রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত, তবে অন্তরে নিয়ত করাই ফরজ। রমজান মাসের ফরজ রোজার নিয়ত: “নাওয়াইতু আন আসুমা গাদান মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদান লিল্লাহি তায়ালা” অর্থ: আমি আগামীকাল রমজান মাসের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম আল্লাহর জন্য।
রমজান মাস আসলেই মুসলিমদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরে আসে রোজার নিয়ত কীভাবে করতে হয়? নিয়ত কি আরবিতে করতে হবে? বাংলায় করলে কি রোজা হবে? সেহরি না খেলে কি নিয়ত করা যায়? এই আর্টিকেলে এসব প্রশ্নের সঠিক ও তথ্যভিত্তিক উত্তর পাবেন।
নিয়ত কী এবং রোজায় নিয়তের গুরুত্ব কেন?
নিয়ত অর্থ ইচ্ছা বা সংকল্প। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, যেকোনো ইবাদত শুরুর আগে মনে মনে সেই কাজ করার সংকল্প করাকেই নিয়ত বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ইন্নামাল আমালু বিন নিয়্যাত” অর্থাৎ, সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। (সহিহ বুখারি: ১, সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)
তাই রোজার ক্ষেত্রেও নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত ছাড়া রোজা পরিপূর্ণ হয় না।
রমজান মাসের ফরজ রোজার নিয়ত
রমজানের ফরজ রোজার নিয়তের সহিহ পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো:
আরবি:
نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لِلَّهِ تَعَالَى
বাংলা উচ্চারণ:
নাওয়াইতু আন আসুমা গাদান মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদান লিল্লাহি তায়ালা।
বাংলা অর্থ:
আমি আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসের ফরজ রোজা পালনের নিয়ত করলাম, একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য।
নিয়তের সময়সীমা কখন?
হানাফি মাযহাব মতে, রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত সূর্যাস্তের পর থেকে পরদিন দুপুরের (যোহরের ওয়াক্তের আগে) মধ্যে করলেই চলে। তবে সেহরির সময় বা তার আগে নিয়ত করা সবচেয়ে উত্তম ও সাবধানী পন্থা।
শাফেয়ি মাযহাব মতে, প্রতিটি রোজার জন্য রাতেই নিয়ত করতে হবে অর্থাৎ সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করা ফরজ।
রোজার নিয়ত কি বাংলায় করা যাবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত, কিন্তু অন্তরের সংকল্পই আসল নিয়ত। যে ব্যক্তি আরবি জানে না, সে বাংলায় বা নিজের মাতৃভাষায় নিয়ত করলে রোজা সহিহ হবে।
বাংলায় নিয়ত: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকালের রমজান মাসের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম।”
তবে আরবি দোয়াটি মুখস্থ করে নেওয়া উচিত, কারণ এটি শেখা সহজ এবং সওয়াবের দিক থেকে বেশি।
বিভিন্ন ধরনের রোজার নিয়ত
নফল রোজার নিয়ত
نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا نَافِلَةً لِلَّهِ تَعَالَى
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদান নাফিলাতান লিল্লাহি তায়ালা।
অর্থ: আমি আগামীকাল নফল রোজা রাখার নিয়ত করলাম, আল্লাহর জন্য।
কাজা রোজার নিয়ত
نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا قَضَاءً لِمَا عَلَيَّ مِنْ رَمَضَانَ فَرْضًا لِلَّهِ تَعَالَى
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদান কাদাআন লিমা আলাইয়া মিন রামাদানা ফারদান লিল্লাহি তায়ালা।
অর্থ: আমার উপর রমজানের যে রোজা কাজা হয়েছে, তা পূরণের জন্য আমি আগামীকাল কাজা রোজা রাখার নিয়ত করলাম, আল্লাহর জন্য।
কাফফারা রোজার নিয়ত
কাফফারার রোজার নিয়তে ‘ফারদান’ এর স্থলে ‘কাফফারাতান’ বলতে হবে এবং কারণ উল্লেখ করতে হবে যেমন শপথ ভঙ্গের কাফফারা বা রমজানে ইচ্ছাকৃত রোজা ভাঙার কাফফারা।
সেহরি না খেলে কি রোজার নিয়ত করা যায়?
হ্যাঁ, সেহরি না খেলেও রোজার নিয়ত করা যায় এবং রোজা সহিহ হয়। সেহরি খাওয়া সুন্নত, কিন্তু নিয়তের জন্য এটি শর্ত নয়। তবে সেহরি না খেলেও অন্তরে রোজার সংকল্প থাকতে হবে।
রোজার নিয়ত করার সঠিক পদ্ধতি
- সেহরির সময় বা রাতে ঘুমানোর আগে মনে মনে সংকল্প করুন যে, ‘আমি আগামীকাল রোজা রাখব।’
- চাইলে মুখে দোয়াটি উচ্চারণ করুন [আরবিতে বা বাংলায়]।
- সুবহে সাদিকের আগে পানাহার বন্ধ করুন।
- হানাফি মাযহাব মতে দুপুরের আগে পর্যন্ত নিয়ত করা যায়, তবে সেহরির আগে করাই উত্তম।
- রমজানে প্রতিদিনের জন্য আলাদা নিয়ত করা উচিত, তবে কেউ যদি পুরো রমজানের শুরুতে একবার নিয়ত করে, হানাফি মতে তা গ্রহণযোগ্য।
ইফতারের দোয়া
اللَّهُمَّ إِنِّي لَكَ صُمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি লাকা সুমতু ওয়াবিকা আমানতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য রোজা রেখেছি, তোমার উপর ইমান এনেছি, তোমার উপর ভরসা করেছি এবং তোমার দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি।
সূত্র: আবু দাউদ: ২৩৫৮
রোজার নিয়ত সংক্রান্ত সাধারণ ভুল ধারণা
- ভুল ধারণা: নিয়ত আরবিতে না করলে রোজা হয় না। সত্য: বাংলায় বা যেকোনো ভাষায় নিয়ত করলেই রোজা সহিহ হয়।
- ভুল ধারণা: নিয়তের দোয়া মুখে উচ্চারণ করা ফরজ। সত্য: মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত, অন্তরের নিয়তই আসল।
- ভুল ধারণা: সেহরি না খেলে নিয়ত করা যায় না। সত্য: সেহরি খাওয়া সুন্নত, নিয়তের শর্ত নয়।
- ভুল ধারণা: পুরো রমজানের জন্য একবারই নিয়ত করতে হবে। সত্য: প্রতিদিন নিয়ত করা উত্তম, যদিও হানাফি মতে একবারও গ্রহণযোগ্য।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি
প্রশ্ন: রোজার নিয়ত কখন করতে হয়?
উত্তর: রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত সূর্যাস্তের পর থেকে পরদিন দুপুরের আগে (সুবহে সাদিক থেকে দুপুরের মধ্যবর্তী সময়) করা যায়। তবে রাতে বা সেহরির সময় নিয়ত করাই উত্তম।
প্রশ্ন: নিয়ত না করলে কি রোজা হয়?
উত্তর: না, নিয়ত রোজার জন্য অপরিহার্য। তবে যদি রাতে ঘুমানোর আগে মনে সংকল্প থাকে যে কাল রোজা রাখব, তাহলে সেটিই নিয়ত হিসেবে গণ্য হয়।
প্রশ্ন: রোজার নিয়ত ভুলে গেলে কী করতে হবে?
উত্তর: হানাফি মাযহাব মতে, দুপুরের আগে মনে পড়লে তখনই নিয়ত করলে রোজা সহিহ হবে। তবে শাফেয়ি মতে, সুবহে সাদিকের আগেই নিয়ত করতে হবে, তাই মনে না থাকলে রোজা কাজা করতে হবে।
প্রশ্ন: রমজানের ৩০ রোজার একসাথে নিয়ত করা যাবে?
উত্তর: হানাফি মাযহাব মতে, রমজানের শুরুতে একবার পুরো মাসের নিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য। তবে প্রতিদিন আলাদাভাবে নিয়ত করা উত্তম।
প্রশ্ন: মহিলারা কি একইভাবে রোজার নিয়ত করবেন?
উত্তর: হ্যাঁ, মহিলাদের নিয়তের পদ্ধতি একই। তবে হায়েজ (মাসিক) ও নেফাস (প্রসব-পরবর্তী রক্তস্রাব) অবস্থায় রোজা রাখা নিষেধ এবং পরে কাজা করতে হবে।
প্রশ্ন: শবে কদরের রোজার আলাদা নিয়ত কি করতে হয়?
উত্তর: না। রমজানের রোজার নিয়তই যথেষ্ট। শবে কদরের রাতে আলাদাভাবে নফল ইবাদত, নামাজ ও দোয়া করা উচিত।
প্রশ্ন: ভ্রমণে থাকলে কি রোজার নিয়তে পরিবর্তন আসে?
উত্তর: ভ্রমণে রোজা না রেখে পরে কাজা করার অনুমতি আছে। তবে যদি রোজা রাখতে চান, তাহলে স্বাভাবিক নিয়তেই রোজা রাখতে পারবেন।
রোজার নিয়ত ও রমজানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দোয়া
রোজার নিয়তের পাশাপাশি নিচের দোয়া ও আমলগুলো রমজানে পড়া উচিত:
- সেহরির দোয়া: “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিমা রযাক্তানা ওয়াকিনা আযাবান নার।”
- ইফতারের দোয়া (বর্ণিত হয়েছে): “আল্লাহুম্মা ইন্নি লাকা সুমতু…” (আবু দাউদ: ২৩৫৮)
- তারাবির নিয়ত: “নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা রাকায়াতি সালাতিত তারাবিহ…”
- লাইলাতুল কদরের দোয়া: “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” (তিরমিযি: ৩৫১৩)
রোজার ফজিলত ও গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতিসাবের সাথে (সওয়াবের আশায়) রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি: ৩৮, সহিহ মুসলিম: ৭৬০)
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “রোজা আমার জন্য, এর প্রতিদান আমি নিজেই দেব।” (সহিহ বুখারি: ৭৪৯২)
✅ তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি (হাদিস ১, ৩৮, ৭৪৯২)
- সহিহ মুসলিম (হাদিস ১৯০৭, ৭৬০)
- সুনান আবু দাউদ (হাদিস ২৩৫৮)
- সুনান তিরমিযি (হাদিস ৩৫১৩)
- আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু — ড. ওয়াহবাহ আল-যুহায়লি
- বাহারুর রায়িক — ইবনু নুজাইম (হানাফি ফিকহ)
Disclaimer: এই লেখাটির তথ্যের যেকোনো ভুল সংশোধনের জন্য বিশেষজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
📅 রিভিউার: মিনহাজ
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

