ইরানের ‘ফাত্তাহ-২’ (Fattah-2) হলো একটি অত্যাধুনিক হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (HGV) ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের চেয়ে প্রায় ১৫ গুণ বেশি গতিতে (ম্যাক ১৫) ছুটতে পারে। এটি এমনভাবে আঁকাবাঁকা পথে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয় যে, ইসরায়েলের অ্যারো-৩ (Arrow-3) বা যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়টের মতো কোনো আধুনিক রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একে শনাক্ত বা ধ্বংস করতে সক্ষম নয়। ইরান থেকে ফায়ার করা হলে এটি মাত্র সাড়ে ৬ মিনিটে ইসরায়েলে আঘাত হানতে পারে, যা সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের সতর্ক করার সুযোগও দেবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের রেশ ধরে ইরান সম্প্রতি তাদের সর্বাধুনিক মারণাস্ত্র ‘ফাত্তাহ-২’ হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েন করার দাবি করেছে। ফরাসি ভাষায় ‘ফাত্তাহ’ শব্দের অর্থ হলো ‘বিজয়দাতা’। সত্যিই কি এই অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির এবং ইসরায়েলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে?
এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় জানব ফাত্তাহ-২ মিসাইলের ক্ষমতা, এটি কেন আটকানো অসম্ভব এবং এর ফলে বিশ্ব ও বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ফাত্তাহ-২ (Fattah-2) কী? এর ভয়ংকর সক্ষমতাগুলো কী কী?
প্রচলিত ব্যালিস্টিক মিসাইলের ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে এই হাইপারসনিক মিসাইল। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- অবিশ্বাস্য গতি: এই মিসাইলটি ম্যাক ১৫ (Mach 15) বা শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে। অর্থাৎ, এর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৫,০০০ কিলোমিটার।
- বিদ্যুৎ গতির আঘাত: ইরান থেকে ইসরায়েলের দূরত্ব প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার। ফাত্তাহ-২ ফায়ার করা হলে তা ইসরায়েলে পৌঁছাতে সময় নেবে মাত্র সাড়ে ৬ মিনিট। ইসরায়েলে কোনো মিসাইল হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতেই সময় লাগে ৫ মিনিট, যার মানে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আগেই এটি আঘাত হানবে।
- হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (HGV) প্রযুক্তি: সাধারণ মিসাইলগুলো একটি নির্দিষ্ট প্যারাবোলিক পথ ধরে চলে। কিন্তু ফাত্তাহ-২ বায়ুমণ্ডলের নিচু স্তর দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথে চলে।
- দিক পরিবর্তনে সক্ষম: লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এটি বারবার নিজের দিক পরিবর্তন করতে পারে, যা রাডারের পক্ষে ট্র্যাক করা অসম্ভব।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ?
ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং বা অ্যারো-৩) বিশ্বখ্যাত। তা সত্ত্বেও ফাত্তাহ-২ এর সামনে এগুলো কেন কাজ করবে না, তা ধাপে ধাপে বোঝা যাক:
- রাডারের সীমাবদ্ধতা: বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ রাডার সিস্টেম একটি নির্দিষ্ট গতিপথে আসা মিসাইল ট্র্যাক করার জন্য তৈরি। ফাত্তাহ-২ এর গতিপথ অনির্দিষ্ট হওয়ায় রাডার একে লক করতে পারে না।
- প্রতিক্রিয়ার সময় (Response Time): এটি এত দ্রুত লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে আসে যে, অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেমগুলো (যেমন- প্যাট্রিয়ট বা থাড) ফায়ার করার আগেই এটি তার ধ্বংসলীলা চালিয়ে দেয়।
- বিশাল রণতরী ধ্বংসের ক্ষমতা: শুধু ভূমি নয়, মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর মতো বিশাল রণতরীগুলোকেও মুহূর্তের মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে এই মিসাইল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফাত্তাহ-২ মিসাইল কি ইসরায়েলকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে সক্ষম?
ফাত্তাহ-২ মিসাইল কয়েকশো কেজি ওজনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এটি দিয়ে ইসরায়েলের সুদৃঢ় বাঙ্কার বা সামরিক ঘাঁটিগুলো নিমেষেই ধূলিসাৎ করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র কি ফাত্তাহ-২ ঠেকানোর কোনো প্রযুক্তি তৈরি করছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে পরবর্তী প্রজন্মের রাডার সিস্টেম এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
হাইপারসনিক মিসাইল এবং ব্যালিস্টিক মিসাইলের মধ্যে পার্থক্য কী?
ব্যালিস্টিক মিসাইল বায়ুমণ্ডলের বাইরে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট এবং অনুমানযোগ্য পথ ধরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। অন্যদিকে, হাইপারসনিক মিসাইল (যেমন ফাত্তাহ-২) বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং দিক পরিবর্তন করে চলতে পারে, যা রাডার ফাঁকি দিতে ওস্তাদ।
ইসরায়েলের ‘অ্যারো-৩’ (Arrow-3) কি ফাত্তাহ-২ আটকাতে পারবে?
না। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, অ্যারো-৩, প্যাট্রিয়ট (Patriot) বা থাড (THAAD)-এর মতো অত্যাধুনিক সিস্টেমগুলোও ফাত্তাহ-২ এর অবিশ্বাস্য গতি এবং ম্যানুভারিং ক্ষমতার কারণে এটিকে রুখতে ব্যর্থ হবে।
শেষকথা: ফাত্তাহ-২ মিসাইলটি সামরিক বিশ্বে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ বা যুদ্ধের মোড় পরিবর্তনকারী অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরিস্থিতি যদি আরও উত্তপ্ত হয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।
