ইরানের ‘মিসাইল সিটি’ বা কেশম দ্বীপ কী?
হরমুজ প্রণালীর ঠিক প্রবেশমুখে অবস্থিত কেশম দ্বীপ (Qeshm Island) হলো ইরানের একটি বিশাল দ্বীপ, যার মাটির নিচে ইরান একটি ভয়ঙ্কর ও গোপন সামরিক ঘাঁটি বা ‘মিসাইল সিটি’ তৈরি করেছে। ১৪৪৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপের ভূগর্ভস্থ মাইলের পর মাইল সুরঙ্গে লুকিয়ে রাখা আছে অত্যাধুনিক মিসাইল ব্যাটারি এবং ফাস্ট-অ্যাটাক স্পিডবোট। কৌশলগত এই দ্বীপটি ব্যবহার করে ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের জন্য এক বিশাল মাথাব্যথার কারণ।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত। বর্তমানে এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালীর বুকে থাকা একটি ছোট্ট কিন্তু ভয়ংকর দ্বীপ, যার নাম কেশম। চলুন জেনে নিই এই দ্বীপটির অজানা রহস্য এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি তথা বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়ছে।
📍 কেশম দ্বীপ (Qeshm Island)
দূর থেকে দেখলে মনে হবে সমুদ্রের বুকে কেউ যেন একটি বিশাল পাথরের ছিপি আটকে দিয়েছে। বন্দর আব্বাস থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দক্ষিণের এই দ্বীপটির অবস্থান ক্লারেন্স প্রণালীর ঠিক উপরে।
- জনসংখ্যা ও সংস্কৃতি: এই দ্বীপে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ বসবাস করেন, যাদের বেশিরভাগই সুন্নি মুসলিম এবং তারা স্থানীয় ‘বন্দরী’ ভাষায় কথা বলেন।
- নওরোজ সায়াদী: সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল এই মানুষগুলো প্রতিবছর ‘নওরোজ সায়াদী’ বা জেলেদের নববর্ষ পালন করেন। এই দিন তারা সাগরে জাল ফেলেন না, বরং সমুদ্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
🚀 কেন কেশম দ্বীপকে ‘অজেয় রণতরী’ বলা হচ্ছে?
সামরিক বিশ্লেষকরা কেশম দ্বীপকে “ডুববে না এমন এক বিমানবাহী রণতরী” (Unsinkable Aircraft Carrier) হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- ভূগর্ভস্থ মিসাইল নেটওয়ার্ক: এই দ্বীপের মাটির নিচে মাইলের পর মাইল সুরঙ্গ বা টানেল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইটগুলোও ঠিকমতো ধরতে পারে না যে এর ভেতরে ঠিক কত অস্ত্র মজুত আছে।
- হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: লেবাননের কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান জওনির মতে, এই ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মূল উদ্দেশ্যই হলো হরমুজ প্রণালীর টুঁটি চেপে ধরা।
- বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা: ইরান যখনই এই পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোতে হামলার হুমকি দেয়, তখন পুরো প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহকে স্তব্ধ করে দেয়।
⚔️ সাম্প্রতিক সংঘাত: অপারেশন এপিক ফিউরি
যুদ্ধ শুরু হলে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে থমকে যায়, কেশম তার এক করুণ উদাহরণ।
- মার্কিন হামলা: ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় (৭ই মার্চ) মার্কিন যুদ্ধবিমান দ্বীপটির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি শোধনাগারে আঘাত হানে। এর ফলে চোখের পলকে ৩০টি গ্রামের মিঠা পানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
- ইরানের প্রতিশোধ: ইরান সন্দেহ করে যে এই হামলা পার্শ্ববর্তী কোনো উপসাগরীয় দেশ থেকে চালানো হয়েছে। এর কড়া জবাব হিসেবে ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বাহরাইনের জুফায়ের মার্কিন ঘাঁটিতে ভয়ংকর পাল্টা হামলা চালায়।
🏛️ কেশমের ঐতিহাসিক পটভূমি
কেশম দ্বীপের এই কৌশলগত গুরুত্ব মোটেও নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের পাতায় এর বহু নাম ও দখলদারিত্বের প্রমাণ মেলে:
- প্রাচীন নাম: আরবরা একে ডাকতো ‘জাজিরা আল তাউইলা’, প্রাচীন গ্রিকরা বলতো ‘ওয়ারাক্কাটা’ এবং নবম শতাব্দীতে ইসলামিক ভূগোলবিদরা একে ‘আবরকাওয়ান’ নামে চিনতেন।
- লুটপাট ও দখল: ১৫৫২ সালে অটোমান সেনাপতি পিরি রেইস এখানে ভয়াবহ লুটপাট চালান। ১৬২১ সালে পর্তুগিজরা পাথরের দুর্গ বানালেও পরের বছরই পারস্য ও ইংরেজদের যৌথ বাহিনী তাদের তাড়িয়ে দেয়।
- ব্রিটিশ ঘাঁটি: ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা এখানে নৌঘাঁটি বানিয়েছিল, যা ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।
🏜️ ইউনেস্কো জিওপার্ক থেকে আজকের রণক্ষেত্র
যুদ্ধ আর সংঘাতের বাইরেও কেশম দ্বীপের এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ রয়েছে। ২০০৬ সালে এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম ইউনেস্কো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জিওপার্ক হওয়ার সম্মান লাভ করে। এখানকার প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
- ভ্যালি অফ স্টারস (Valley of Stars): হাজার হাজার বছরের বায়ু ও জলের ক্ষয়ে তৈরি হওয়া এই উপত্যকা দেখলে মনে হবে ভিন গ্রহের কোনো জায়গা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, আকাশ থেকে তারা খসে পড়ে এই জায়গা তৈরি হয়েছিল।
- নামাকদান সল্ট কেভ: এটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ লবণের গুহা, যার ভেতরের স্ফটিকগুলো কোটি কোটি বছরের পুরনো।
- হারা ম্যানগ্রোভ বন: পরিযায়ী পাখিদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
কিন্তু আজ এই সুন্দর প্রাকৃতিক উপাসনালয়গুলো কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে এবং পর্যটকদের বদলে সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর টহল চলছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী হলো পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানের একটি সরু জলপথ। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
২. কেশম দ্বীপের ‘ভ্যালি অফ স্টারস’ কীভাবে তৈরি হয়েছে?
স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী তারা খসে পড়ে এটি তৈরি হলেও, ভূতাত্ত্বিকদের মতে হাজার হাজার বছর ধরে প্রবল বাতাস এবং বৃষ্টির কারণে মাটির ক্ষয় হয়ে এই অদ্ভুত সুন্দর উপত্যকার সৃষ্টি হয়েছে।
৩. অপারেশন এপিক ফিউরি কী?
এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান, যার অংশ হিসেবে কেশম দ্বীপের পানি শোধনাগারে হামলা চালানো হয়েছিল, যা ওই এলাকার মানুষের মিঠা পানির সংকট তৈরি করে।
৪. কেশম দ্বীপের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
ঐতিহাসিকভাবে বহু পরাশক্তি এটি দখলের চেষ্টা করলেও বর্তমানে কেশম দ্বীপ সম্পূর্ণভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এটি তাদের অন্যতম প্রধান নৌঘাঁটি।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

