বি নাইন সিরাপ এর কাজ কি?
বি নাইন সিরাপ (B-9 Syrup) হলো ফলিক এসিড বা ভিটামিন বি৯-এর একটি তরল রূপ, যা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি বাংলাদেশে তৈরি করে। এই সিরাপের প্রতি ৫ মিলিলিটারে থাকে ২.৫ মিলিগ্রাম ফলিক এসিড।
এটি মূলত তিনটি কারণে ব্যবহার করা হয়:
- রক্তস্বল্পতা (মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া) চিকিৎসায়
- গর্ভাবস্থায় শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্ট প্রতিরোধে
- ফলিক এসিডের ঘাটতি পূরণে
বি নাইন সিরাপ কী? এটি কে তৈরি করে?
বি নাইন সিরাপের পূর্ণ নাম B-9 Oral Solution 2.5 mg/5 ml। এটি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি-এর একটি পণ্য। এর জেনেরিক নাম হলো ফলিক এসিড (Folic Acid), যা ভিটামিন বি৯ নামেও পরিচিত।
বাজারে এটি ১০০ মিলিলিটার বোতলে পাওয়া যায় এবং বর্তমান মূল্য মাত্র ৳৫০ টাকা, যা সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য।
ফলিক এসিড একটি জলে দ্রবণীয় ভিটামিন যা আমাদের শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না, তাই খাবার বা সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।
বি নাইন সিরাপ এর কাজ কি কি?
১. মেগালোব্লাস্টিক রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা
মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া এমন একটি অবস্থা যেখানে লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলিক এসিড রক্তকণিকা তৈরিতে (এরিথ্রোপয়েসিস) সরাসরি ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, শিশু ও পুষ্টিহীন মানুষদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
২. গর্ভাবস্থায় শিশুর সুরক্ষা
এটি বি নাইন সিরাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নিউরাল টিউব ডিফেক্ট (NTD) হলো শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের জন্মগত ত্রুটি, যেমন স্পাইনা বিফিডা এবং অ্যানেন্সেফালি।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, গর্ভধারণের আগে ও গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহে নিয়মিত ফলিক এসিড গ্রহণ এই ধরনের জন্মত্রুটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ২০২৫ সালে Harvard T.H. Chan School of Public Health এবং PubMed-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে NTD-এর হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি। এর পেছনে ফলিক এসিডের ঘাটতি একটি বড় কারণ। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে মাত্র প্রায় ২০% গর্ভবতী মহিলা যথাসময়ে ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন।
৩. ফলিক এসিডের ঘাটতি পূরণ
অপুষ্টি, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, গর্ভাবস্থা বা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে শরীরে ফলিক এসিডের ঘাটতি হতে পারে। বি নাইন সিরাপ এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করে।
৪. শিশুকালীন রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা
ছোট শিশুদের মধ্যে যারা বুকের দুধ পাচ্ছে না বা পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত, তাদের ফলিক এসিডের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় বি নাইন সিরাপ কার্যকর।
৫. হোমোসিস্টাইন নিয়ন্ত্রণ
ফলিক এসিড ভিটামিন বি১২-এর সাথে মিলে রক্তে হোমোসিস্টাইনের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। উচ্চ হোমোসিস্টাইন হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
৬. ডিএনএ ও কোষ বিভাজনে সহায়তা
ফলিক এসিড ডিএনএ ও আরএনএ তৈরিতে এবং কোষের স্বাভাবিক বিভাজনে কো-এনজাইম হিসেবে কাজ করে। দ্রুত বর্ধনশীল টিস্যু, যেমন ভ্রূণ ও গর্ভফুলের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।
বি নাইন সিরাপ কারা খাবেন?
বি নাইন সিরাপ সাধারণত নিচের ক্ষেত্রে ডাক্তার নির্দেশ করেন:
- গর্ভবতী মহিলা বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন এমন মহিলা
- মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া বা ফলেটের অভাবজনিত রক্তসল্পতায় আক্রান্ত রোগী
- আয়রন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া (IDA) এর রোগী
- ফলিক এসিডের ঘাটতিতে ভোগা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক
- মেথোট্রেক্সেট থেরাপি নিচ্ছেন এমন রোগী
- পুষ্টির সাধারণ সাপ্লিমেন্ট হিসেবে (ডাক্তারের পরামর্শে)
বি নাইন সিরাপ খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা
গুরুত্বপূর্ণ: নিচের ডোজ সাধারণ তথ্যের জন্য দেওয়া হয়েছে। সর্বদা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য:
- প্রাথমিক চিকিৎসা: ৪ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ৫ মিলিগ্রাম (অর্থাৎ বি নাইন ২.৫ মিলিগ্রাম/৫ মিলিলিটার সিরাপ থেকে ১০ মিলিলিটার)
- রক্ষণাবেক্ষণ ডোজ: অন্তর্নিহিত রোগের উপর নির্ভর করে প্রতি ১-৭ দিনে ৫ মিলিগ্রাম
গর্ভাবস্থায়:
- স্বাভাবিক ঝুঁকির জন্য প্রতিদিন ০.৪ মিলিগ্রাম (গর্ভধারণের অন্তত ৩ মাস আগে থেকে শুরু করে গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত)
- উচ্চঝুঁকির ক্ষেত্রে (আগে NTD-আক্রান্ত শিশু জন্মেছে, ডায়াবেটিস, মৃগীরোগের ওষুধ গ্রহণকারী) প্রতিদিন ৪-৫ মিলিগ্রাম
শিশুদের জন্য:
- ১ বছরের কম বয়সী: প্রতিদিন ৫০০ মাইক্রোগ্রাম/কেজি শরীরের ওজন অনুযায়ী
- ১ বছরের বেশি বয়সী: প্রাপ্তবয়স্কদের সমপরিমাণ ডোজ
বি নাইন সিরাপের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বি নাইন সিরাপ সাধারণত সুসহনীয় এবং বেশিরভাগ মানুষ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই এটি ব্যবহার করতে পারেন। তবে কদাচিৎ নিচের সমস্যা হতে পারে:
- গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল সমস্যা: বমি ভাব, পেট ব্যথা বা অস্বস্তি
- অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া: অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে ত্বকে ফুসকুড়ি বা চুলকানি
যদি কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কারা বি নাইন সিরাপ এড়িয়ে চলবেন?
নিচের ক্ষেত্রে বি নাইন সিরাপ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে বা চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়:
- যাদের ফলিক এসিড বা এই ফরমুলেশনের কোনো উপাদানের প্রতি অ্যালার্জি আছে
- ফলেট-নির্ভর টিউমার থাকলে (সতর্কতার সাথে ব্যবহার)
- ভিটামিন বি১২-এর অভাবজনিত অনির্ণীত মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় — কারণ এটি স্নায়বিক ক্ষতি আড়াল করতে পারে
- বয়স্ক ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের আগে ভিটামিন বি১২ পরীক্ষা করানো উচিত
গর্ভাবস্থায় বি নাইন সিরাপ কেন এত জরুরি?
বাংলাদেশের অনেক গর্ভবতী মা এখনও জানেন না যে, গর্ভধারণের আগে থেকেই ফলিক এসিড খাওয়া শুরু করা উচিত।
শিশুর নিউরাল টিউব (মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের ভিত্তি) গর্ভধারণের মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায় — অনেক সময় মা বুঝতেই পারেন না যে তিনি গর্ভবতী। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফলিক এসিডের ঘাটতি থাকলে শিশুর মারাত্মক জন্মত্রুটি হতে পারে।
WHO-র নির্দেশনা অনুযায়ী, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে গর্ভধারণের অন্তত ৩ মাস আগে থেকে ফলিক এসিড গ্রহণ শুরু করুন এবং গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিক পর্যন্ত চালিয়ে যান।
বি নাইন সিরাপ সংরক্ষণ পদ্ধতি
- আলো ও আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখুন
- ৩০° সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করুন
- শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন
- ব্যবহারের আগে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ পরীক্ষা করুন
ফলিক এসিড সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাবার
শুধু সাপ্লিমেন্টের উপর নির্ভর না করে নিচের খাবার নিয়মিত খেলে ফলিক এসিডের চাহিদা অনেকটা পূরণ হয়:
- সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, পুঁই শাক, ব্রকলি
- ডালজাতীয় খাবার: মসুর ডাল, ছোলা, মটর ডাল
- ফল: কলা, কমলা, আম
- ডিম ও মুরগির কলিজা
- বাদাম ও বীজ: চিনাবাদাম, সূর্যমুখীর বীজ
তবে রান্নায় ফলিক এসিডের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তাই গর্ভবতী মহিলাদের সাপ্লিমেন্ট নেওয়াই উত্তম।
বি নাইন সিরাপের দাম ও কোথায় পাবেন
- মূল্য: ১০০ মিলিলিটার বোতল — মাত্র ৳৫০ টাকা
- প্রস্তুতকারক: স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি, বাংলাদেশ
- কোথায় পাবেন: সারা বাংলাদেশের যেকোনো রেজিস্টার্ড ফার্মেসিতে
- প্রেসক্রিপশন: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াও পাওয়া যায়, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া সবসময় উচিত
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
হ্যাঁ। ১ বছরের কম বয়সী শিশুকে প্রতিদিন ৫০০ মাইক্রোগ্রাম/কেজি হারে এবং ১ বছরের বেশি বয়সী শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো ডোজে দেওয়া যায়। তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
হ্যাঁ, গর্ভাবস্থায় ও স্তন্যদানকালে বিশেষ কোনো সতর্কতার প্রয়োজন নেই। এটি গর্ভাবস্থায় নিরাপদ এবং উপকারী।
হ্যাঁ, বি নাইন সিরাপের জেনেরিক নাম ফলিক এসিড। ফলিক এসিড হলো ভিটামিন বি৯-এর সিন্থেটিক রূপ যা সাপ্লিমেন্ট ও সমৃদ্ধ খাবারে পাওয়া যায়।
প্রাথমিক চিকিৎসায় সাধারণত ৪ মাস দেওয়া হয়। গর্ভাবস্থায় গর্ভধারণের আগে থেকে শুরু করে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত চলে। নির্দিষ্ট মেয়াদ ডাক্তার নির্ধারণ করবেন।
সাধারণত খাবারের পরে খাওয়া ভালো, তবে গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল সমস্যা না হলে যেকোনো সময় খাওয়া যায়।
ফলিক এসিডের একই জেনেরিকের অনেক ব্র্যান্ড বাজারে আছে। MedEx-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফলিক এসিডের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড পাওয়া যায়। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে যেকোনো নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড বেছে নেওয়া যায়।
না। রক্তস্বল্পতার ধরনের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা আলাদা। ফলিক এসিডের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতায় বি নাইন কার্যকর, কিন্তু আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় আয়রন সাপ্লিমেন্টও প্রয়োজন হয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার দেখানো জরুরি।
শেষকথা
বি নাইন সিরাপ একটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও কার্যকর ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট যা বাংলাদেশে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস তৈরি করে। এটি বিশেষভাবে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিশুর জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
তবে মনে রাখবেন — যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। নিজে নিজে ওষুধ শুরু না করে ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চলুন।
তথ্যসূত্র:
- MedEx Bangladesh — B-9 Oral Solution 2.5 mg/5 ml Product Information
- Square Pharmaceuticals PLC, Bangladesh
- WHO Guidelines on Folic Acid Supplementation in Pregnancy
- Harvard T.H. Chan School of Public Health — Folic Acid and NTD Prevention in Bangladesh
- PubMed: “Best Evidence Summary of Folic Acid Supplementation for Prevention of Neural Tube Defects”
- GPnotebook — Folic Acid and Prophylaxis Against Neural Tube Defects
এই আর্টিকেলটি তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। এটি কোনো চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”


