অক্ষয় তৃতীয়া ২০২৬ কবে?
২০২৬ সালে অক্ষয় তৃতীয়া পালিত হবে ১৯ এপ্রিল, রবিবার।
তৃতীয়া তিথি শুরু: ১৯ এপ্রিল সকাল ১০:৪৯ মিনিট তৃতীয়া তিথি শেষ: ২০ এপ্রিল সকাল ৭:২৭ মিনিট পূজার শুভ মুহূর্ত: ১৯ এপ্রিল সকাল ১০:৪৯ — দুপুর ১২:৩৪ মিনিট
সনাতন ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে তিথি গণনা হয়, তাই ১৯ এপ্রিল রবিবারই মূল উদযাপনের দিন।
অক্ষয় তৃতীয়া কী?
“অক্ষয়” শব্দের অর্থ হলো যা কখনও ক্ষয় হয় না, যা চিরস্থায়ী। “তৃতীয়া” মানে হিন্দু পঞ্জিকার তৃতীয় তিথি।
প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে এই পবিত্র উৎসব পালিত হয়। হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি বছরের সবচেয়ে শুভ তিথিগুলোর একটি।
বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে করা যেকোনো পুণ্যকর্ম — দান, পূজা, নতুন কাজের সূচনা, বিয়ে, গৃহপ্রবেশ — এর ফল কখনো নষ্ট হয় না। অর্থাৎ পুণ্যের ফল অক্ষয় বা চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
২০২৬ সালের অক্ষয় তৃতীয়া কেন বিশেষ?
এ বছরের অক্ষয় তৃতীয়া একটু আলাদাভাবে বিশেষ, কারণ এই দিনে একাধিক দুর্লভ জ্যোতিষ যোগ একসাথে তৈরি হচ্ছে:
- সূর্য ও চন্দ্র উভয়ই তাদের উচ্চ রাশিতে অবস্থান করবে
- মালব্য রাজযোগ তৈরি হবে (শুক্র বৃষ রাশিতে প্রবেশ করায়)
- গজকেশরী যোগ তৈরি হবে — যা অত্যন্ত শুভ ও শক্তিশালী বলে বিবেচিত
জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, এই একাধিক শুভ যোগের সমন্বয় এই দিনটিকে অত্যন্ত ফলদায়ক করে তুলছে।
অক্ষয় তৃতীয়ার ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি
কেন এই দিনটি এত পবিত্র?
পুরাণ ও শাস্ত্র অনুযায়ী অক্ষয় তৃতীয়ার সাথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জুড়িয়ে আছে:
১. পরশুরামের আবির্ভাব: বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার ভগবান পরশুরামের জন্ম এই তিথিতেই হয়েছিল।
২. মহাভারত রচনার সূচনা: এই দিনে মহর্ষি বেদব্যাস ও গণেশ একসাথে মহাভারত রচনা শুরু করেছিলেন।
৩. গঙ্গার পৃথিবীতে অবতরণ: বিশ্বাস করা হয়, পবিত্র গঙ্গা নদী এই তিথিতেই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
৪. ত্রেতাযুগের সূচনা: সত্যযুগের সমাপ্তি এবং ত্রেতাযুগের শুরু এই তিথি থেকেই হয়েছিল বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
৫. অক্ষয়পাত্রের কাহিনি: বনবাসে থাকাকালীন পাণ্ডবরা খাবারের অভাবে কষ্ট পাচ্ছিলেন। যুধিষ্ঠির সূর্যদেবের কাছে প্রার্থনা করলে সূর্যদেব তাঁকে অক্ষয়পাত্র দেন — এই পাত্র থেকে অফুরন্ত খাবার পাওয়া যেত।
৬. চারধাম যাত্রার সূচনা: প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী মন্দিরের দরজা শীতকালীন বিরতির পর খোলা হয়।
অক্ষয় তৃতীয়ার পূজাবিধি
পূজার আগে কী করবেন?
- ভোরবেলা উঠে স্নান করুন, পরিষ্কার পোশাক পরুন
- পূজার ঘর পরিষ্কার করুন, তুলসী পাতা, ফুল ও ধূপ প্রস্তুত রাখুন
- পূজার আগে মনে মনে সংকল্প নিন — কী উদ্দেশ্যে পূজা করছেন
পূজার ধাপ
ধাপ ১: দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি বা ছবির সামনে বসুন।
ধাপ ২: কলশ স্থাপন করুন এবং শুদ্ধ জল, তুলসী পাতা ও আম পাতা দিয়ে সজ্জিত করুন।
ধাপ ৩: হলুদ ফুল, হলুদ চন্দন ও হলুদ বস্ত্র নিবেদন করুন (লক্ষ্মীর প্রিয় রং হলুদ)।
ধাপ ৪: ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে লক্ষ্মী-নারায়ণের আরতি করুন।
ধাপ ৫: পুরাণ পাঠ করুন বা মন্ত্র জপ করুন।
ধাপ ৬: দান করুন — জল, অন্ন, বস্ত্র বা অর্থ দান এই দিনে বিশেষ পুণ্যজনক।
পূজার সেরা সময়
শুভ মুহূর্ত: সকাল ১০:৪৯ — দুপুর ১২:৩৪ মিনিট (১৯ এপ্রিল ২০২৬)
তবে মনে রাখবেন — অক্ষয় তৃতীয়ার বিশেষত্ব হলো এই দিনটি সম্পূর্ণভাবে শুভ। আলাদা মুহূর্ত না দেখলেও চলে, সারাদিনই পুণ্যকর্ম করা যায়।
অক্ষয় তৃতীয়ায় কী কী করা শুভ?
এই দিনটি শুধু পূজার দিন নয়, জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়:
- বিয়ে ও বিবাহ অনুষ্ঠান: পঞ্জিকা না দেখেই বিয়ে করা যায়, কারণ এই তিথিতে করা বিবাহ চিরসুখী হয় বলে বিশ্বাস।
- গৃহপ্রবেশ: নতুন বাড়িতে উঠলে সুখ-সমৃদ্ধি স্থায়ী হয়।
- নতুন ব্যবসা শুরু: উদ্যোক্তারা এই দিনে ব্যবসার সূচনা করলে সাফল্য আসে বলে বিশ্বাস।
- সোনা বা মূল্যবান ধাতু কেনা: সোনা কিনলে সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
- জমি, বাড়ি বা গাড়ি কেনা: দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য শুভ সময়।
- দান-ধর্মকর্ম: জল, অন্ন, পোশাক, গুড় দান করলে অক্ষয় পুণ্য অর্জন হয়।
- পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তর্পণ: পিতৃতর্পণ করলে পূর্বপুরুষদের আত্মা শান্তি পান।
- মুণ্ডন বা নামকরণ: শিশুর প্রথম চুল কাটা বা নামকরণ এই দিনে শুভ।
অক্ষয় তৃতীয়ায় সোনা কেনার ঐতিহ্য
বাংলাদেশ ও ভারতে অক্ষয় তৃতীয়ায় সোনা কেনার ঐতিহ্য বহু পুরনো। এর পেছনে আছে একটি সহজ বিশ্বাস:
সোনা হলো দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক। এই দিনে সোনা কিনলে লক্ষ্মীর আশীর্বাদ ঘরে স্থায়ী হয় এবং সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
সোনা কেনার সামর্থ্য না থাকলে কী করবেন?
চিন্তা নেই! শাস্ত্র বলে, সোনার বিকল্প হিসেবে এগুলোও সমান শুভ:
- রান্নাঘরের নতুন বাসন বা সরঞ্জাম কেনা — পরিবারের সমৃদ্ধি আনে
- তুলসী গাছ বা ফুলের চারা কেনা — ঘরে ইতিবাচক শক্তি আনে
- শিশুদের জন্য নতুন পোশাক বা শিক্ষার উপকরণ কেনা — শুভ ও পুণ্যজনক
মনে রাখবেন — এই দিনের মূল কথা হলো বিশ্বাস, পূজা ও দান। দামি জিনিস না কিনলেও মনের ভক্তি থাকলেই হয়।
বাংলাদেশে অক্ষয় তৃতীয়া কীভাবে পালন করা হয়?
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অক্ষয় তৃতীয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। বিশেষত ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ সারা দেশের মন্দিরগুলোতে এই দিনে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য:
- মন্দিরে সকাল থেকে বিশেষ লক্ষ্মী-নারায়ণ পূজা
- পরিবারের সকলে একসাথে প্রার্থনা ও দানের আয়োজন
- অনেক পরিবার এই দিনে বিবাহ বা নামকরণ অনুষ্ঠান করেন
- সোনার গহনা বা মূল্যবান জিনিস কেনার পরিকল্পনা করেন অনেকে
অক্ষয় তৃতীয়ায় কী কী করা উচিত নয়?
- মিথ্যা কথা বলা এড়িয়ে চলুন
- কারও সাথে ঝগড়া বা বিবাদ করবেন না
- মাছ, মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকলে ভালো (নিরামিষ খাওয়া শুভ)
- কোনো অশুভ বা হিংসাত্মক কাজ এড়িয়ে চলুন
- অলস থাকবেন না — এই দিন কর্মের দিন
অক্ষয় তৃতীয়া ২০২৬ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| উৎসবের তারিখ | ১৯ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার |
| বাংলা তারিখ | বৈশাখ মাস, শুক্লপক্ষ তৃতীয়া |
| তিথি শুরু | ১৯ এপ্রিল সকাল ১০:৪৯ |
| তিথি শেষ | ২০ এপ্রিল সকাল ৭:২৭ |
| পূজার শুভ সময় | সকাল ১০:৪৯ — দুপুর ১২:৩৪ |
| প্রধান দেবতা | দেবী লক্ষ্মী ও বিষ্ণু |
| বিশেষ যোগ | মালব্য রাজযোগ, গজকেশরী যোগ |
সচরাচর জিজ্ঞাসা
২০২৬ সালে অক্ষয় তৃতীয়া ১৯ এপ্রিল, রবিবার পালিত হবে। তৃতীয়া তিথি শুরু হচ্ছে ১৯ এপ্রিল সকাল ১০:৪৯ মিনিটে এবং শেষ হবে ২০ এপ্রিল সকাল ৭:২৭ মিনিটে। উদয়তিথির নিয়মে ১৯ এপ্রিলই মূল উৎসবের দিন।
২০২৬ সালে অক্ষয় তৃতীয়ার পূজার সেরা শুভ মুহূর্ত হলো সকাল ১০:৪৯ থেকে দুপুর ১২:৩৪ মিনিট পর্যন্ত। তবে এই দিন সারাদিনই শুভ, তাই পঞ্জিকা দেখার বাধ্যবাধকতা নেই।
না, সোনা কেনা বাধ্যতামূলক নয়। শাস্ত্র মতে, এই দিনে দান, পূজা ও শুভ কাজের সূচনাই মূল বিষয়। সামর্থ্য না থাকলে বাসন, গাছ বা পোশাক কেনাও সমান শুভ।
হ্যাঁ, একই উৎসব। “আখা তীজ” হলো হিন্দি ও রাজস্থানি ভাষায় অক্ষয় তৃতীয়ার পরিচিত নাম। সংস্কৃতে “অক্ষয় তৃতীয়া” এবং হিন্দিতে “আখা তীজ” — দুটো নামেই একই উৎসব বোঝায়।
হ্যাঁ, অক্ষয় তৃতীয়াকে বিবাহের জন্য বছরের সেরা তিথিগুলোর একটি মনে করা হয়। এই দিনে পঞ্জিকা দেখে আলাদা মুহূর্ত বের করতে হয় না — সারাদিনই বিবাহের জন্য শুভ।
বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখে পালিত হয়, আর অক্ষয় তৃতীয়া আসে বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে — অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের কয়েকদিন পরেই। ২০২৬ সালে পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) এর পাঁচ দিন পরেই অক্ষয় তৃতীয়া (১৯ এপ্রিল) পড়েছে।
অক্ষয় তৃতীয়ায় উপবাস বাধ্যতামূলক নয়। তবে অনেকে এই দিনে নিরামিষ আহার করেন এবং দিনের একটি অংশ উপবাস রেখে পূজার পর প্রসাদ গ্রহণ করেন। উপবাস রাখলে পুণ্য বাড়ে, কিন্তু না রাখলে পূজার ফল কমে না।
আগামী বছরগুলোতে অক্ষয় তৃতীয়ার তারিখ
| বছর | তারিখ | বার |
|---|---|---|
| ২০২৬ | ১৯ এপ্রিল | রবিবার |
| ২০২৭ | ৮ মে | শনিবার (আনুমানিক) |
| ২০২৮ | ২৬ এপ্রিল | বৃহস্পতিবার (আনুমানিক) |
(২০২৭ ও ২০২৮ সালের তারিখ চাঁদের গতি-অনুযায়ী সামান্য পরিবর্তন হতে পারে)
শেষকথা
অক্ষয় তৃতীয়া শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয় এটি একটি বিশ্বাস, একটি নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য এই দিনটি পরিবার, প্রার্থনা ও পুণ্যের একটি সুন্দর মিলনস্থল।
২০২৬ সালে ১৯ এপ্রিল, রবিবার এই বিশেষ দিনে মালব্য রাজযোগ ও গজকেশরী যোগের শুভ সমন্বয়ে আপনার পূজা, দান ও শুভকর্ম আরও বেশি ফলপ্রসূ হোক এই কামনাই রইল।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- Asianet News Bangla — ধর্ম বিভাগ (এপ্রিল ২০২৬)
- DrikPanchang Bengali Calendar 2026
- Wikipedia বাংলা — অক্ষয় তৃতীয়া
- বৈদিক পঞ্জিকা ও শাস্ত্রীয় বিধান
এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক ও বৈদিক পঞ্জিকা অনুযায়ী যাচাইকৃত। কোনো ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য আপনার স্থানীয় পুরোহিত বা পঞ্জিকাবিদের সাথে যোগাযোগ করুন।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

