মসজিদে নববীর প্রবীণতম কোরআন শিক্ষক শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী আর নেই

মসজিদে নববীর প্রবীণতম কোরআন শিক্ষক শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী আর নেই

মদিনার পবিত্র মসজিদে নববীর সবচেয়ে প্রবীণ এবং শ্রদ্ধেয় কোরআন শিক্ষক, শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী ইন্তেকাল করেছেন। তিনি দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মসজিদে নববীতে কোরআন শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন। তাঁর নিষ্ঠা ও ত্যাগের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। মসজিদে নববীতে আসরের নামাজের পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাঁকে ঐতিহাসিক জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে মদিনাবাসীসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মদিনাতুল মুনাওয়ারা থেকে একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ এসেছে। মসজিদে নববীর অন্যতম স্তম্ভ, যার জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে আল্লাহর ঘরের আঙিনায় কোরআন শেখাতে, সেই মহান শিক্ষক শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী আমাদের মাঝে আর নেই। তাঁর ইন্তেকালে শুধু মদিনা নয়, বরং কোরআন প্রেমী প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

কে ছিলেন শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী?

শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী ছিলেন মসজিদে নববীর ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি জীবন্ত ইতিহাস।

  • প্রবীণতম উস্তাদ: তিনি ছিলেন মসজিদে নববীর বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বয়স্ক এবং অভিজ্ঞ কোরআন শিক্ষক।
  • অর্ধশতাব্দীর সেবা: ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিরলসভাবে মসজিদে নববীতে আগত শিক্ষার্থীদের কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন।

মসজিদে নববীতে ৫০ বছরের এক সোনালী অধ্যায়

শাইখ আবদুল্লাহ হাজীর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যা আজকের আধুনিক মসজিদে নববীর চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন ছিল।

  • কাঁকর বিছানো মেঝের স্মৃতি: জানা যায়, তিনি যখন মসজিদে নববীতে কোরআন শিক্ষা দান শুরু করেছিলেন, তখন মসজিদের মেঝে আজকের মতো কার্পেট বা মার্বেল পাথরের ছিল না। তখন মেঝেতে কাঁকর বিছানো থাকত। সেই কাঁকরের ওপর বসেই তিনি দিনের পর দিন কোরআনের দরস দিয়েছেন।
  • যুগের সাক্ষী: তিনি মসজিদে নববীর অবকাঠামোগত অনেক পরিবর্তন ও সম্প্রসারণ নিজের চোখে দেখেছেন, কিন্তু তাঁর কোরআন শেখানোর স্থানটি ছিল অপরিবর্তিত।

নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত (শিক্ষার প্রতি অতুলনীয় ত্যাগ)

কোরআন শিক্ষার প্রতি শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজীর নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। তাঁর জীবনের একটি ঘটনা এই নিষ্ঠার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বহন করে।

  • জানা যায়, একবার তাঁর আপন বোনের ইন্তেকাল হয়। তিনি বোনের জানাজা ও দাফন কাফন সম্পন্ন করেন।
  • স্বাভাবিকভাবেই এটি ছিল অত্যন্ত শোকের সময়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, দাফন শেষ করার পরপরই সেদিনই তিনি আবার মসজিদে নববীতে তাঁর শিক্ষার্থীদের মাঝে ফিরে আসেন এবং যথারীতি কোরআন পাঠদান শুরু করেন। ব্যক্তিগত শোক তাঁর দায়িত্ব পালনে বাধা হতে পারেনি।

জানাজা এবং জান্নাতুল বাকিতে দাফন

এই মহান ব্যক্তিত্বের বিদায়ও হয়েছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণভাবে।

  • জানাজা: মসজিদে নববীতে আসরের নামাজের পর তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। হাজারো মুসল্লি ও তাঁর ছাত্ররা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁদের প্রিয় উস্তাদকে বিদায় জানান।
  • দাফন: জানাজা শেষে তাঁকে মদিনার ঐতিহাসিক ‘জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থানে দাফন করা হয়, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অসংখ্য সাহাবী এবং পরিবারের সদস্যরা শায়িত আছেন।

তাঁর রেখে যাওয়া ঐতিহ্য ও অবদান

শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী চলে গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া অবদান কখনো মুছে যাবে না।

  • প্রজন্মের শিক্ষক: দীর্ঘ পাঁচ দশকের শিক্ষকতা জীবনে তিনি বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কোরআন শিখিয়েছেন।
  • শিক্ষকদের শিক্ষক: তাঁর কাছে শিক্ষা লাভ করা অসংখ্য ছাত্র আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেরাই কোরআনের শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এভাবেই তাঁর শেখানো জ্ঞান সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে।

সাধারণ জিজ্ঞাস্য

১. শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজী কত বছর মসজিদে নববীতে শিক্ষকতা করেছেন?

তিনি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মসজিদে নববীতে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন।

২. তাঁকে কোথায় দাফন করা হয়েছে?

তাঁকে মদিনার ঐতিহাসিক জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

৩. তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে কি কোনো বিতর্ক আছে?

না, তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে কোনো আনুষ্ঠানিক বিতর্ক বা ভিন্নমত জানা যায়নি। এটি ছিল স্বাভাবিক বার্ধক্যজনিত ইন্তেকাল।

৪. তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল কোরআন শিক্ষার প্রতি অতুলনীয় নিষ্ঠা। তিনি বোনের দাফন শেষ করেই সরাসরি ক্লাসে ফিরে এসেছিলেন বলে জানা যায়।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:

এই আর্টিকেলের সকল তথ্য মসজিদে নববী কেন্দ্রিক নির্ভরযোগ্য সংবাদ উৎস এবং শাইখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ হাজীর জীবনীর ওপর ভিত্তি করে সংকলিত। আমরা এই মহান শিক্ষকের মাগফিরাত কামনা করি।

Leave a Comment

Scroll to Top