আজ ৫ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ সরকার ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ‘জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ২০২৬’ শুরু করেছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুকে নিকটস্থ ইপিআই (EPI) কেন্দ্র থেকে এই টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হবে। তবে অসুস্থ শিশুদের সুস্থ হওয়ার পর এই টিকা গ্রহণ করতে হবে।
আপনার আদরের সন্তান কি হাম বা রুবেলার মতো মারাত্মক এবং অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসের ঝুঁকিতে আছে? একটু ভেবে দেখুন তো!
হাম এবং রুবেলা এমন দুটি রোগ, যা শুধুমাত্র শিশুর শারীরিক বিকাশকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর এই ঝুঁকি কমাতেই সরকার শুরু করেছে একটি জরুরি উদ্যোগ।
এই আর্টিকেল থেকে আপনি যা যা জানতে পারবেন:
- জরুরি এই টিকাদান কর্মসূচির সময়সূচি ও স্থান
- আপনার শিশু এই টিকার আওতাভুক্ত কি না
- শিশুকে টিকাকেন্দ্রে নেওয়ার আগে ও পরের করণীয়
- হাম-রুবেলা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য
- টিকা সম্পর্কিত আপনার মনের সব প্রশ্নের উত্তর
চলুন, আর দেরি না করে জেনে নিই কীভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবেন।
হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ২০২৬-এর বিস্তারিত তথ্য
বাংলাদেশ সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং গ্যাভি (Gavi)-এর যৌথ উদ্যোগে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে।
কবে থেকে শুরু হচ্ছে এবং কোথায় দেওয়া হবে?
আজ, ৫ এপ্রিল থেকে সরকার পর্যায়ক্রমে এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে।
প্রথম ধাপে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এই টিকা প্রদান করা হবে।
কোথায় টিকা পাবেন?
আপনাকে দূরে কোথাও যেতে হবে না। আপনার বাড়ির সবচেয়ে কাছের ইপিআই (EPI) টিকাদান কেন্দ্র হতেই এই টিকা নিশ্চিত করা যাবে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী বা আপনার এলাকার টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করলেই নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় জানতে পারবেন।
কাদের এই টিকা দেওয়া হবে?
এই কর্মসূচির একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
৬ মাস বয়স থেকে শুরু করে ৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশু এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত। আপনার শিশুর বয়স যদি এই সীমার মধ্যে থাকে, তবে তাকে অবশ্যই টিকা কেন্দ্রে নিয়ে যান।
কেন এই কর্মসূচিকে ‘জরুরি’ বলা হচ্ছে?
হাম এবং রুবেলা অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং আশেপাশের সুস্থ শিশুদের খুব দ্রুত সংক্রমিত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এর ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই যে ৩০টি উপজেলাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই এই জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একটি শিশুও যেন বাদ না পড়ে, সেটাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
যেসব শিশু এই মুহূর্তে টিকা নিতে পারবে না
সব শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা বলা হলেও, একটি বিশেষ নিয়মের কথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে।
জরুরি সতর্কতা: অসুস্থ শিশুরা হামের টিকার আওতার বাইরে থাকবে।
আপনার শিশুর যদি বর্তমানে তীব্র জ্বর, মারাত্মক ডায়রিয়া বা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা থাকে, তবে তাকে জোর করে টিকা দেবেন না। শিশু পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিয়ে তাকে এই টিকা গ্রহণ করতে হবে।
আপনার শিশুকে টিকাকেন্দ্রে নেওয়ার আগে ৫টি জরুরি প্রস্তুতি
টিকাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে ও পরে বাবা-মা হিসেবে আপনার কিছু দায়িত্ব রয়েছে। নিচে ধাপে ধাপে করণীয়গুলো আলোচনা করা হলো:
- টিকাদান কার্ড সংগ্রহ ও যাচাই: যাওয়ার আগে শিশুর আগের টিকাদান কার্ডটি (EPI Card) অবশ্যই সাথে নিন। স্বাস্থ্যকর্মী এটি দেখে শিশুর বয়স ও আগের টিকার ইতিহাস নিশ্চিত করবেন।
- শিশুকে ভরা পেটে রাখুন: খালি পেটে শিশুকে টিকা দিতে নিয়ে যাবেন না। শিশুকে স্বাভাবিক খাবার বা মায়ের বুকের দুধ খাইয়ে তারপর কেন্দ্রে নিয়ে যান।
- আরামদায়ক পোশাক পরান: শিশুকে সুতির বা এমন কোনো ঢিলেঢালা পোশাক পরান, যাতে সহজেই তার হাত বা উরুতে টিকা দেওয়া যায়। এতে শিশু কম অস্বস্তি বোধ করবে।
- অসুস্থতার কথা জানান: শিশুর যদি আগে থেকেই কোনো অ্যালার্জি, জ্বর বা অন্য কোনো সমস্যা থাকে, তবে টিকা দেওয়ার আগেই দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মীকে তা স্পষ্টভাবে জানান।
- টিকা দেওয়ার পর অপেক্ষা করুন: টিকা দেওয়ার সাথে সাথেই কেন্দ্র ত্যাগ করবেন না। অন্তত ২০-৩০ মিনিট কেন্দ্রে অপেক্ষা করুন। শিশুর কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
হাম ও রুবেলা রোগ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সত্য
আমাদের সমাজে, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে টিকা নিয়ে এখনও কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেকেই গুজবের কারণে শিশুকে টিকা দিতে চান না। আসুন সত্যটা জেনে নিই:
- ভুল ধারণা: আমার শিশুর তো আগেই হামের টিকা দেওয়া আছে, এখন আর দরকার নেই।
- সত্য: এটি একটি ‘জরুরি’ বা ‘ক্যাম্পেইন’ ভিত্তিক টিকা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ ঠেকাতে নির্দিষ্ট বয়সের সব শিশুকে এই অতিরিক্ত ডোজটি দেওয়া হচ্ছে। তাই আগে টিকা দেওয়া থাকলেও এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
- ভুল ধারণা: টিকা দিলে শিশু আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে।
- সত্য: টিকা দেওয়ার পর সামান্য জ্বর বা টিকার স্থানে সামান্য ব্যথা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এটি প্রমাণ করে যে টিকা কাজ করছে। এটি কোনো মারাত্মক অসুস্থতা নয়।
- ভুল ধারণা: প্রাকৃতিক নিয়মে হাম হলে এমনিতেই সেরে যায়, টিকার দরকার নেই।
- সত্য: হাম সাধারণ কোনো রোগ নয়। এটি থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে, যা শিশুর মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।
হাম ও রুবেলার ভয়াবহতা: কেন অবহেলা করবেন না?
অনেকেই হাম এবং রুবেলাকে সাধারণ জ্বর বা র্যাশ হিসেবে অবহেলা করেন। কিন্তু এর পেছনের ভয়াবহতা জানলে আপনি অবাক হবেন।
হামের ঝুঁকি:
- তীব্র জ্বর, সর্দি ও কাশি।
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং আলোতে তাকাতে কষ্ট হওয়া।
- সারা শরীরে লালচে র্যাশ বা দানা ওঠা।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া।
রুবেলার ঝুঁকি (জার্মান মিজেলস):
রুবেলা শিশুদের জন্য খুব একটা প্রাণঘাতী না হলেও, এটি সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নেয় গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে। কোনো গর্ভবতী নারী রুবেলায় আক্রান্ত হলে তার অনাগত শিশু ‘কনজেনিটাল রুবেলা সিনড্রোম’ (CRS) নিয়ে জন্মাতে পারে। এর ফলে শিশু অন্ধ, বধির বা হার্টের মারাত্মক ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে।
তাই আপনার শিশুকে রুবেলার টিকা দেওয়ার মানে হলো, ভবিষ্যতের একজন সুস্থ নাগরিক ও সুস্থ প্রজন্ম নিশ্চিত করা।
মানুষের সাধারণ জিজ্ঞাসা
হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার পর জ্বর আসলে কী করব?
টিকা দেওয়ার পর শিশুর হালকা জ্বর আসা খুবই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এ সময় শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ ও তরল খাবার বেশি করে খাওয়াবেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ দিতে পারেন।
আমার বাচ্চার বয়স ৫ বছর ২ মাস, সে কি এই টিকা পাবে?
না। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে শুধুমাত্র ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী (অর্থাৎ ৫৯ মাস পর্যন্ত) শিশুদের টিকা প্রদান করা হবে।
এই টিকা কি সম্পূর্ণ নিরাপদ?
হ্যাঁ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF) দ্বারা অনুমোদিত এবং পরীক্ষিত এই টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। এটি বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি শিশুকে দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি কেন্দ্র ছাড়া প্রাইভেট হাসপাতালে কি এই টিকা পাওয়া যাবে?
এটি একটি সরকারি জরুরি কর্মসূচি। তাই নিকটস্থ ইপিআই (EPI) কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি হাসপাতাল থেকেই এই টিকা বিনামূল্যে সংগ্রহ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম।
আপনার সচেতনতাই পারে মহামারি রুখতে
আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাত গত কয়েক দশকে টিকাদান কর্মসূচিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পোলিওর মতো রোগ আমরা দেশ থেকে নির্মূল করেছি শুধুমাত্র এই ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে। হাম ও রুবেলাকেও আমরা একইভাবে হারাতে পারি।
একজন সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক হিসেবে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মাদারীপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, সঠিক তথ্যের অভাবে মানুষ কীভাবে ভুগে। তাই গুজবে কান না দিয়ে, সরকারি নির্দেশনার ওপর আস্থা রাখুন।
শেষকথা
শিশুর হাসি একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর এই হাসি ম্লান করে দিতে পারে হাম ও রুবেলার মতো প্রতিরোধযোগ্য কিছু রোগ। ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ২০২৬-এ অংশগ্রহণ করা আপনার নাগরিক দায়িত্ব এবং পিতা-মাতা হিসেবে সবচেয়ে বড় কর্তব্য।
আজই পদক্ষেপ নিন: আপনার শিশুর বয়স যদি ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম হয়, তবে আজই আপনার নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে খোঁজ নিন। নিজে সচেতন হোন এবং এই আর্টিকেলটি আপনার আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে শেয়ার করে তাদের শিশুদের সুরক্ষায় সাহায্য করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

