সীতা নবমী ২০২৬ কবে?
সীতা নবমী ২০২৬ পালিত হবে শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে।
এই দিনটি জানকী নবমী বা সীতা জয়ন্তী নামেও পরিচিত। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী এটি বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে উদযাপিত হয়। ২০২৬ সালে এই তিথি পড়েছে ২৫ এপ্রিল।
এক নজরে সীতা নবমী ২০২৬:
- তারিখ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
- তিথি: বৈশাখ শুক্লপক্ষ নবমী
- নক্ষত্র: পুষ্য নক্ষত্র
- মধ্যাহ্ন পূজার মুহূর্ত (ভারতীয় সময়): সকাল ১১:০১ — দুপুর ১:৩৮
- বাংলাদেশ সময় (IST + ৩০ মিনিট): সকাল ১১:৩১ — দুপুর ২:০৮
- অন্য নাম: সীতা জয়ন্তী, জানকী নবমী, ভূমিজা জয়ন্তী
সীতা নবমী কী এবং কেন পালন করা হয়?
সীতা নবমী হলো দেবী সীতার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পালিত একটি পবিত্র হিন্দু উৎসব। পুরাণ অনুযায়ী, দেবী সীতা — যিনি দেবী লক্ষ্মীর অবতার বলে বিশ্বাস করা হয় — রাজা জনকের হলকর্ষণের সময় মাটির ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছিলেন।
এই দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
- দেবী সীতা ধর্ম, পবিত্রতা, ধৈর্য ও ভক্তির প্রতীক
- সধবা নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় ব্রত পালন করেন
- এই দিন পূজা করলে সুখী দাম্পত্য ও সমৃদ্ধি লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়
- রামায়ণ পাঠ ও ভজনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শুদ্ধি অর্জন করা যায়
সীতা নবমীর পৌরাণিক কাহিনী
রামায়ণ ও পুরাণ অনুযায়ী, বিদেহ রাজ্যের রাজা জনক একদিন তাঁর রাজ্যে হলচাষ করতে গিয়েছিলেন। মাটি কর্ষণ করার সময় লাঙলের ফলা একটি স্বর্ণকলসের সঙ্গে ধাক্কা খায়। সেই কলস থেকে বেরিয়ে আসে এক শিশুকন্যা — যিনি হলেন দেবী সীতা।
দেবী সীতার বিভিন্ন নাম ও তাদের অর্থ:
| নাম | অর্থ |
|---|---|
| সীতা | হলের ফলা দিয়ে কাটা রেখা (সংস্কৃত) |
| জানকী | রাজা জনকের কন্যা |
| মৈথিলী | মিথিলার রাজকন্যা |
| বৈদেহী | বিদেহ রাজ্যের কন্যা |
| ভূমিজা | ভূমি (মাটি) থেকে জন্মানো |
শাস্ত্রমতে, দেবী সীতা মঙ্গলবার পুষ্য নক্ষত্রে জন্মেছিলেন। তিনি ছিলেন দেবী লক্ষ্মীর সাক্ষাৎ অবতার।
সীতা নবমী ২০২৬ — শুভ মুহূর্ত ও পঞ্চাং বিবরণ
মুহূর্তের বিবরণ (ভারতীয় সময় অনুযায়ী)
| মুহূর্ত | সময় (IST) | বাংলাদেশ সময় |
|---|---|---|
| নবমী তিথি শুরু | ২৪ এপ্রিল, রাত ১১:১৪ | ২৪ এপ্রিল, রাত ১১:৪৪ |
| মধ্যাহ্ন পূজার মুহূর্ত শুরু | ২৫ এপ্রিল, সকাল ১১:০১ | সকাল ১১:৩১ |
| মধ্যাহ্ন পূজার মুহূর্ত শেষ | ২৫ এপ্রিল, দুপুর ১:৩৮ | দুপুর ২:০৮ |
| মধ্যাহ্ন মুহূর্ত (সর্বোত্তম) | দুপুর ১২:১৯ | দুপুর ১২:৪৯ |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সীতা নবমীতে মধ্যাহ্ন (দুপুরের সময়) পূজা করাকে সবচেয়ে শুভ বলে ধরা হয়, কারণ দেবী সীতার জন্ম দুপুরের সময় হয়েছিল বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
সীতা নবমীর পূজা পদ্ধতি
ধাপ ১ — ভোরে উঠে স্নান ও প্রস্তুতি
- ভোরে সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠুন
- পবিত্র স্নান সেরে পরিষ্কার হলুদ বা লাল রঙের পোশাক পরুন
- ব্রত পালনের সংকল্প নিন
ধাপ ২ — পূজার আসন তৈরি
- পূজার স্থানে ৪টি কলাগাছের খুঁটি দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করুন
- রঙিন ফুল ও আম পাতা দিয়ে সাজান
- সীতা-রাম ও লক্ষ্মণের মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন
ধাপ ৩ — পূজার উপকরণ
পূজায় যা যা ব্যবহার করবেন:
- তুলসী পাতা ও মঞ্জরী
- হলুদ ও লাল ফুল (বিশেষত পদ্ম বা গাঁদা)
- ফল ও মিষ্টি (পঞ্চফল)
- ঘি দীপ ও ধূপকাঠি
- চন্দন, কুমকুম ও অক্ষত (আঁটা চাল)
- পান-সুপারি
ধাপ ৪ — মন্ত্র পাঠ ও পূজা
মধ্যাহ্ন মুহূর্তে পূজা শুরু করুন। ১০৮ বার নিম্নলিখিত মন্ত্র জপ করুন:
ॐ श्री सीतायै नमः (উচ্চারণ: ওম শ্রী সীতায়ৈ নমঃ)
অথবা সীতা গায়ত্রী মন্ত্র জপ করুন:
ॐ जनकनन्दिनयै विद्महे भूमिजायै धीमहि तन्नो सीता प्रचोदयात्
ধাপ ৫ — রামায়ণ পাঠ ও ভজন
- সুন্দরকাণ্ড বা রামচরিতমানস পাঠ করুন
- সীতারাম ভজন গান করুন
- আরতি করুন
ধাপ ৬ — প্রসাদ বিতরণ
- পূজান্তে ব্রাহ্মণ ও গরিবদের প্রসাদ বিতরণ করুন
- সন্ধ্যায় ব্রত ভাঙুন
সীতা নবমীর ব্রত পালনের নিয়ম
সীতা নবমীতে ব্রত পালন করেন মূলত বিবাহিত নারীরা। ব্রতের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য দেবী সীতার আশীর্বাদ প্রার্থনা করা।
ব্রত পালনে যা মানবেন:
- সারাদিন নির্জলা বা ফলাহারে থাকুন (সাত্ত্বিক খাবার — ফল, দুধ, বাদাম)
- মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকুন
- রসুন, পেঁয়াজ ও আমিষ খাবেন না
- মনে মনে রাম-সীতার নাম জপ করুন
ব্রত ভাঙবেন:
- সন্ধ্যায় পূজার পর প্রসাদ গ্রহণ করে ব্রত ভাঙুন
- সাত্ত্বিক খাবার দিয়ে ব্রত ভাঙা শুভ
সীতা নবমীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
সীতা নবমী শুধু একটি পূজার দিন নয় — এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সুযোগ।
নারীর শক্তি ও আদর্শের প্রতীক
দেবী সীতা হিন্দু ধর্মে আদর্শ নারীত্বের প্রতিমূর্তি। তাঁর জীবনে আমরা দেখি:
- পবিত্রতা ও সততা: বনবাসের কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁর চরিত্রে কোনো কলঙ্ক ছিল না
- ধৈর্য ও সহনশীলতা: অসীম কষ্ট সহ্য করেও ধর্মপথ থেকে বিচ্যুত হননি
- প্রেম ও ভক্তি: শ্রী রামের প্রতি তাঁর প্রেম অপরিসীম
- সাহস: রাবণের বন্দিত্বেও কখনো নিজের মর্যাদা হারাননি
বৈষ্ণব মতে সীতা নবমীর বিশেষত্ব
ISKCON ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রামায়ণ মূলত “সীতায়ন” — এটি শ্রীরামের পাশাপাশি মা সীতার জীবনেরও কাহিনী।
রামা নবমী ও সীতা নবমীর পার্থক্য
অনেকে রাম নবমী ও সীতা নবমীকে একই মনে করেন, কিন্তু এ দুটি আলাদা উৎসব।
| বিষয় | রাম নবমী | সীতা নবমী |
|---|---|---|
| উদযাপনের কারণ | শ্রী রামের জন্মবার্ষিকী | দেবী সীতার জন্মবার্ষিকী |
| মাস | চৈত্র শুক্লপক্ষ নবমী | বৈশাখ শুক্লপক্ষ নবমী |
| ২০২৬ সালের তারিখ | ২৬ মার্চ ২০২৬ | ২৫ এপ্রিল ২০২৬ |
| ব্যবধান | — | রাম নবমীর ঠিক এক মাস পর |
সীতা নবমী ব্রতের উপকারিতা
শাস্ত্র ও ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সীতা নবমীর ব্রত পালনে যা লাভ হয়:
- বৈবাহিক সুখ ও স্থায়িত্ব লাভ হয়
- স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা পূর্ণ হয়
- সন্তান প্রাপ্তির আশীর্বাদ পাওয়া যায়
- গৃহে সমৃদ্ধি ও শান্তি বিরাজ করে
- কামনা-বাসনা পূর্ণ হওয়ার বিশ্বাস রয়েছে
- মনের নেতিবাচকতা দূর হয় ও আত্মিক শুদ্ধি লাভ হয়
বাংলাদেশে সীতা নবমী উদযাপন
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে সীতা নবমী একটি বিশেষ ধর্মীয় দিন। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের রাম-সীতা মন্দিরে বিশেষ পূজা, ভজন ও সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশে উদযাপনের বৈশিষ্ট্য:
- সকালে মন্দিরে বিশেষ মহাঅভিষেক পূজা
- সারাদিন রামায়ণ পাঠ ও সংকীর্তন
- বিবাহিত নারীদের বিশেষ ব্রত পালন
- সন্ধ্যায় আরতি ও প্রসাদ বিতরণ
- ইসকন বাংলাদেশের মন্দিরে বিশেষ অনুষ্ঠান
বিশ্বের বিখ্যাত স্থান যেখানে সীতা নবমী বিশেষভাবে পালিত হয়
- জানকী মন্দির, নেপাল (জনকপুর): মা সীতার জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত জনকপুরে এটি সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়
- রাম জন্মভূমি, অযোধ্যা: রাম ও সীতা দুজনের নবমী এখানে মহাসমারোহে পালিত হয়
- ভদ্রাচলম শ্রী রাম মন্দির (তেলেঙ্গানা): মহাঅভিষেক ও শৃঙ্গার দর্শনের আয়োজন হয়
- রামেশ্বরম মন্দির: শ্রী রামের যাত্রাপথে এই মন্দির সীতার স্মৃতিতে বিশেষ পূজা করে
সীতা নবমীতে কী করবেন, কী করবেন না
✅ করবেন:
- সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠুন
- পবিত্র স্নান করুন
- মন্দিরে গিয়ে দেবী সীতার দর্শন নিন
- রামায়ণ ও সুন্দরকাণ্ড পাঠ করুন
- গরিব ও অসহায়দের দান করুন
- সাত্ত্বিক ভোজন গ্রহণ করুন
❌ করবেন না:
- আমিষ খাবার ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন
- মিথ্যা বলা ও মন্দ চিন্তা পরিহার করুন
- পরনিন্দা ও ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলুন
- এই দিন রান্নায় রসুন ও পেঁয়াজ ব্যবহার না করাই উত্তম
সীতা নবমীতে দেবী সীতার বিশেষ মন্ত্র
১. সীতা গায়ত্রী মন্ত্র:
ॐ जानकीदेव्यै विद्महे, भूमिजायै धीमहि, तन्नो सीता प्रचोदयात्।
২. সীতা বন্দনা:
উদ্ভব-স্থিতি-বিনাশানাং, শক্তিভূতে সনাতনে। গুণাশ্রয়ে গুণময়ে, নারায়ণি নমোহস্তুতে।।
৩. সহজ জপ মন্ত্র:
জয় সীতারাম, জয় সীতারাম (বারংবার জপ করুন)
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
২০২৬ সালে সীতা নবমী পালিত হবে ২৫ এপ্রিল ২০২৬ (শনিবার)। এটি বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে পড়েছে।
হ্যাঁ, সীতা নবমী ও জানকী নবমী একই উৎসব। দেবী সীতার বিভিন্ন নামের মধ্যে “জানকী” অন্যতম। এই দুটি নামই তাঁর জন্মবার্ষিকীকে বোঝায়।
মূলত বিবাহিত নারীরা সীতা নবমীর ব্রত পালন করেন, স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সুখী দাম্পত্যের কামনায়। তবে অবিবাহিত নারীরাও ভালো স্বামীর আশীর্বাদ পেতে এই ব্রত করতে পারেন।
ব্রত পালনকারীরা সারাদিন ফলাহার করেন — ফল, দুধ, দই, বাদাম ইত্যাদি সাত্ত্বিক খাবার গ্রহণ করেন। আমিষ, পেঁয়াজ, রসুন পরিহার করা হয়।
রাম নবমী চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমীতে পালিত হয় (২০২৬ সালে: ২৬ মার্চ)। সীতা নবমী বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের নবমীতে পালিত হয় (২০২৬ সালে: ২৫ এপ্রিল) — অর্থাৎ ঠিক এক মাস পরে।
সীতা নবমীতে মধ্যাহ্ন (দুপুর) হলো পূজার সর্বোত্তম সময়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী মধ্যাহ্ন মুহূর্ত সকাল ১১:৩১ থেকে দুপুর ২:০৮ পর্যন্ত।
পুরাণ মতে, দেবী সীতার জন্ম মিথিলা রাজ্যে (বর্তমান নেপালের জনকপুর)। রাজা জনক হলকর্ষণ করার সময় মাটি থেকে তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল।
সীতা নবমীতে “ওম শ্রী সীতায়ৈ নমঃ” মন্ত্রটি ১০৮ বার জপ করা শুভ। এছাড়া সীতা গায়ত্রী মন্ত্র ও “জয় সীতারাম” জপ করা যায়।
শেষকথা
সীতা নবমী ২০২৬ আসছে ২৫ এপ্রিল, শনিবার। এই পবিত্র দিনটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় — এটি দেবী সীতার অসাধারণ জীবন ও আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার সুযোগ।
মধ্যাহ্ন মুহূর্তে (বাংলাদেশ সময় সকাল ১১:৩১ থেকে দুপুর ২:০৮) পূজা করুন, ব্রত পালন করুন এবং রামায়ণ পাঠের মাধ্যমে মা সীতার জীবনের শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হন।
জয় সীতারাম! 🙏
তথ্যসূত্র ও সোর্স
- Drik Panchang (drikpanchang.com) — হিন্দু পঞ্চাং ও তিথি তথ্য
- ISKCON Dwarka — সীতা নবমীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
- Ganeshaspeaks.com — সীতা নবমী ২০২৬ মুহূর্ত ও বিবরণ
- Valmiki Ramayana — মূল পৌরাণিক কাহিনীর উৎস
- Hindu Calendar 2026 — তিথি ও নক্ষত্র যাচাই
এই আর্টিকেলের তথ্য একাধিক বিশ্বাসযোগ্য হিন্দু পঞ্চাং ও ধর্মীয় সূত্র থেকে যাচাই করা হয়েছে। ধর্মীয় বিষয়ে সবসময় আপনার স্থানীয় পুরোহিত বা পঞ্চাং অনুযায়ী সঠিক সময় নিশ্চিত করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

