বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপদে থাকার উপায়: ইসলামী দৃষ্টিকোণ এবং আধুনিক জীবনের বাস্তবতা

বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপদে থাকার উপায়

বিশ্বযুদ্ধ বা শেষ জামানার ভয়াবহ বিপর্যয় (যেমন- পারমাণবিক যুদ্ধ, রেডিয়েশনের প্রভাব, এবং অর্থনৈতিক দাসত্ব) থেকে নিরাপদে থাকতে ইসলামী স্কলার শেখ ইমরান হোসেইন শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছোট সমাজ গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব সমাজে ইসলামী রীতিনীতি, সুদবিহীন অর্থনীতি এবং প্রাকৃতিক জীবনযাপন বজায় রাখা জরুরি।

বর্তমান বিশ্বে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রযুক্তিগত দাসত্ব। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে এখন শোনা যাচ্ছে যুদ্ধের দামামা। কখনো কি ভেবেছেন, যদি সত্যি একটি মহাযুদ্ধ বা বিপর্যয় শুরু হয়, তবে আমরা কোথায় আশ্রয় নেব? কীভাবে নিজেদের ঈমান এবং অস্তিত্ব রক্ষা করব?

শেখ ইমরান হোসেইনের মতে, আমরা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল এবং বিপজ্জনক অধ্যায় ‘আখিরুজ্জামান’ বা শেষ জামানায় বাস করছি। এই সময়ে শুধু বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবী বোঝা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি বা ঈমানি নূর।

চলুন, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

শেষ জামানা বা আখিরুজ্জামান কী?

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ‘আখিরুজ্জামান’ হলো পৃথিবীর শেষ সময়, যখন মানবজাতি সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বা ফিতনার মুখোমুখি হবে। এই সময়ে ন্যায়বিচারের অভাব, অর্থনৈতিক শোষণ এবং নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই সময়ের জন্য বেশকিছু আলামতের কথা বলে গেছেন, যার অনেকগুলোই আজ আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান।

শেষ জামানার দৃশ্যমান বড় আলামতসমূহ

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে উল্লিখিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ১০টি বড় আলামতের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • উঁচু ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা: সমাজের অবহেলিত বা সাধারণ রাখালদের মতো মানুষেরা যখন সম্পদশালী হয়ে বড় বড় অট্টালিকা বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে।
  • দাসত্বের ফিরে আসা: রিবা (সুদ) এবং আধুনিক মুদ্রাব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক দাসত্বের সৃষ্টি।
  • পশ্চিমা সভ্যতার আধিপত্য: পশ্চিম দিক থেকে মিথ্যা সূর্যোদয়, যা আধুনিক পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষ সভ্যতাকে রূপক অর্থে বোঝায়।
  • পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কা: ইয়াজুজ ও মাজুজের সংঘাতে ‘দুখান’ বা ধোঁয়ার সৃষ্টি, যা আধুনিককালের পারমাণবিক যুদ্ধের মাশরুম ক্লাউডের ইঙ্গিত দেয়।

আধুনিক বিশ্বের ফিতনা: অর্থনৈতিক দাসত্ব ও রিবা

আমরা অনেকেই মনে করি, বর্তমান আধুনিক যুগে আমরা আগের চেয়ে ভালো আছি। কিন্তু বাস্তবে কি তা-ই?

আজকের অর্থব্যবস্থা পুরোপুরি রিবা বা সুদের ওপর নির্ভরশীল। কাগজের মুদ্রা এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং সিস্টেম মানুষকে এমন এক ফাঁদে ফেলেছে, যেখানে তারা অদৃশ্য দাসত্বের শিকার। এই ব্যবস্থায় সম্পদ গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ চিরস্থায়ী দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ছে।

কীভাবে বাঁচবেন? কাগজের টাকা বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ইসলামে নির্দেশিত স্বর্ণের দিনার ও রৌপ্য দিরহাম, অথবা প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন: চাল)-এর মাধ্যমে বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

রেডিয়েশনের প্রভাব: কেন ছেলে শিশুর জন্ম কমে যাচ্ছে?

আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে মোবাইল ফোনের টাওয়ার এবং ল্যাপটপ থেকে নির্গত রেডিয়েশন আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এক নিরব ঘাতক।

  • প্রজনন ক্ষমতায় ক্ষতিকর প্রভাব: কোলে ল্যাপটপ রাখা বা অতিরিক্ত রেডিয়েশনের মধ্যে থাকার কারণে পুরুষের শুক্রাণুর ক্রোমোজোম দুর্বল হয়ে পড়ছে।
  • ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শঙ্কা: পুরুষ ক্রোমোজোম দুর্বল হওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবেই ছেলে সন্তানের জন্মহার কমে যাচ্ছে। রাসূল (সা.) ১৪০০ বছর আগে বলে গেছেন যে এমন এক সময় আসবে যখন একজন পুরুষকে ৫০ জন নারীর দায়িত্ব নিতে হবে।

বাস্তব সমাধান:

প্রযুক্তি ও রেডিয়েশনমুক্ত জীবনযাপন এবং জেনেটিক্যালি মডিফাইড (GM Food) খাবারের বদলে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপদে থাকার উপায়

যদি এমন পরিস্থিতি আসে যখন শহরগুলো আর নিরাপদ থাকবে না, তখন আমাদের কী করা উচিত? ইসলামী স্কলারদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

১. শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা: আধুনিক শহরের সুবিধা ত্যাগ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা পাহাড়ি এলাকায় ফিরে যাওয়া, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা রেডিয়েশনের প্রভাব নেই।

২. স্বতন্ত্র সমাজ গঠন: সেখানে এমন একটি ছোট সমাজ বা কমিউনিটি গড়ে তোলা, যা সব ধরনের জুলুম এবং শোষণ থেকে মুক্ত থাকবে।

৩. সুদবিহীন অর্থনীতি: সেই সমাজে ব্যাংকিং বা সুদী ব্যবস্থার বদলে ইসলামী অর্থনীতি এবং হালাল উপার্জনের ভিত্তি স্থাপন করা।

৪. প্রাকৃতিক জীবনযাপন: কৃষিকাজ ও পশুপালনের মাধ্যমে নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

আখিরুজ্জামান বা শেষ জামানা বলতে কী বোঝায়?

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, কিয়ামত বা পৃথিবী ধ্বংসের পূর্ববর্তী সময়কে আখিরুজ্জামান বলা হয়, যখন সমাজে চরম অশান্তি, জুলুম এবং ফিতনা দেখা দেবে।

পারমাণবিক যুদ্ধ বা ‘দুখান’ থেকে বাঁচার উপায় কী?

পারমাণবিক রেডিয়েশনের প্রভাব থেকে বাঁচতে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

রেডিয়েশনের কারণে কি ছেলে সন্তান কমে যাচ্ছে?

গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক রেডিয়েশন পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম দুর্বল করে, যার ফলে ছেলে শিশুর জন্মহার কমে যেতে পারে।

শেষ জামানায় অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় কী?

সুদভিত্তিক কাগজের মুদ্রা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা বর্জন করে সোনা-রুপা বা প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

শেষকথা

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যা বাহ্যিকভাবে হয়তো অত্যন্ত উন্নত, কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে এটি চরম ফিতনা এবং শোষণে ভরা। পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি, আধুনিক দাসত্ব এবং রেডিয়েশনের ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে।

ইসলামের নির্দেশনা মেনে শহরকেন্দ্রিক ভোগবাদী জীবনের মায়া ত্যাগ করে প্রত্যন্ত ও নিরাপদ জীবন গড়ার প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন আধুনিক শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া বাস্তবে সম্ভব? আমাদের কমেন্ট করে জানান। আর লেখাটি উপকারী মনে হলে আপনার কাছের মানুষদের সাথে শেয়ার করুন।

তথ্যসূত্র: এই আর্টিকেলের মূল ভিত্তি হলো প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার শেখ ইমরান হোসেইনের লেকচার এবং ইসলামী এস্ক্যাটোলজি বিষয়ক গবেষণা।

Leave a Comment

Scroll to Top