হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? এর পেছনের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতি

হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন এর পেছনের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতি

হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) হলো পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগকারী একটি সরু সামুদ্রিক পথ। এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রতিদিন বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) এক-চতুর্থাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর (যেমন: ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত) আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানির এটিই একমাত্র প্রধান পথ। এই প্রণালী সামান্য সময়ের জন্য বন্ধ হলে বা এখানে কোনো উত্তেজনা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়।

হরমুজ প্রণালী কী এবং এটি কোথায় অবস্থিত?

দুটি বিশাল জলরাশির মধ্যে সংযোগকারী প্রাকৃতিক ও সরু জলপথকে প্রণালী বলা হয়। হরমুজ প্রণালী মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত, যা পশ্চিমে থাকা পারস্য উপসাগরকে (Persian Gulf) পূর্বে থাকা ওমান উপসাগর (Gulf of Oman) এবং আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে।

ভৌগোলিকভাবে এই প্রণালীটি ইরান এবং ওমানের জলসীমার অন্তর্গত। এর মাধ্যমে ইরান আরব উপদ্বীপ থেকে পৃথক হয়েছে।

  • দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ: এই প্রণালীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার। এর সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার।
  • শিপিং লাইন: ৩৩ কিলোমিটার চওড়া হলেও পুরোটা দিয়ে বড় জাহাজ চলতে পারে না। এর ঠিক মাঝ বরাবর মাত্র ৩ কিলোমিটার চওড়া দুটি ‘শিপিং লাইন’ রয়েছে, যা দিয়ে বিশ্বের বিশাল সব তেলবাহী ট্যাঙ্কার যাতায়াত করে।

কেন হরমুজ প্রণালীকে “বিশ্ব অর্থনীতির গলা” বলা হয়?

হরমুজ প্রণালীকে বিশ্ব বাণিজ্যের বা অর্থনীতির “গলা” (Chokepoint) বলার প্রধান কারণ হলো জ্বালানি তেলের ওপর এর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। এই পথটি বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতির ‘দম বন্ধ’ হওয়ার উপক্রম হয়। এর পেছনে থাকা প্রধান কারণগুলো নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:

১. তেল পরিবহনের একমাত্র রুট: মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদক দেশ—ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর এটিই একমাত্র পথ। শুধু সৌদি আরব বাদে অন্য কোনো দেশের বিকল্প কোনো পাইপলাইন বা জলপথ নেই।

২. বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন: মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (EIA)-এর মতে, এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা পুরো বিশ্বের খনিজ তেল বাণিজ্যের তিন ভাগের এক ভাগ (৩৩%)।

৩. প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহন: শুধু তেল নয়, বিশ্বে উৎপাদিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) চার ভাগের এক ভাগ (২৫%) এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়।

৪. প্রধান আমদানিকারক দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম চাবিকাঠি এটি।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ইরান ও আমেরিকার ভূ-রাজনীতি

বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এই মাত্র ৩৩ কিলোমিটারের জলপথ।

  • ট্যাঙ্কার যুদ্ধ ও মাইন আতঙ্ক: ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় (১৯৮০-এর দশকে) ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক মাইন পেতে রাখে। তখন থেকেই ইরান এই প্রণালীকে পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
  • আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি: হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। বর্তমানে ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—প্রায় প্রতিটি উপসাগরীয় দেশেই আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
  • সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও তেলের দাম: সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালীতে সব ধরনের জাহাজ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় রাতারাতি বিশ্ববাজারে তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কী হবে?

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেল সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে এবং সারা বিশ্বে পরিবহন খরচ, উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে।

২. হরমুজ প্রণালী কোন কোন সাগরকে যুক্ত করেছে?

হরমুজ প্রণালী পশ্চিমে থাকা পারস্য উপসাগরকে (Persian Gulf) পূর্বে থাকা ওমান উপসাগর (Gulf of Oman) এবং আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে।

৩. হরমুজ প্রণালী কোন দুটি দেশের মধ্যে অবস্থিত?

হরমুজ প্রণালী মূলত ইরান এবং ওমানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। এর উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে।

৪. প্রতিদিন কত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়?

প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ৩৩ শতাংশ।

৫. বাংলাদেশ কীভাবে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়?

বাংলাদেশ তার জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীতে কোনো উত্তেজনা বা যুদ্ধ দেখা দিলে তেলের দাম বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবহন খাত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর পড়ে।

Leave a Comment

Scroll to Top