ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, শুক্রবার (জুমার দিন) আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি হলো দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত, যাকে হাদিসের ভাষায় ‘সাআতুল ইজাবাহ’ বা দোয়া কবুলের সময় বলা হয়। শুক্রবার আসরের পরের দোয়া কবুলের আমল হলো আসরের নামাজ আদায়ের পর দুনিয়াবি কাজ থেকে বিরত থেকে জায়নামাজে বসে থাকা, বেশি বেশি দুরুদ শরীফ ও ইস্তেগফার পড়া এবং সূর্য ডোবার ঠিক আগ মুহূর্তে (মাগরিবের আগে) নিজের মাতৃভাষায় কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। সহিহ হাদিস অনুযায়ী, এই সময়ে বান্দা আল্লাহর কাছে যা চায়, তা-ই কবুল করা হয়।
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন। বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে জুমার নামাজের ব্যাপক গুরুত্ব থাকলেও, শুক্রবার বিকেলের একটি মহামূল্যবান সময়ের কথা আমরা অনেকেই দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ভুলে যাই।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সম্পূর্ণ কোরআন, সহিহ হাদিস এবং ইসলামি স্কলারদের মতামতের ভিত্তিতে জানব, শুক্রবার আসরের পর কীভাবে সঠিক উপায়ে আমল করলে আল্লাহ আমাদের মনের নেক বাসনা পূরণ করবেন।
জুমার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় কোনটি?
জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময় নিয়ে প্রসিদ্ধ দুটি মত রয়েছে। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং হাদিস দ্বারা সুপ্রমাণিত মতটি হলো: শুক্রবার আসরের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সময়।
হাদিসের প্রমাণ: প্রসিদ্ধ সাহাবি হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“জুমার দিনে ১২টি প্রহর বা ঘণ্টা রয়েছে। এর মধ্যে এমন একটি সময় আছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা দান করেন। তোমরা সেই সময়টিকে আসরের পর শেষ প্রহরে (মাগরিবের আগে) তালাশ করো।” (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৮; সুনানে নাসায়ি: ১৩৮৯)
শুক্রবার আসরের পরের দোয়া কবুলের আমল
এই বিশেষ সময়টিকে কাজে লাগানোর জন্য নিচের ধারাবাহিক আমলগুলো করা সবচেয়ে উত্তম:
- ১. আওয়াল ওয়াক্তে আসর আদায়: পুরুষদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে এবং নারীদের জন্য ঘরে ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আসরের নামাজ আদায় করে নেওয়া।
- ২. জায়নামাজে অবস্থান করা: নামাজের পর মসজিদ বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে (জায়নামাজে) বসে থাকা। এ সময় মোবাইল ফোন চালানো বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
- ৩. দুরুদ শরীফ পাঠ: জুমার দিনে রাসুল (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দুরুদ পাঠের নির্দেশ রয়েছে। ‘দুরুদ ইব্রাহিম’ (যা নামাজে পড়া হয়) বা সংক্ষেপে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ পড়া যেতে পারে।
- ৪. ইস্তেগফার ও জিকির: নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া (আস্তাগফিরুল্লাহ) এবং সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার— এই জিকিরগুলো করা।
- ৫. মাগরিবের আগ মুহূর্তে মোনাজাত: সূর্য ডোবার ঠিক ১০-১৫ মিনিট আগে পূর্ণ মনোযোগের সাথে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। এই সময় নিজের জীবনের সমস্যা, অভাব, রোগমুক্তি বা যেকোনো হালাল চাওয়ার কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বাংলাদেশীদের প্রেক্ষাপটে কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ
আমাদের দেশে শুক্রবার বিকেলে অনেকেই ঘুরতে বের হন বা বাজারের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই আমলটি করার জন্য:
- শুক্রবার বিকেলের কাজগুলো আসরের আগেই গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- অফিস বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে থাকলে আসরের নামাজ পড়ে সেখানেই নিজের ডেস্কে বসে ১০-১৫ মিনিট নীরবে জিকির ও দোয়া করুন।
- পরিবারের সবাইকে, বিশেষ করে মা-বোনদের এই সময়ে সাংসারিক কাজ কিছুটা কমিয়ে দোয়ায় মশগুল হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: জুমার দিন আসরের পর কি নির্দিষ্ট কোনো আরবি দোয়া পড়তে হয়?
উত্তর: না, এই সময়ে পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আরবি দোয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। মাতৃভাষায় (যেমন বাংলায়) নিজের মনের আকুতি জানিয়ে দোয়া করাই সবচেয়ে ফলপ্রসূ। তবে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত মাসনুন দোয়াগুলো পড়লে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ২: নারীরা কি ঘরে বসে এই আমল করতে পারবেন?
উত্তর: অবশ্যই পারবেন। নারীরা ঘরে আসরের নামাজ আদায়ের পর নিজেদের নামাজের স্থানে বসেই জিকির, কোরআন তিলাওয়াত এবং মাগরিবের আগে দোয়া করবেন। এতে তাঁরা পুরুষদের সমপরিমাণ সওয়াব ও ফজিলত লাভ করবেন।
প্রশ্ন ৩: ঋতুবতী নারীরা কি এই সময় দোয়া করতে পারবেন?
উত্তর: হ্যাঁ। ঋতুবতী নারীদের নামাজ পড়া নিষেধ থাকলেও জিকির ও দোয়া করতে কোনো বাধা নেই। তাঁরা ওজু করে পবিত্র স্থানে বসে দুরুদ, ইস্তেগফার এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারবেন।
প্রশ্ন ৪: এই সময়ে দোয়া করলে কি গ্যারান্টিসহ কবুল হয়?
উত্তর: আল্লাহ তায়ালা বান্দার নেক দোয়া কখনোই ফিরিয়ে দেন না। তিনি তিনভাবে দোয়া কবুল করেন: ১. যা চাওয়া হয় তা দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, ২. দোয়ার বিনিময়ে কোনো আগত বিপদ দূর করে দেন, অথবা ৩. আখেরাতের জন্য তা সঞ্চয় করে রাখেন। তবে দোয়ায় কোনো অন্যায় বা পাপের ইচ্ছা থাকা যাবে না।
চূড়ান্ত কথা
শুক্রবার আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি মুমিনের জন্য এক বিশাল সুযোগ। আজই যেহেতু শুক্রবার, তাই আজ থেকেই চেষ্টা করুন আসরের পর অন্তত ১৫-২০ মিনিট সময় শুধু আল্লাহর জন্য বরাদ্দ রাখতে। এই ছোট্ট অভ্যাসটি আপনার জীবনে অভাবনীয় প্রশান্তি ও সফলতা বয়ে আনতে পারে।
