কীভাবে কাজ করে এই ১.৫ মিমি সেন্সর?

চীনা একাডেমি অফ সায়েন্সেসের (Chinese Academy of Sciences) বিজ্ঞানীরা ফলের মাছি বা ফ্রুট ফ্লাই (Fruit Fly) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ১.৫ মিমি আকারের একটি কৃত্রিম “পুঞ্জাক্ষি” বা কম্পাউন্ড আই (Compound Eye) তৈরি করেছেন। এই ক্ষুদ্র সেন্সরটি রোবট বা মাইক্রো-ড্রোনকে ১৮০-ডিগ্রি প্রশস্ত ভিউ বা দৃশ্য দেখার ক্ষমতা দেয়। একইসাথে এতে থাকা বায়োনিক কেমিক্যাল সেন্সর ক্ষতিকারক গ্যাস শনাক্ত করতে পারে, অর্থাৎ এটি রোবটকে একসাথে “দেখা” এবং “গন্ধ শোঁকার” ক্ষমতা প্রদান করে।

প্রকৃতি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। ছোট একটি মাছি যেভাবে দ্রুত উড়ে বেড়ায় এবং কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খায় না, সেই প্রযুক্তিই এবার চলে এসেছে রোবোটিক্সে। ভারী ক্যামেরা বা বড় সেন্সর ছাড়াই রোবট এখন চারপাশ দেখতে পারবে এবং বিপদ বুঝতে পারবে। চলুন জেনে নিই এই যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে।

১.৫ মিমি সেন্সরে কী কী থাকছে?

এই সেন্সরটি আকারে একটি চালের দানার চেয়েও ছোট, কিন্তু এর কার্যক্ষমতা বিশাল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • ১,০২৭টি ক্ষুদ্র লেন্স: অ্যাডভান্সড লেজার প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এতে ১,০২৭টি ক্ষুদ্র ভিজ্যুয়াল ইউনিট বসানো হয়েছে।
  • ১৮০-ডিগ্রি ভিউ: সাধারণ ক্যামেরার মতো এটি সোজা তাকায় না, বরং মাছির চোখের মতো এটি ১৮০-ডিগ্রি বা অর্ধবৃত্তাকার এলাকাজুড়ে নজর রাখতে পারে।
  • দ্বৈত ক্ষমতা (Vision & Smell): এটি শুধু দেখেই ক্ষান্ত হয় না, এর মধ্যে থাকা রাসায়নিক সেন্সর বাতাসের পরিবর্তন বা ক্ষতিকর গ্যাস বুঝতে পারে।

কীভাবে কাজ করে এই “কৃত্রিম চোখ”?

গবেষকরা এই সেন্সরটি তৈরি করতে ফলের মাছির চোখের গঠন অনুকরণ করেছেন।

১. দেখার প্রযুক্তি (Visual Tech):

সাধারণত রোবটকে ১৮০ ডিগ্রি দেখাতে হলে একাধিক ক্যামেরা বা ফিশ-আই লেন্সের দরকার হয়, যা ভারী এবং বড়। কিন্তু এই সেন্সরের ১,০২৭টি ইউনিট প্রতিটি দিক থেকে আলো সংগ্রহ করে একটি প্যানোরামিক বা প্রশস্ত ছবি তৈরি করে। ফলে মাইক্রো-ড্রোন বা ছোট রোবট সহজেই চারপাশ দেখতে পায়।

২. গন্ধ বা কেমিক্যাল সেন্সর (Smell Tech):

এই সেন্সরে একটি বিশেষ ন্যানো-মেটারিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে যা ক্ষতিকারক গ্যাসের সংস্পর্শে এলে রঙ পরিবর্তন করে। যখনই কোনো বিষাক্ত গ্যাস বা ধোঁয়া সেন্সরের নাগালে আসে, এটি সাথে সাথে সংকেত পাঠায়।

পরীক্ষায় সাফল্য: রোবট এখন কতটা স্মার্ট?

গবেষকরা একটি ছোট রোবটে এই সেন্সর বসিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন। ফলাফলে দেখা গেছে:

  • রোবটটি তার সামনে এবং পাশে থাকা চলমান বস্তু (Moving objects) শনাক্ত করতে পারছে।
  • কোনো বাধা বা অবস্ট্যাকল (Obstacle) এলে তা এড়িয়ে চলতে পারছে।
  • একই সময়ে দেখার কাজ এবং গ্যাসের উপস্থিতি টের পাওয়ার কাজ সফলভাবে করতে পারছে।

সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ

যেকোনো নতুন প্রযুক্তির মতো এর কিছু সীমাবদ্ধতা বা চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে:

  • ছবির মান (Resolution): এটি সাধারণ ক্যামেরার মতো হাই-ডেফিনিশন (HD) ছবি দিতে পারে না। ছবির রেজোলিউশন কিছুটা কম।
  • বিকৃতি (Distortion): ১৮০-ডিগ্রি ভিউয়ের কারণে ছবিতে সামান্য বিকৃতি বা কার্ভ দেখা যায়।
  • ধীরগতি (Response Time): কেমিক্যাল সেন্সরটি গ্যাস শনাক্ত করতে কিছুটা সময় নেয়, যা তাৎক্ষণিক রিঅ্যাকশনের জন্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আমাদের লাভ

গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে এর রেজোলিউশন বাড়ানো হবে এবং গ্যাস শনাক্তকরণের গতি বৃদ্ধি করা হবে। তখন এটি আমাদের কী কাজে লাগবে?

১. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (Disaster Rescue): বাংলাদেশে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি বা সরু গলিতে আগুন লাগলে যেখানে মানুষ বা বড় ড্রোন ঢুকতে পারে না, সেখানে এই সেন্সরযুক্ত মাইক্রো-ড্রোন ঢুকে পরিস্থিতি দেখতে পারবে এবং বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা জানাতে পারবে।

২. পাইপলাইন পরিদর্শন: সরু গ্যাস লাইন বা তেলের পাইপ লিক হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করতে এটি ব্যবহার করা যাবে।

৩. মেডিকেল সায়েন্স: শরীরের ভেতরে ছোট রোবট পাঠিয়ে রোগ নির্ণয়েও এই প্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন: এই সেন্সরটির আকার কত?

উত্তর: এই সেন্সরটির ব্যাস মাত্র ১.৫ মিলিমিটার।

প্রশ্ন: এটি কোন প্রযুক্তিতে তৈরি?

উত্তর: এটি ফলের মাছির চোখের আদলে “আর্টিফিশিয়াল কম্পাউন্ড আই” বা কৃত্রিম পুঞ্জাক্ষি প্রযুক্তিতে তৈরি এবং এতে লেজার প্রিন্টিং ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রশ্ন: এটি কি শুধু ছবি তোলে?

উত্তর: না, এটি ছবির তোলার পাশাপাশি ক্ষতিকারক গ্যাস বা রাসায়নিক পদার্থ শনাক্ত (গন্ধ শোঁকা) করতে পারে।

প্রশ্ন: কারা এটি আবিষ্কার করেছেন?

উত্তর: চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস (Chinese Academy of Sciences)-এর বিজ্ঞানীরা এটি তৈরি করেছেন।

পাঠকের জন্য শেষ কথা

প্রযুক্তি যত ছোট হচ্ছে, এর ক্ষমতা তত বাড়ছে। ১.৫ মিমির এই সেন্সরটি রোবোটিক্সের জগতে এক নতুন দিগন্ত। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির কাছ থেকে শেখার এখনো অনেক কিছু বাকি। আমাদের দেশেও যদি দুর্যোগ মোকাবিলায় এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়, তবে অনেক প্রাণহানি কমানো সম্ভব হবে।

Disclaimer: এই নিবন্ধের সকল তথ্য সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র এবং সায়েন্স রিপোর্ট (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এর ওপর ভিত্তি করে লিখিত। গবেষণা চলমান থাকায় ভবিষ্যতে তথ্যের পরিবর্তন হতে পারে।

Leave a Comment

Scroll to Top