আন্তর্জাতিক আইন হলো সেই নিয়মাবলী যা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আগ্রাসন এবং বড় শক্তিগুলোর একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে এই আইনগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যখন শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে নিয়ম ভাঙে এবং কোনো জবাবদিহিতার মুখে পড়ে না, তখনই “আন্তর্জাতিক আইনের সংকট” তৈরি হয়। এই শূন্যতা থেকে একটি নতুন “বিশ্বব্যবস্থা” বা World Order জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বকে অস্থির করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক আইন কি এখন কেবলই কাগজে-কলমে?
বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যাকে যমুনা টিভির বিশ্লেষণে “ফ্রি স্টাইল” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নিয়ম আছে কিন্তু মানার লোক নেই।
- জবাবদিহিতার অভাব: বড় শক্তিগুলো (যেমন: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন) আন্তর্জাতিক আদালত বা জাতিসংঘের তোয়াক্কা না করেই সামরিক অভিযান চালাচ্ছে।
- শক্তির রাজনীতি: যার হাতে ক্ষমতা বা অস্ত্র আছে, নিয়মগুলো তারই পক্ষে কাজ করছে।
- জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা: নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা বিশ্বশান্তি রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যবস্থার বিবর্তন: ওয়েস্টফেলিয়া থেকে বর্তমান
আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাস বুঝলে বর্তমান সংকট বোঝা সহজ হয়:
- পিস অফ ওয়েস্টফেলিয়া (১৬৪৮): এখান থেকেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ‘সার্বভৌমত্ব’ বা নিজের এলাকায় নিজের কর্তৃত্বের ধারণা শুরু হয়।
- লিগ অফ নেশনস (১৯১৯): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধ থামাতে এটি তৈরি হলেও বড় দেশগুলোর অনীহায় এটি ব্যর্থ হয়।
- জাতিসংঘ (১৯৪৫): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কিছুক্ষেত্রে সফল হলেও বর্তমানে এর ক্ষমতাকে ‘ফ্যান্টম পেইন’ (অস্তিত্ব আছে কিন্তু কাজ করে না) হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- এক মেরু বিশ্ব (১৯৯১-২০২০): সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে বিশ্ব শাসন করেছে।
- বহু মেরু বিশ্বের উদয় (বর্তমান): চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোর উত্থানে ক্ষমতা এখন আর এক জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই।
নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক আইনের এই ভাঙাগড়ার খেলায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর:
- অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: বড় শক্তির লড়াইয়ের ফলে জ্বালানি তেল ও ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ বাংলাদেশীদের পকেটে।
- কূটনৈতিক ভারসাম্য: বাংলাদেশ সবসময় “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়” নীতিতে চলে। কিন্তু বিশ্বব্যবস্থা বদলে গেলে এই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
- নিরাপত্তা ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হলে মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে রোহিঙ্গা সংকটের মতো সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে যায়।
কেন জাতিসংঘ এখন ‘অক্ষম’ সংস্থা হিসেবে পরিচিত?
জাতিসংঘকে কেন এখন অনেকে ব্যর্থ বলছেন, তার প্রধান কারণগুলো হলো:
- ভেটো (Veto) পাওয়ার: পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের যেকোনো একটি দেশ চাইলে যেকোনো শান্তি প্রস্তাব আটকে দিতে পারে।
- অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা: বড় দেশগুলোর অনুদানের ওপর নির্ভর করায় জাতিসংঘ সবসময় নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
- আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা: আন্তর্জাতিক আদালতের রায় বাস্তবায়নের কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বাহিনী জাতিসংঘের নেই।
শান্তি নাকি সংঘাত?
পুরনো নিয়ম ভাঙছে কিন্তু নতুন কোনো সর্বজনীন নিয়ম এখনো তৈরি হয়নি। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি শান্তিপূর্ণ নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বড় শক্তিগুলোকে পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমঝোতায় আসতে হবে। নতুবা ইতিহাস সাক্ষী, পুরনো ব্যবস্থা ভাঙার প্রক্রিয়া সবসময় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমেই হয়েছে।
তথ্যসূত্র ও বিশ্বাসযোগ্য সোর্স:
- যমুনা টিভি: আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন (জানুয়ারি ২০২৬)।
- জাতিসংঘ আর্কাইভস: আন্তর্জাতিক চুক্তির ইতিহাস।
- নিউ ইয়র্ক টাইমস: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বর্তমান ভূ-রাজনীতি বিষয়ক সাক্ষাৎকার।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”
