যময় উপবাস। “নির্জলা” শব্দের অর্থ জল ছাড়া। এই ব্রতে সারাদিন না খেয়ে, এমনকি এক ফোঁটা জলও পান না করে উপবাস পালন করতে হয়।
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, এই একটি ব্রত পালন করলেই বছরের সমস্ত ২৪টি একাদশীর পুণ্য একসাথে পাওয়া যায়। তাই যারা প্রতিটি একাদশী পালন করতে পারেন না, তাদের জন্য নির্জলা একাদশী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই তিথি প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষে আসে — বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারে যা সাধারণত মে বা জুন মাসে পড়ে।
নির্জলা একাদশীর গল্প — মহাভারতের ভীমের কাহিনি
এই ব্রতের পেছনে রয়েছে একটি চমৎকার পৌরাণিক কাহিনি।
মহাভারতের পাণ্ডব ভাই ভীম ছিলেন অসাধারণ শক্তিশালী, কিন্তু তার ছিল প্রচণ্ড ক্ষুধা। তার অন্য ভাইরা — যুধিষ্ঠির, অর্জুন, নকুল, সহদেব — এবং দ্রৌপদী প্রতিটি একাদশী উপবাস পালন করতেন। কিন্তু ভীম ক্ষুধার কারণে উপবাস রাখতে পারতেন না।
এই অপারগতায় মনে কষ্ট নিয়ে ভীম তার পিতামহ মহর্ষি ব্যাসদেবের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন — “আমি কি কোনো উপায়ে সব একাদশীর পুণ্য অর্জন করতে পারি?”
ব্যাসদেব তখন বললেন: “জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষে একটিমাত্র একাদশী আছে — জল পান না করেও, কেবল সেদিনের উপবাস পালনেই তুমি সব একাদশীর সমান ফল পাবে।”
ভীম সেই পরামর্শ মেনে সেই কঠিন উপবাস পালন করেন। তখন থেকেই এই একাদশীকে ভীমসেনী একাদশী বা পাণ্ডব নির্জলা একাদশী বলা হয়।
পদ্মপুরাণ, ভাগবত পুরাণ ও নারদ পুরাণে এই ব্রতের মাহাত্ম্যের উল্লেখ রয়েছে।
নির্জলা একাদশী ব্রতের নিয়ম
দশমীর রাতে (২৪ জুন সন্ধ্যায়)
- সন্ধ্যার আগে হালকা ও সাত্ত্বিক খাবার খান
- পেঁয়াজ, রসুন, মাংস ও মাছ বর্জন করুন
- রাতে তুলসী পাতা ও পূজার ফুল সংগ্রহ করে রাখুন (একাদশীর দিন তুলসী পাতা ছেঁড়া নিষেধ)
- মন শান্ত রাখুন, ভগবানের স্মরণে থাকুন
একাদশীর দিন (২৫ জুন)
ভোরবেলা:
- ভোরে উঠে স্নান করুন
- পরিষ্কার পোশাক পরুন
- ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের সামনে প্রদীপ জ্বালান
- সংকল্প করুন — মনে মনে বলুন এই দিনটি ভগবানের নামে উৎসর্গ করছেন
সারাদিন:
- কোনো খাবার বা জল গ্রহণ করবেন না (সম্পূর্ণ নির্জলা পালনে)
- পূজার সময় আচমনের জন্য মাত্র এক ফোঁটা জল গ্রহণ করা যায়
- বিষ্ণু সহস্রনাম, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র বা ভজন পাঠ করুন
- ব্রতকথা পড়ুন বা শুনুন
- গরিব ও অসহায়দের দান করুন — এই দিনের দানের বিশেষ পুণ্য রয়েছে
রাতে:
- যতটা সম্ভব রাত জেগে ভগবানের নাম জপ করুন
- ঘুমালেও ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে ঘুমান
পারণ — দ্বাদশী তিথিতে (২৬ জুন)
পারণ মানে উপবাস ভাঙা। এটি সঠিক সময়ে করা অত্যন্ত জরুরি।
পারণের সময়: ২৬ জুন, ভোর ৫:৪৭ থেকে সকাল ৮:২৮
পারণের নিয়ম:
- ভোরে উঠে স্নান করুন
- ভগবানকে জল ও ফল অর্পণ করুন
- একজন ব্রাহ্মণ বা গরিব মানুষকে আগে খাওয়ান বা দান করুন
- তারপর নিজে লেবু জল বা তুলসী জল দিয়ে উপবাস ভাঙুন
- হালকা সাত্ত্বিক খাবার দিয়ে শুরু করুন
সতর্কতা: পারণের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপবাস না ভাঙলে ব্রত অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। তাই আগের রাতেই অ্যালার্ম সেট করে রাখুন।
নির্জলা একাদশীর মন্ত্র
বিষ্ণুর ধ্যান মন্ত্র:
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র:
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
এই মন্ত্রগুলো সারাদিন মনে মনে বা জোরে জপ করতে পারেন।
নির্জলা একাদশীতে কী করা যাবে, কী যাবে না
✅ করণীয়
- সারাদিন ভগবানের নাম জপ করুন
- বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ করুন
- দান করুন — বিশেষত জল, ছাতা, পাখা, ফল
- বয়োজ্যেষ্ঠ ও গরিবদের সেবা করুন
- সত্য কথা বলুন
- ব্রতকথা পাঠ বা শ্রবণ করুন
❌ নিষিদ্ধ
- কোনো খাবার বা জল গ্রহণ (নির্জলা পালনে)
- পেঁয়াজ, রসুন, মাংস, মাছ
- তুলসী পাতা ছেঁড়া
- মিথ্যা কথা, পরনিন্দা ও ঝগড়া
- ক্রোধ প্রকাশ
- চুল ও নখ কাটা
- যৌন সম্পর্ক
- দিনের বেলা ঘুমানো
অসুস্থ বা বয়স্কদের জন্য বিকল্প উপায়
সম্পূর্ণ নির্জলা উপবাস সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এতে লজ্জার কিছু নেই। শাস্ত্রে বলা আছে, সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রত পালন করাই সর্বোত্তম।
বিকল্প পদ্ধতি:
- ফলাহারী ব্রত — শুধু ফল ও দুধ খেয়ে উপবাস
- নিরামিষ ব্রত — অন্ন বর্জন করে ফল, সবজি ও দুধ গ্রহণ
- আংশিক উপবাস — একবেলা খেয়ে বাকি সময় উপবাস
গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস রোগী, উচ্চ রক্তচাপের রোগী এবং শিশুদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্রত পালন করা উচিত।
নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব
পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, নির্জলা একাদশীর ব্রত পালনে:
- বছরের সমস্ত ২৪টি একাদশীর সমান পুণ্য লাভ হয়
- পাপ মোচন হয়
- মৃত্যুর পরে বৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি হয়
- এই দিনের দান — বিশেষত জল, ছাতা, জুতা — অশেষ পুণ্যদায়ক
- মনের শান্তি ও মানসিক শুদ্ধি লাভ হয়
গ্রীষ্মকালের তীব্র দাবদাহে সারাদিন জল ছাড়া থাকা কঠিন হলেও, এই কষ্টটাই এই ব্রতের বিশেষত্ব। ভক্তি ও বিশ্বাসের সাথে পালন করা এই উপবাস আত্মার শক্তিকে জাগিয়ে তোলে।
নির্জলা একাদশী ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু পরিবারগুলো প্রতি বছর এই ব্রত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, চট্টগ্রামের শ্রীশ্রী পতেঙ্গা সীতাকুণ্ড মন্দির, সিলেটসহ সারা দেশের বিষ্ণু মন্দিরগুলোতে এই দিনে বিশেষ পূজা-অর্চনা হয়।
বাংলাদেশে সময় নির্ধারণে স্থানীয় পঞ্জিকা বা ekadashibarta.com ওয়েবসাইট অনুসরণ করা ভালো, কারণ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
এই তথ্যটি পরে দরকার হলে সেভ করে রাখুন বা পরিবারের সদস্যদের সাথে শেয়ার করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
১. নির্জলা একাদশী ২০২৬ কত তারিখে?
নির্জলা একাদশী ২০২৬ সালের ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার) পালিত হবে। বাংলা তারিখ: ১১ আষাঢ় ১৪৩৩।
২. নির্জলা একাদশী পারণের সময় কখন ২০২৬ সালে?
২০২৬ সালে পারণের সময় হলো ২৬ জুন ভোর ৫:৪৭ থেকে সকাল ৮:২৮ পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে উপবাস ভাঙতে হবে।
৩. নির্জলা একাদশীতে কি সত্যিই জল পান করা যায় না?
সম্পূর্ণ নির্জলা পালনে কোনো জল পান করা যায় না। তবে পূজার সময় আচমনের জন্য এক ফোঁটা জল গ্রহণ করা যায়। যারা স্বাস্থ্যগত কারণে পারেন না, তারা ফলাহারী ব্রত করতে পারেন।
৪. নির্জলা একাদশীর আরেক নাম কী?
ভীমসেনী একাদশী, পাণ্ডব নির্জলা একাদশী, এবং পাপনাশিনী একাদশী — এই নামেও এটি পরিচিত।
৫. নির্জলা একাদশীতে কী দান করলে পুণ্য হয়?
গ্রীষ্মকালে পালিত এই ব্রতে জল, ছাতা, জুতা-চপ্পল ও পাখা দান করা বিশেষ পুণ্যদায়ক বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
৬. নির্জলা একাদশী কি সব হিন্দু পালন করেন?
এটি মূলত বৈষ্ণব ও স্মার্ত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পালন করেন। ইসকন মতাবলম্বীরাও এই দিনটি বিশেষ মর্যাদায় পালন করেন।
৭. অসুস্থ ব্যক্তি কি নির্জলা একাদশী পালন করতে পারবেন?
অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য সম্পূর্ণ নির্জলা উপবাস বাধ্যতামূলক নয়। তারা ফলাহারী বা আংশিক উপবাস করতে পারেন। ওষুধ খেতে হলে সামান্য জল পান করাও গ্রহণযোগ্য।
৮. নির্জলা একাদশীর পরদিন কী করতে হয়?
দ্বাদশী তিথিতে নির্ধারিত সময়ে পারণ করতে হয়। একজন ব্রাহ্মণ বা দরিদ্র মানুষকে দান করে তারপর নিজে উপবাস ভাঙতে হয়।
নির্জলা একাদশী ২০২৬ পালিত হবে ২৫ জুন, বৃহস্পতিবার। পারণ করতে হবে ২৬ জুন ভোর ৫:৪৭ থেকে সকাল ৮:২৮-এর মধ্যে। এটি জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী, যা ভীমসেনী একাদশী বা পাণ্ডব নির্জলা একাদশী নামেও পরিচিত। এই ব্রতে সারাদিন জল ও খাবার বর্জন করতে হয়। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, এই একটি ব্রত পালনেই বছরের সকল ২৪টি একাদশীর সমান পুণ্য অর্জন হয়। অসুস্থ বা বয়স্করা ফলাহারী বা আংশিক উপবাসও করতে পারেন।
Reference / Source List
১. ekadashibarta.com — বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী একাদশী তালিকা (নবযুগ পঞ্জিকা ও ISKCON উৎস ভিত্তিক)
২. drikpanchang.com — Dhaka, Bangladesh-এর জন্য ISKCON একাদশী তালিকা ২০২৬
৩. prokerala.com — নির্জলা একাদশী ২০২৬ তিথি ও পারণ সময়
৪. পদ্মপুরাণ — নির্জলা একাদশীর মাহাত্ম্য ও ব্রতকথার মূল শাস্ত্রীয় উৎস
৫. নবযুগ পঞ্জিকা — বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রামাণিক হিন্দু পঞ্জিকা