মহিলাদের তারাবির নামাজের নিয়ম মূলত পুরুষদের মতোই। তবে মহিলারা ঘরে একা বা জামাতে পড়তে পারেন। মসজিদে যাওয়া ওয়াজিব নয়। ২০ রাকাত তারাবি পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। প্রতি ২ রাকাত পর সালাম ফেরানো হয় এবং প্রতি ৪ রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়া হয়।
রমজান মাসে তারাবির নামাজ মুসলিম নারীদের জন্য একটি বিশেষ ইবাদত। অনেক নারী প্রশ্ন করেন ঘরে পড়বেন নাকি মসজিদে যাবেন? কত রাকাত পড়বেন? নিয়ত কীভাবে করবেন? এই আর্টিকেলে সমস্ত প্রশ্নের বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য উত্তর দেওয়া হয়েছে সরাসরি কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে।
তারাবির নামাজ কী এবং কেন পড়া হয়?
তারাবি শব্দটি আরবি ‘তারওয়িহা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম নেওয়া বা প্রশান্তি লাভ করা। রমজান মাসের রাতে এশার নামাজের পর বিতরের আগে এই নামাজ পড়া হয়।
হাদিসে এসেছে: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের প্রত্যাশায় রমজানের রাতে (তারাবি) নামাজ আদায় করে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি: ২০০৮, মুসলিম: ৭৫৯)
তারাবির নামাজের গুরুত্ব
- সুন্নতে মুয়াক্কাদা অর্থাৎ রাসুল (সা.) নিয়মিত আদায় করেছেন
- বিনা ওজরে ছেড়ে দেওয়া মাকরুহ
- রমজানের বিশেষ রাতের ইবাদতের অন্যতম অংশ
- আত্মিক পবিত্রতা ও গুনাহ মাফের সুযোগ
মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজের বিধান
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, মহিলাদের জন্য তারাবির নামাজের বিধান পুরুষদের মতোই এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে কোথায় পড়বেন সেটি নিয়ে কিছু বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে।
মহিলারা কোথায় তারাবি পড়বেন?
হানাফি ফিকহের প্রধান মত অনুযায়ী:
- মহিলাদের জন্য ঘরে নামাজ পড়াই উত্তম ও বেশি সওয়াবের
- রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘মহিলাদের ঘরের ভেতরের ঘরে নামাজ পড়া বাইরের ঘরের চেয়ে উত্তম।’ (আবু দাউদ: ৫৭০)
- মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ নয়, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে ঘরে পড়াই শ্রেয়
- বর্তমান যুগে অধিকাংশ আলেম মহিলাদের ঘরে তারাবি পড়ার পরামর্শ দেন
পর্দার বিধান মেনে মসজিদে গেলে
- পূর্ণ পর্দা অবশ্যই মেনে চলতে হবে
- পুরুষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা স্থানে দাঁড়াতে হবে
- পরিচিত পুরুষ না হলে একাকী না যাওয়াই ভালো
- বাংলাদেশে অনেক মসজিদে মহিলাদের আলাদা কক্ষ আছে — সেখানে যাওয়া যায়
তারাবির নামাজ মহিলাদের কত রাকাত
এটি একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা। সঠিক উত্তর হলো:
তারাবির নামাজ ২০ রাকাত এটি হানাফি, শাফেয়ি ও মালিকি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত এবং বাংলাদেশে প্রচলিত সুন্নাহ। উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবায়ে কেরাম ২০ রাকাতে একমত হয়েছিলেন।
এছাড়া ৮ রাকাত পড়লেও তারাবির সওয়াব পাওয়া যায় এটি একটি মত তবে ২০ রাকাতই বাংলাদেশের আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
রাকাত গণনা
- তারাবি: ২০ রাকাত
- বিতর: ৩ রাকাত (ওয়াজিব)
- মোট: ২৩ রাকাত (এশার ফরজ ও সুন্নত সহ ৩৩ রাকাত)
মহিলাদের তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম
প্রস্তুতি
- সহিহভাবে অজু করুন।
- পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখুন (চুল, গলা, হাত পায়ের পাতাসহ সব ঢাকা থাকতে হবে) এবং পাক কাপড় পরুন
- পাক জায়গায় জায়নামাজ বিছান।
- কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান।
নিয়ত করা
নিয়ত মনে মনে করলেই হয়। মুখে বলতে হলে বলুন:
নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা রাকাতাইনি সালাতিত তারাবিহি সুন্নাতুর রাসুলিল্লাহি তায়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার।
বাংলায় সহজ নিয়ত: ‘আমি কিবলামুখী হয়ে তারাবির ২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায়ের নিয়ত করছি।’
নামাজের পদ্ধতি (প্রতি ২ রাকাত)
- তাকবিরে তাহরিমা — ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বাঁধুন
- ছানা পড়ুন — ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…’
- সুরা ফাতিহা পড়ুন
- যেকোনো সুরা মিলান (যেমন সুরা ইখলাস, কাফিরুন ইত্যাদি)
- রুকু করুন — ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ ৩ বার
- সিজদা করুন — ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা’ ৩ বার
- দ্বিতীয় রাকাতও একইভাবে পড়ুন
- শেষে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরান
তারাবিহ বিরতি (তারওয়িহা)
প্রতি ৪ রাকাত পর বিরতি নেওয়া হয়। এই সময়:
- চুপ থাকা যায়
- দোয়া, তাসবিহ বা কুরআন তিলাওয়াত করা যায়
- প্রচলিত তারাবিহর দোয়া পড়া যায় (যেমন ‘সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুত…’)
মহিলারা একা তারাবি পড়লে কীভাবে পড়বেন?
ঘরে একা পড়লে পুরো পদ্ধতি একই থাকে। শুধু মনে রাখুন:
- ইমামতির প্রয়োজন নেই — একা একাই পড়ুন
- জোরে না পড়ে আস্তে পড়াই ভালো
- নামাজ ভেঙে না দিয়ে ধারাবাহিকভাবে পড়ুন
- ২০ রাকাত শেষে ৩ রাকাত বিতর পড়ুন
- যদি দাঁড়িয়ে পড়তে না পারেন তাহলে বসে পড়তে পারেন, তবে সওয়াব অর্ধেক হয়
মহিলারা কি বাড়িতে জামাতে তারাবি পড়তে পারেন?
হ্যাঁ, পারেন। বাড়িতে শুধু মহিলাদের জামাত করা জায়েজ আছে।
মহিলাদের জামাতের নিয়ম
- একজন মহিলা ইমাম হবেন — তিনি সারির মাঝখানে দাঁড়াবেন (সামনে নয়)
- ইমামের আজান বা ইকামত দেওয়ার প্রয়োজন নেই
- ইমাম জোরে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন (শুধু মহিলাদের মধ্যে হলে)
- পুরুষ সদস্যরা এই জামাতে অংশ নিতে পারবেন না
- যদি পরিবারে মাহরাম পুরুষ থাকেন যিনি কুরআন পড়তে পারেন, তাহলে তিনি ইমাম হয়ে পরিবারের সবাই মিলে পড়তে পারেন
হায়েজ-নেফাস অবস্থায় তারাবির বিধান
হায়েজ (মাসিক) বা নেফাস (সন্তান জন্মের পর রক্তস্রাব) অবস্থায় মহিলাদের নামাজ পড়া নিষিদ্ধ।
- এই অবস্থায় তারাবির নামাজ পড়া যাবে না
- পবিত্র হওয়ার পর গোসল করে নামাজ শুরু করবেন
- ছুটে যাওয়া তারাবির নামাজ কাজা করতে হয় না
- তবে দোয়া, জিকির, দরুদ পড়া যাবে
- এই অবস্থায় কুরআন শোনা যাবে, কিন্তু স্পর্শ বা তিলাওয়াত করা মাকরুহ
রমজানে মহিলাদের তারাবিতে সচরাচর ভুলগুলো
- নিয়ত না করে নামাজ শুরু করা
- সুরা ফাতিহা না পড়া বা তাড়াহুড়া করে পড়া
- রুকু-সিজদায় তাসবিহ না পড়া
- সালাম ফেরানোর আগে উঠে যাওয়া
- মোবাইল বা অন্য মনোযোগ থাকা
- পর্দার কাপড় সঠিকভাবে না পরা
- বিতর নামাজ না পড়া বা ভুলে যাওয়া
তারাবির নামাজের দোয়া ও তাসবিহ
প্রতি ৪ রাকাত পর পঠিতব্য দোয়া
সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুত, সুবহানা যিল ইয্যাতি ওয়াল আজমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল জাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়িল্লাযি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুতু। সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রুহ।
(উল্লেখ্য: এই দোয়াটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নির্দিষ্ট দোয়া নয়, তবে তারাবির বিরতিতে পড়া ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত। যেকোনো দোয়া বা জিকির পড়া যায়।)
তারাবির শেষে দোয়া
তারাবির পর নিজের ভাষায় বা আরবিতে যেকোনো দোয়া করা যায়। বিশেষভাবে রমজানের দোয়া:
আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি — হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসো, আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিজি)
কখন তারাবির নামাজ পড়তে হয়?
- সময়: এশার নামাজের পর থেকে শুরু হয়ে ফজরের আগ পর্যন্ত
- উত্তম সময়: এশার নামাজ আদায়ের পরপরই
- যদি ঘুমিয়ে যান, রাতের যেকোনো সময় উঠে পড়তে পারেন
- তাহাজ্জুদের আগেও পড়া যায়
- সেহরির আগে বা পরে বিতর পড়তে পারেন
সচরাচর জিজ্ঞাসা
মহিলারা কি তারাবি না পড়লে গুনাহ হবে?
তারাবি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। বিনা কারণে ছেড়ে দেওয়া মাকরুহে তাহরিমি (তীব্র অপছন্দনীয়)। গুনাহ হবে না তবে বড় সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন। অসুস্থতা বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে ছেড়ে দিলে কোনো সমস্যা নেই।
তারাবিতে কি সুরা মুখস্থ না থাকলে সুরা ইখলাস বারবার পড়া যাবে?
হ্যাঁ, পারা যাবে। সুরা ইখলাস বা অন্য ছোট সুরা বারবার পড়লে নামাজ হয়ে যাবে। তবে ধীরে ধীরে বেশি সুরা মুখস্থ করার চেষ্টা করুন।
মহিলারা কি রমজানে খতমে তারাবিতে অংশ নিতে পারেন?
মসজিদে পর্দার ব্যবস্থা থাকলে, এবং ফিতনামুক্ত পরিবেশে, মহিলারা খতমে তারাবিতে অংশ নিতে পারেন। তবে ঘরে বসে হাফেজের তিলাওয়াত শুনতে শুনতে কুরআন ফলো করলেও ইন্টিগ্রিটি বজায় থাকে।
তারাবির নামাজ কি কাজা করা যায়?
না। তারাবির নামাজ কাজা নেই। এশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়তে পারেন, কিন্তু সেই রাত চলে গেলে আর পড়া যাবে না।
প্রেগন্যান্ট বা অসুস্থ মহিলা কি বসে তারাবি পড়তে পারেন?
হ্যাঁ, পারেন। অসুস্থতা, প্রেগন্যান্সি, বা দুর্বলতার কারণে বসে পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ। সওয়াব কিছুটা কম হবে, কিন্তু নামাজ সহিহ হবে।
তারাবির নামাজে মোবাইলে কুরআন দেখে পড়া যাবে কি?
এটি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। অধিকাংশ হানাফি আলেমের মতে, নামাজে মোবাইলে দেখে পড়লে নামাজ মাকরুহ হয়ে যায় কারণ মোবাইল উল্টানো বারবার ক্রিয়া। তবে অনেক সমকালীন আলেম জায়েজ বলেছেন। সতর্কতামূলক অবস্থান হলো মোবাইলে না দেখা।
তারাবির নামাজে সুরা মিলানো কি ফরজ?
না, ফরজ নয়। সুরা ফাতিহার পর অতিরিক্ত সুরা মিলানো ওয়াজিব। সুরা মিলাতে না পারলে শুধু সুরা ফাতিহা পড়লেও নামাজ হয়ে যাবে, তবে ওয়াজিব ছুটে যাবে।
মহিলাদের তারাবিতে আওয়াজ করে পড়া কি জায়েজ?
মহিলাদের জামাতে বা একা পড়লে আস্তে পড়াই উত্তম। তবে ঘরে একা থাকলে বা শুধু মহিলাদের মধ্যে থাকলে কিছুটা আওয়াজ করে পড়া জায়েজ — কিন্তু পরপুরুষ শুনতে পারে এমন আওয়াজ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মহিলাদের তারাবি
বাংলাদেশে অধিকাংশ মুসলিম মহিলা ঘরেই তারাবি আদায় করেন। কিছু মসজিদে মহিলাদের আলাদা কক্ষ আছে যেখানে তারাবি পড়া যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে মহিলা মাদ্রাসা ও ইসলামিক সেন্টারে তারাবির বিশেষ ব্যবস্থা থাকে।
- বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০ রাকাত তারাবি পড়া সুন্নাহ
- রমজান মাসে বাংলাদেশে খতমে তারাবির আয়োজন হয় অনেক মসজিদে
- মহিলারা চাইলে অনলাইনে হাফেজের তিলাওয়াত শুনে কুরআন ফলো করতে পারেন
- রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের কিছু মসজিদে বিশেষভাবে মহিলাদের তারাবির ব্যবস্থা রয়েছে
তারাবির নামাজ সহিহ করার ৫টি জরুরি টিপস
- নিয়মিত অজু নিশ্চিত করুন — অজু ভেঙে গেলে নামাজ বাতিল হয়
- সুরা ফাতিহা সঠিকভাবে মুখস্থ করুন — এটি ছাড়া নামাজ হয় না
- প্রতিটি রাকাতে মনোযোগ দিন — খুশু-খুজু বজায় রাখুন
- রুকু ও সিজদায় কমপক্ষে ৩ বার তাসবিহ পড়ুন
- বিতর নামাজ ভুলবেন না — তারাবির পরেই বিতর পড়ে নিন
ডিসক্লেইমার ও সূত্র
এই আর্টিকেলটি ইসলামিক ফিকহ বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শে তৈরি করা হয়েছে। তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নিচের সূত্রসমূহ যাচাই করা হয়েছে:
- সহিহ বুখারি (হাদিস নং: ২০০৮)।
- সহিহ মুসলিম (হাদিস নং: ৭৫৯)।
- আবু দাউদ শরিফ (হাদিস নং: ৫৭০)।
- ফাতাওয়া আলমগীরি (হানাফি ফিকহ)।
- বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
- ফাতওয়া বিভাগ, দারুল উলূম দেওবন্দ।
- বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

