ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচন ২০২৬-২৭

ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচন ২০২৬-২৭

ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচন ২০২৬-২৭ কবে?

ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) ২০২৬-২৭ মেয়াদের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ চলবে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত (বেলা ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ১ ঘণ্টার বিরতিসহ)। সমিতির ২৩টি পদে নির্বাচন হবে এবং প্রায় ৩০,০০০-এর বেশি আইনজীবী এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতি কী এবং কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ?

ঢাকা আইনজীবী সমিতি, যা সাধারণভাবে “ঢাকা বার” নামে পরিচিত, এশিয়ার বৃহত্তম বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর একটি। দেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইনি পেশার গতিপ্রকৃতি অনেকটাই এই সমিতির নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে।

প্রতি বছর এই সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটি নির্বাচন হয়। নতুন কমিটির সদস্যরা আইনজীবীদের পেশাগত সুবিধা, আদালত পরিচালনা, সদস্যদের কল্যাণ এবং আইনি শিক্ষা-গবেষণার দিকনির্দেশনা দেন। তাই এই নির্বাচন শুধু আইনজীবীদের নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের বিচারব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ঢাকা বার নির্বাচন ২০২৬-২৭: সম্পূর্ণ তফসিল

নির্বাচন কমিশন গত ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। এবারের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মো. বোরহান উদ্দিন।

তফসিলের বিস্তারিত:

তারিখকার্যক্রম
৫, ৬ ও ৭ এপ্রিল ২০২৬মনোনয়নপত্র বিতরণ, দাখিল ও গ্রহণ (সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা)
৮ এপ্রিল ২০২৬মনোনয়নপত্র বাছাই (বেলা ২টায়)
৯ এপ্রিল ২০২৬বৈধ মনোনয়নপত্রের তালিকা প্রকাশ (সকাল ১১টায়)
১২ এপ্রিল ২০২৬মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ (বিকেল ৪:৩০ মিনিটে)
২৬ এপ্রিল ২০২৬প্রার্থী পরিচিতি সভা (বেলা ২টায়, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ প্রাঙ্গণ)
২৯ ও ৩০ এপ্রিল ২০২৬ভোটগ্রহণ (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা, মাঝে ১টা-২টা বিরতি)

কতটি পদে নির্বাচন হবে?

ঐতিহ্যবাহী ধারা বজায় রেখে এবারের নির্বাচনে মোট ২৩টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। পদগুলো হলো:

  • সভাপতি
  • সিনিয়র সহ-সভাপতি
  • সহ-সভাপতি
  • সাধারণ সম্পাদক
  • সিনিয়র সহ-সম্পাদক
  • সহ-সম্পাদক
  • কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার)
  • সাংস্কৃতিক সম্পাদক
  • লাইব্রেরি সম্পাদক
  • দপ্তর সম্পাদক
  • সমাজ কল্যাণ সম্পাদক
  • ক্রীড়া সম্পাদক
  • তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক
  • এবং ১০টি সাধারণ সদস্য পদ।

প্রার্থী হতে হলে কী যোগ্যতা লাগবে?

ঢাকা বারে বিভিন্ন পদে নির্বাচন করতে আইন পেশায় নির্দিষ্ট বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন:

  • সভাপতি পদ: আইন পেশায় ন্যূনতম ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা।
  • সিনিয়র সহ-সভাপতি: ২২ বছর।
  • সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক: ২০ বছর।
  • কোষাধ্যক্ষ: ১৫ বছর।
  • সিনিয়র সহ-সম্পাদক: ১০ বছর।
  • অন্যান্য সম্পাদক পদ: ৮ বছর।
  • সাধারণ সদস্য পদ: ন্যূনতম ৫ বছর আগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে হবে।

এবারের নির্বাচনে কোন কোন প্যানেল অংশ নিচ্ছে?

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বার নির্বাচনে দুটি প্রধান প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে— বিএনপি-সমর্থিত নীল প্যানেল (জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য) এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সাদা প্যানেল।

তবে ২০২৬-২৭ সালের নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আইনজীবী সংগঠন ‘ন্যাশনাল এলায়েন্স (এনএলএ)’ এবারের নির্বাচনে সবুজ প্যানেল থেকে প্রার্থী মনোনীত করেছে। দলটির আহ্বায়ক, ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ১৫ এপ্রিল এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

এনসিপির মনোনীত প্রার্থীরা (সবুজ প্যানেল):

  • সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে: মো. মেহেদী হাসান ভুঁইয়া (আহ্বায়ক, এনএলএ, ঢাকা বার)
  • সদস্য পদে: বেলাল হোসাইন

এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা “বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক ঢাকা আইনজীবী সমিতি প্রতিষ্ঠায়” বদ্ধপরিকর।

২০২৪-২৫ মেয়াদের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সাদা প্যানেল ২৩টি পদের সবকটিতে জয় পেলেও, বিএনপি-সমর্থিত নীল প্যানেল কারচুপির অভিযোগে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাচিতরা আদালতে আসা বন্ধ করে দিলে সমিতির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার উপক্রম হয়। এরপর অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে বারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। ফলে, দীর্ঘ বিরতি ও রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবারের নির্বাচনটি সকল পক্ষের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষা।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচন ২০২৬: সর্বশেষ আপডেট

ঢাকা বারের নির্বাচনের প্রস্তুতির মাঝেই একটি বড় খবর হলো—বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ২০২৬ সালের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ১৯ মে ভোটগ্রহণের কথা থাকলেও, গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ রাতে বার কাউন্সিল ভবনে এক জরুরি সভায় ‘তীব্র জ্বালানি সংকট’-এর কারণ দেখিয়ে নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বার কাউন্সিলে প্রতি তিন বছর অন্তর নির্বাচন হয়। মোট ১৪টি পদে ভোট হয় এবং বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল পদাধিকারবলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

আইনজীবীদের জন্য নির্বাচনে ভোট দেওয়ার নিয়ম

আপনি যদি ঢাকা বারের নিবন্ধিত আইনজীবী হন, তবে ভোট দেওয়ার জন্য নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

১. ভোটার তালিকা যাচাই: নির্বাচনের আগেই নিজের নাম ভোটার তালিকায় আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন।

২. পরিচয়পত্র: ভোটের দিন অবশ্যই বার কাউন্সিল সনদ বা পরিচয়পত্র সাথে রাখুন।

৩. ভোটের সময়সূচি: সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট দেওয়া যাবে। তবে বেলা ১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার বিরতি থাকবে।

৪. ভোটকেন্দ্র: ঢাকা আইনজীবী সমিতি মূল ভবন।

৫. ভোটের দিন: ২৯ ও ৩০ এপ্রিল—যে কোনো একদিন ভোট দেওয়া যাবে।

পাঠকদের সাধারণ প্রশ্নোত্তর

ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন কখন হয়?

সাধারণত প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এই নির্বাচন হয়ে থাকে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অ্যাডহক কমিটির কারণে ২০২৬-২৭ মেয়াদের নির্বাচনটি ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ঢাকা বারের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে?

২০২৬-২৭ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মো. বোরহান উদ্দিন।

ঢাকা বারের নির্বাচনে কোন কোন পদে ভোট হয়?

মোট ২৩টি পদে ভোট হয়—সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন সম্পাদকীয় ও সাধারণ সদস্য পদ।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচন ২০২৬ কি হবে?

দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ১৯ মে ২০২৬-এর নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

ঢাকা বার নির্বাচনে এবার কোন নতুন দল অংশ নিচ্ছে?

এবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আইনজীবী সংগঠন ন্যাশনাল এলায়েন্স (এনএলএ) ‘সবুজ প্যানেল’ নামে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

২০২৬-২৭ নির্বাচনের রাজনৈতিক গুরুত্ব

৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর এটি ঢাকা বারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন।

১. নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য: নীল প্যানেলের সাথে এবার নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া এনসিপি-সমর্থিত সবুজ প্যানেলের অংশগ্রহণ নির্বাচনকে বহুমুখী করেছে।

২. আস্থা পুনরুদ্ধার: অতীতের কারচুপির অভিযোগ কাটিয়ে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হলে দেশের আইনি অঙ্গনে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে।

৩. বিচার বিভাগের সংস্কার: ঢাকা বারের নতুন নেতৃত্ব দেশের সার্বিক বিচার বিভাগীয় সংস্কার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Comment

Scroll to Top