পরমা একাদশী ২০২৬: তারিখ, পারণের সময়, নিয়ম ও ব্রত কথা

পরমা একাদশী ২০২৬

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জীবনে একাদশী ব্রত পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনি যদি পরমা একাদশী ২০২৬ কবে, এর সঠিক তারিখ এবং বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ব্রত পারণের সময়সূচী খুঁজছেন, তবে আপনি একেবারে সঠিক জায়গায় এসেছেন।

২০২৬ সালে পরমা একাদশী অনুষ্ঠিত হবে ১১ জুন, বৃহস্পতিবার। এটি সাধারণ কোনো একাদশী নয়; এটি প্রতি তিন বছর পর পর আসা ‘অধিক মাস’ বা ‘পুরুষোত্তম মাস’-এর একটি অত্যন্ত বিরল ও বিশেষ একাদশী। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী এই ব্রত ভাঙার বা পারণের সঠিক সময় হলো পরের দিন, অর্থাৎ ১২ জুন, শুক্রবার ভোর ০৫:১০ মিনিট থেকে সকাল ০৯:৪২ মিনিটের মধ্যে

এই আর্টিকেলে আমরা পরমা একাদশী পালনের সঠিক নিয়ম, মাহাত্ম্য এবং আপনার মনে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ও শাস্ত্রীয় সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পরমা একাদশী ২০২৬ কবে?

যেকোনো ব্রত পালনের জন্য সঠিক তিথি ও সময় জানাটা সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশের পঞ্জিকা এবং ইসকন (ISKCON) ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরমা একাদশীর সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:

  • একাদশীর নাম: পরমা একাদশী (অধিক মাস/পুরুষোত্তম মাস)
  • একাদশীর তারিখ: ১১ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার)
  • পক্ষ: অধিক জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষ
  • পারণের তারিখ: ১২ জুন ২০২৬ (শুক্রবার)
  • পারণের সঠিক সময় (বাংলাদেশ): ভোর ০৫:১০ মিনিট থেকে সকাল ০৯:৪২ মিনিটের মধ্যে। (অবশ্যই এই সময়ের মধ্যে উপবাস ভঙ্গ করতে হবে)।

পরমা একাদশীর আধ্যাত্মিক উপকারিতা

শাস্ত্র ও ভক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এই ব্রতের কয়েকটি সুফল উল্লেখযোগ্য:

  • পাপমুক্তি: এই জন্ম ও পূর্বজন্মের পাপকর্ম বিনষ্ট হয়
  • দারিদ্র্য নাশ: আর্থিক সংকট থেকে মুক্তির পথ খুলে যায়
  • মোক্ষলাভ: বৈকুণ্ঠধামে প্রবেশের পথ সহজ হয়
  • পূর্বপুরুষের শান্তি: মৃত পিতৃপুরুষদের আত্মা শান্তি পায়
  • মনের শান্তি ও একাগ্রতা বৃদ্ধি: উপবাসের মাধ্যমে মন ও শরীর শুদ্ধ হয়

বাংলাদেশে পরমা একাদশী পালনের প্রচলন

বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায় একাদশী ব্রতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ সারা দেশের মন্দিরগুলোতে এই দিনে বিশেষ পূজা ও কীর্তনের আয়োজন হয়।

ইসকন বাংলাদেশ তাদের সকল কেন্দ্রে পরমা একাদশীর দিন বিশেষ ভজন, হরিনাম ও প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা করে। পুরুষোত্তম মাসের এই বিশেষ একাদশী অনেক ভক্তই প্রথমবার পালন করেন — কারণ জীবনে বার বার এই সুযোগ আসে না।

পরমা একাদশী কী এবং কেন এটি এত বিশেষ?

সাধারণত প্রতি বছর ২৪টি একাদশী থাকে। কিন্তু প্রতি তিন বছর পর পর হিন্দু চান্দ্র ক্যালেন্ডারের সাথে সৌর ক্যালেন্ডারের সামঞ্জস্য রাখতে একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করা হয়, যাকে ‘অধিক মাস’, ‘মল মাস’ বা ‘পুরুষোত্তম মাস’ বলা হয়। ২০২৬ সালে এই অধিক মাসটি পড়েছে ১৭ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত (অধিক জ্যৈষ্ঠ মাস)।

এই পুরুষোত্তম মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীই হলো পরমা একাদশী। যেহেতু এই একাদশী তিন বছরে মাত্র একবার আসে, তাই এর আধ্যাত্মিক মূল্য ও ফল সাধারণ একাদশীর চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রত পালন করলে চরম দারিদ্র্য দূর হয়, পূর্ব জন্মের পাপ খণ্ডিত হয় এবং ভগবান বিষ্ণুর অসীম কৃপায় জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি নেমে আসে।

পরমা একাদশী ব্রত পালনের নিয়ম

শাস্ত্র অনুযায়ী সঠিক নিয়ম মেনে ব্রত পালন করলেই পূর্ণ ফল লাভ করা যায়। নিচে অত্যন্ত সহজভাবে ব্রত পালনের ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:

১. আগের দিনের প্রস্তুতি (দশমী)

একাদশীর আগের দিন অর্থাৎ দশমীতে সূর্যাস্তের পর থেকেই ব্রতের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়। রাতে অবশ্যই নিরামিষ এবং হালকা খাবার গ্রহণ করা উচিত। দশমীর রাতে চাল বা ভারী খাবার পরিহার করাই উত্তম।

২. একাদশীর দিন (উপবাস ও পূজা)

  • স্নান ও সংকল্প: ১১ জুন সকালে সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করুন। এরপর ভগবান বিষ্ণুর সামনে বসে ব্রত পালনের সংকল্প গ্রহণ করুন।
  • পূজা পদ্ধতি: ভগবান শ্রীহরি বা শ্রীকৃষ্ণের মূর্তিতে বা ছবিতে তুলসী পাতা, ফুল, চন্দন ও প্রদীপ দিয়ে ভক্তিভরে পূজা করুন।
  • উপবাসের ধরন: পরমা একাদশীতে নির্জলা (জল ছাড়া) উপবাস করা সর্বোত্তম। তবে শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় অসুস্থ, শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তিরা ফল, দুধ ও জল পান করে উপবাস পালন করতে পারেন।
  • হরিনাম জপ: সারাদিন বিষ্ণু সহস্রনাম, শ্রীমদভগবদ্গীতা পাঠ এবং মহামন্ত্র জপ করুন।

৩. দ্বাদশীর দিন (পারণ বা উপবাস ভঙ্গ)

পরদিন, ১২ জুন শুক্রবার সকালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (০৫:১০ – ০৯:৪২) ভগবানকে অন্ন, ডাল বা শস্যজাতীয় খাবারের ভোগ নিবেদন করে সেই প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে ব্রত বা পারণ সম্পন্ন করুন। পারণের নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে ব্রতের সম্পূর্ণ ফল পাওয়া যায় না।

পরমা একাদশীর বিশেষ মন্ত্র ও পূজা পদ্ধতি

পূজার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ

  • তুলসী পাতা (অবশ্যই)
  • ধূপ ও দীপ
  • হলুদ ফুল বা পদ্মফুল
  • ফলমূল (কলা, নারকেল)
  • গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল
  • বিষ্ণুর মূর্তি বা ছবি

মূল মন্ত্র

ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ নমো নারায়ণায়
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

সম্ভব হলে সারাদিন ১০৮ বার মূল মন্ত্র জপ করুন এবং বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ করুন।

এই দিনে কী কী খাবেন এবং কী বর্জন করবেন?

যেকোনো একাদশীতে খাদ্যাভ্যাসের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।

কী খাবেন (যারা নির্জলা থাকতে পারবেন না):

  • তাজা ফলমূল (কলা, আপেল, পেঁপে ইত্যাদি)
  • দুধ, দই ও ছানা
  • বাদাম ও সাবুদানা
  • বিশুদ্ধ জল

কী সম্পূর্ণ বর্জন করবেন:

  • সব ধরনের চাল, গম, ডাল এবং শস্যদানা
  • পেঁয়াজ, রসুন ও যেকোনো ধরনের আমিষ খাবার
  • সরিষার তেল বা প্রক্রিয়াজাত খাবার
  • যেকোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য

পরমা একাদশীর ব্রত কথা ও তাৎপর্য

প্রাচীন কালে সুমেধা নামক এক অত্যন্ত ধার্মিক ব্রাহ্মণ এবং তার স্ত্রী পবিত্রা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন পার করছিলেন। দারিদ্র্য সত্ত্বেও তারা কখনো তাদের বাড়িতে আসা অতিথিদের খালি হাতে ফেরাতেন না। একসময় অভাবের তাড়নায় সুমেধা বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন, কিন্তু তার স্ত্রী পবিত্রা তাকে বুঝিয়ে বলেন যে পূর্ব জন্মের কর্মফল ছাড়া সম্পদ লাভ সম্ভব নয়।

এমন সময় তাদের কুটিরে মহর্ষি কৌণ্ডিন্য উপস্থিত হন। ব্রাহ্মণ দম্পতি তাদের সাধ্যমতো ঋষির সেবা করেন। ঋষি তাদের ভক্তি দেখে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের এই দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে পুরুষোত্তম মাসের পরমা একাদশী ব্রত পালনের উপদেশ দেন। ঋষির নির্দেশমতো তারা নিষ্ঠার সাথে এই ব্রত পালন করেন এবং ভগবান শ্রীহরির কৃপায় তাদের সমস্ত দারিদ্র্য দূর হয়। তারা ধন-সম্পদে পূর্ণ হয়ে সুখের জীবন কাটান এবং পরিশেষে বৈকুণ্ঠ লাভ করেন।

এই ব্রত কথার মূল শিক্ষা হলো— ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে পরমা একাদশী পালন করলে মানুষের জাগতিক অভাব দূর হয় এবং আত্মিক শান্তি মেলে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. পরমা একাদশী কি প্রতি বছর আসে?
না। পরমা একাদশী কেবল ‘অধিক মাস’ বা ‘পুরুষোত্তম মাসে’ আসে, যা প্রতি ৩২ থেকে ৩৩ মাস (প্রায় ৩ বছর) পর পর হিন্দু ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়। সর্বশেষ এই একাদশী এসেছিল ২০২৩ সালে এবং পরবর্তীটি ২০২৬ সালের ১১ জুন অনুষ্ঠিত হবে।

২. ২০২৬ সালের অধিক মাস বা মল মাস কবে থেকে কবে?
২০২৬ সালে অধিক জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হবে ১৭ মে এবং শেষ হবে ১৫ জুন। এই সময়টিতে বিবাহ, গৃহপ্রবেশের মতো মাঙ্গলিক কাজ বন্ধ থাকলেও জপ, ধ্যান ও দান-ধ্যানের জন্য এটি সবচেয়ে শুভ সময়।

৩. একাদশীতে কি জল পান করা যায়?
পরমা একাদশীতে নির্জলা (জল পান না করে) থাকার বিধান রয়েছে। তবে শারীরিক সমস্যা থাকলে, গর্ভবতী নারী বা বয়স্করা জল, ফল বা দুধ গ্রহণ করে ব্রত পালন করতে পারেন। আসল বিষয় হলো ভগবানের প্রতি ভক্তি ও একাগ্রতা।

৪. পারণের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্রত না ভাঙলে কী হয়?
শাস্ত্র মতে, দ্বাদশী তিথির হরি বাসর পার হওয়ার পর এবং নির্দিষ্ট পারণ সময়ের মধ্যে ব্রত ভাঙা উচিত। এই সময়ের আগে বা পরে ব্রত ভাঙলে একাদশীর পূর্ণ আধ্যাত্মিক ফল লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

পরিশেষ

পরমা একাদশী ২০২৬ আপনার জীবনের সকল জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বাধা দূর করার এক অনন্য সুযোগ। ১১ জুন বৃহস্পতিবার নিষ্ঠার সাথে এই ব্রত পালন করুন এবং ১২ জুন নির্দিষ্ট সময়ে পারণ সম্পন্ন করুন। মনে রাখবেন, উপবাসের পাশাপাশি মনকে শুদ্ধ রাখা এবং অভাবী মানুষকে দান করাও এই ব্রতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

(তথ্যগুলো বাংলাদেশ সময় ও পঞ্জিকা অনুযায়ী নিখুঁতভাবে যাচাইকৃত। আপনার স্থানীয় এলাকার অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের কারণে পারণের সময়ে ২-৪ মিনিটের সামান্য তারতম্য হতে পারে, তাই আপনার নিকটস্থ ইসকন মন্দির বা স্থানীয় পঞ্জিকা থেকে চূড়ান্ত সময়টি মিলিয়ে নেওয়ার অনুরোধ রইলো।)

তথ্যসূত্র

Sourceshelp

  1. rudraksha-ratna.com
  2. anupamasite.com
  3. hindudata.com
  4. harekrishnamandir.org
  5. bookmypoojaonline.com
  6. indiatimes.com
  7. narayanseva.org
  8. servdharm.com
  9. rudraksha-ratna.com

Leave a Comment

Scroll to Top