শনি জয়ন্তী ২০২৬ কবে?
শনি জয়ন্তী ২০২৬ পালিত হবে ১৬ মে, শনিবার। এটি জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে পড়েছে। এই বছর শনি জয়ন্তী শনিবারে পড়ায় এটি একটি অত্যন্ত দুর্লভ ও বিশেষ সংযোগ, যা বহু বছর পর একবার আসে।
শনি জয়ন্তী ২০২৬ (তারিখ ও সময়সূচি)
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| তারিখ | ১৬ মে ২০২৬, শনিবার |
| তিথি | জ্যৈষ্ঠ অমাবস্যা |
| অমাবস্যা শুরু | ১৬ মে, ভোর ৫টা ১১ মিনিট |
| অমাবস্যা শেষ | ১৭ মে, রাত ১টা ৩০ মিনিট |
| বিশেষ সংযোগ | শনিশ্চরী অমাবস্যা + শনি জয়ন্তী একই দিনে |
এই বছরের বিশেষত্ব হলো — শনি জয়ন্তীর দিনটি নিজেই একটি শনিবার। হিন্দু জ্যোতিষমতে শনিবার হলো শনি গ্রহের নিজস্ব বার। তাই শনিবারে শনির জন্মতিথি পড়া একটি দুর্লভ ঘটনা।
শনি জয়ন্তী কী এবং কেন পালন করা হয়?
শনি জয়ন্তী হলো হিন্দু ধর্মের সূর্যপুত্র শনিদেবের জন্মবার্ষিকী। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়।
ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, শনিদেব হলেন সূর্যদেব এবং তাঁর স্ত্রী ছায়ার পুত্র। জ্যোতিষশাস্ত্রে শনিদেবকে বলা হয় “ন্যায়াধীশ” — অর্থাৎ এমন এক দেবতা যিনি প্রত্যেক প্রাণীকে তার কর্মফল অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তি দেন।
শনি জয়ন্তী পালনের মূল কারণগুলো হলো:
- শনি গ্রহের কুপ্রভাব কমানো (শনির সাড়ে সাতি ও ঢাইয়া থেকে মুক্তি পাওয়া)
- জীবনে শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও কর্মনিষ্ঠা লাভ করা
- পিতৃদোষ থেকে মুক্তি পেতে পিতৃতর্পণ করা
- কর্মফল সংশোধনের জন্য বিশেষ পূজা ও দান করা
২০২৬ সালের শনি জয়ন্তী কেন এত বিশেষ?
এই বছরের শনি জয়ন্তীতে একসাথে তিনটি বিরল সংযোগ তৈরি হয়েছে:
১. শনিশ্চরী অমাবস্যা: শনিবারে অমাবস্যা হওয়ায় এই দিনটি একই সাথে শনিশ্চরী অমাবস্যা হিসেবেও পালিত হবে। এই বিশেষ সংযোগ বহু বছরে একবার আসে।
২. শনিবারে শনির জন্মতিথি: শনিদেবের জন্মতিথি তাঁর নিজের বারে পড়া জ্যোতিষশাস্ত্রে অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত।
৩. বট সাবিত্রী ব্রতের সাথে সংযোগ: এই দিনে একই সাথে বট সাবিত্রী ব্রতও পালিত হবে, যা এই দিনকে দ্বিগুণ পবিত্র করে তুলেছে।
জ্যোতিষশাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, শনি জয়ন্তীর দিন শনি গ্রহ মীন রাশিতে অবস্থান করবে।
শনি জয়ন্তীর পূজার নিয়ম
শনি জয়ন্তীতে পূজা সম্পন্ন করার সঠিক পদ্ধতি:
ধাপ ১ — ভোরে স্নান ও সংকল্প ভোরবেলা ব্রাহ্মমুহূর্তে উঠে স্নান করুন। পরিষ্কার কালো বা নীল রঙের পোশাক পরুন। পূজার সংকল্প নিন।
ধাপ ২ — শনির মূর্তি বা যন্ত্র স্থাপন শনিদেবের মূর্তি বা শনি যন্ত্র পরিষ্কার স্থানে স্থাপন করুন। গঙ্গাজল দিয়ে মূর্তি পরিষ্কার করুন।
ধাপ ৩ — তেলাভিষেক (Tailabhishekam) এটি শনি জয়ন্তীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার। শনি বীজ মন্ত্র জপ করতে করতে মূর্তি বা যন্ত্রে সরিষার তেল ঢালুন।
ধাপ ৪ — পুষ্পার্ঘ্য ও নৈবেদ্য শনিদেবের কাছে কালো ফুল, কালো তিল, কালো কাপড় ও লোহার বস্তু অর্পণ করুন। কালো তিল শনি পূজার অন্যতম প্রধান উপকরণ।
ধাপ ৫ — সরিষার তেলের প্রদীপ মূর্তির সামনে সরিষার তেলের প্রদীপ জ্বালান। সন্ধ্যাকালীন প্রদীপ জ্বালানো বিশেষভাবে শুভফলদায়ী।
ধাপ ৬ — মন্ত্র জপ নিচের মন্ত্রগুলো পাঠ করুন (১০৮ বার)।
ধাপ ৭ — দান ও সেবা দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের মধ্যে কালো তিল, তেল, কালো কাপড় বা ভোজন দান করুন।
শনি জয়ন্তীর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র
শনি জয়ন্তীতে এই মন্ত্রগুলো পাঠ করলে শনিদেবের কৃপা লাভ হয়:
শনি বীজ মন্ত্র:
ওঁ শং শনৈশ্চরায় নমঃ (Om Sham Shanaishcharaye Namah)
শনি গায়ত্রী মন্ত্র:
ওঁ শনৈশ্চরায় বিদ্মহে সূর্যপুত্রায় ধীমহি তন্নো মন্দঃ প্রচোদয়াৎ (Om Sanaischaraya Vidmahe Sooryaputraya Dheemahi Tanno Manda Prachodayata)
শনি স্তোত্র:
নীলাঞ্জন সমাভাসং রবিপুত্রং যমাগ্রজম্ ছায়া মার্তণ্ড সম্ভূতং তং নমামি শনৈশ্চরম্ (Neelanjana Samabhasam Raviputram Yamagrajam Chhaya Martanda Shambhutam Tam Namami Shanaishcharam)
শনি জয়ন্তীতে কী দান করবেন?
শনি জয়ন্তীতে দান করা অত্যন্ত শুভ। বিশেষভাবে উপকারী দানগুলো হলো:
- কালো তিল ও সরিষার তেল
- কালো কাপড় বা জামা
- লোহার বস্তু (ছুরি, কাঁচি ইত্যাদি)
- কালো ডাল (উড়দ বা মাষকলাই)
- অন্ন বা খাদ্যদ্রব্য (দরিদ্রদের মধ্যে)
- জুতো বা চপ্পল
শনির সাড়ে সাতি ও ঢাইয়া থেকে মুক্তির উপায়
যারা বর্তমানে শনির সাড়ে সাতি (Sade Sati) বা ঢাইয়ার প্রভাবে রয়েছেন, তাদের জন্য শনি জয়ন্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।
২০২৬ সালে শনির সাড়ে সাতি চলছে মেষ, মীন ও কুম্ভ রাশিতে। ঢাইয়া চলছে সিংহ ও ধনু রাশিতে।
এই রাশির জাতকদের জন্য শনি জয়ন্তীতে বিশেষ উপায় (Upay):
১. হনুমান চালিশা পাঠ করুন। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শনিদেব হনুমানজীর ভক্তদের কষ্ট দেন না। রাবণ একবার শনিদেবকে বন্দী করেছিলেন, কিন্তু হনুমানজী তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন। সেই থেকে শনিদেব হনুমানভক্তদের কষ্ট না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২. শনিবার সন্ধ্যায় পিপল গাছের নিচে সরিষার তেলের প্রদীপ জ্বালান।
৩. শনি শান্তি হোম বা যজ্ঞ করান। শনি জয়ন্তীর দিন শনি শান্তি হোম করানো বিশেষভাবে ফলপ্রসূ।
৪. শনি যন্ত্র ধারণ করুন (বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতের পরামর্শ অনুযায়ী)।
৫. নীলম (Blue Sapphire) রত্নপাথর ধারণ — তবে অবশ্যই অভিজ্ঞ জ্যোতিষীর পরামর্শ নিয়ে।
বাংলাদেশে শনি জয়ন্তী কীভাবে পালন করবেন?
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য শনি জয়ন্তী পালনের ব্যবহারিক গাইড:
মন্দিরে পূজা দিন: ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন শহরের শনি মন্দির ও বড় হিন্দু মন্দিরগুলোতে এই দিন বিশেষ পূজার আয়োজন থাকে। নিকটস্থ মন্দিরে যোগাযোগ করুন।
ঘরে পূজা করুন: যারা মন্দিরে যেতে পারবেন না, তারা উপরে বর্ণিত ধাপগুলো অনুসরণ করে ঘরেই পূজা করতে পারেন। পূজার জন্য মূল উপকরণ — সরিষার তেল, কালো তিল, কালো ফুল ও একটি প্রদীপ যথেষ্ট।
উপবাস রাখুন: এই দিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস রেখে সন্ধ্যায় শনির পূজা করে উপবাস ভাঙুন।
দান করুন: স্থানীয় মন্দির, এতিমখানা বা অসহায় মানুষদের মধ্যে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় বস্তু দান করুন।
শনিদেব সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনি
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, শনিদেব হলেন সূর্যদেবের পুত্র। তাঁর মাতার নাম ছায়া। শনিদেবের জন্ম হয়েছিল জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে।
শনিদেব সম্পর্কে একটি বিখ্যাত কাহিনি হলো — রাবণ একবার অহংকারবশত শনিদেবকে বন্দী করে ল্যাংকায় আটকে রেখেছিলেন। পরে হনুমানজী লঙ্কাকাণ্ডের সময় শনিদেবকে মুক্ত করেন। কৃতজ্ঞ শনিদেব তখন হনুমানজীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি হনুমানের ভক্তদের কষ্ট দেবেন না।
জ্যোতিষশাস্ত্রে শনি গ্রহ মানুষের পেশাগত জীবন, দীর্ঘায়ু ও শৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণ করে। শনি দুর্বল বা পীড়িত হলে জীবনে বিলম্ব ও বাধা আসে।
শনি জয়ন্তী ও শনিশ্চরী অমাবস্যার পার্থক্য কী?
অনেকেই এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না।
শনি জয়ন্তী প্রতি বছর একবারই আসে — জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায়। এটি শনিদেবের জন্মতিথি।
শনিশ্চরী অমাবস্যা হলো যেকোনো শনিবারে যখন অমাবস্যা পড়ে। এটি বছরে একাধিকবার আসতে পারে।
২০২৬ সালে এই দুটি একই দিনে একসাথে পড়েছে — ১৬ মে শনিবার। তাই এই দিনটি অত্যন্ত শুভ ও দুর্লভ।
ঘরে বসে সহজে শনি পূজা করার পদ্ধতি
অনেক সময় পণ্ডিত পাওয়া সম্ভব হয় না বা সময়-সুবিধা থাকে না। সেক্ষেত্রে এই সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
১. সকালে স্নান করে পরিষ্কার কাপড় পরুন (কালো বা নীল হলে ভালো)। ২. একটি পরিষ্কার স্থানে সরিষার তেলের প্রদীপ জ্বালান। ৩. শনি বীজ মন্ত্র “ওঁ শং শনৈশ্চরায় নমঃ” ১০৮ বার জপ করুন। ৪. হনুমান চালিশা পাঠ করুন। ৫. কালো তিল ও সরিষার তেল কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে দান করুন। ৬. সন্ধ্যায় পিপল গাছের নিচে (বা ঘরের বাইরে) সরিষার তেলের প্রদীপ জ্বালান।
মনে রাখবেন — শনিদেব আচারের চেয়ে আন্তরিকতাকে বেশি মূল্য দেন। ভক্তিভরে যেকোনো আচার পালন করলেই তা ফলদায়ী হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: শনি জয়ন্তী ২০২৬ কত তারিখে? উত্তর: শনি জয়ন্তী ২০২৬ পালিত হবে ১৬ মে ২০২৬, শনিবার। এটি জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে পড়েছে।
প্রশ্ন: শনি জয়ন্তীর দিন কী কী করা উচিত? উত্তর: শনি জয়ন্তীতে ভোরে স্নান করে শনিদেবের পূজা করা, উপবাস রাখা, হনুমান চালিশা পাঠ করা, সরিষার তেলের প্রদীপ জ্বালানো এবং দরিদ্রদের মধ্যে দান করা শুভ।
প্রশ্ন: শনির সাড়ে সাতি কী? উত্তর: সাড়ে সাতি হলো শনি গ্রহের একটি বিশেষ পরিক্রমা যখন শনি কারো জন্মরাশি থেকে একটি আগের, একটি পরের এবং নিজের রাশিতে অবস্থান করে। এই মোট সময়কাল প্রায় সাড়ে সাত বছর।
প্রশ্ন: শনি জয়ন্তীতে কোন রঙের পোশাক পরা উচিত? উত্তর: শনি জয়ন্তীতে কালো বা নীল রঙের পোশাক পরা শুভ বলে মনে করা হয়, কারণ এই রঙ দুটি শনিদেবের প্রিয়।
প্রশ্ন: শনি জয়ন্তীতে কী কী নিষেধ? উত্তর: এই দিনে মাংস-মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। মিথ্যা কথা বলা, ঝগড়া করা ও অপরকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
প্রশ্ন: শনি জয়ন্তী ও শনি অমাবস্যা কি একই জিনিস? উত্তর: শনি জয়ন্তী মূলত জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় পালিত হয়, তাই এটিকে শনি অমাবস্যাও বলা হয়। ২০২৬ সালে এই দিনটি শনিবারে পড়ায় এটি শনিশ্চরী অমাবস্যাও।
প্রশ্ন: শনি জয়ন্তীর দিন কী শনি মন্দিরে যাওয়া আবশ্যক? উত্তর: না, মন্দিরে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। ঘরে বসেও সঠিক নিয়মে পূজা করলে একই ফল পাওয়া যায়।
শেষকথা
শনি জয়ন্তী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয় — এটি আত্মসংযম, কর্তব্যনিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর দিন। শনিদেব আমাদের শেখান যে আমরা কর্মের পথ বেছে নিতে পারি, কিন্তু তার ফল থেকে পালাতে পারি না।
২০২৬ সালের শনি জয়ন্তী একটি বিরল দিন। শনিবারে শনির জন্মতিথি পড়া, সাথে শনিশ্চরী অমাবস্যার সংযোগ — এই দিনে যেকোনো শুভ কাজ, পূজা ও দান বহুগুণে ফলপ্রসূ হয় বলে মনে করা হয়।
সবাইকে শনি জয়ন্তীর শুভেচ্ছা। 🙏
তথ্যসূত্র:
- Asianet News Bangla (bangla.asianetnews.com)
- Om Spiritual Shop (omspiritualshop.com)
- Guruweshvar Shani Foundation (guruweshvarshani.org)
Disclaimer: এই আর্টিকেলে প্রদত্ত তথ্য ধর্মীয় ও জ্যোতিষভিত্তিক বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল। রত্নপাথর বা বিশেষ চিকিৎসামূলক সিদ্ধান্তের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


