পরবর্তী ব্লাড মুন বা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হবে ৩ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী, এই মহাজাগতিক ঘটনাটি বিকাল ৫:০৪ মিনিট থেকে শুরু হবে। যদিও বাংলাদেশ থেকে পূর্ণ গ্রহণটি সরাসরি দেখা যাবে না (কারণ তখন চাঁদ দিগন্তের নিচে থাকবে), তবে সূর্যাস্তের পরপরই সন্ধ্যা ৬টার দিকে উদীয়মান চাঁদে গ্রহণের শেষ অংশের লালচে বা তামাটে আভা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আকাশের দিকে তাকালে হঠাৎ চাঁদ রক্তের মতো লাল হয়ে যায় এই দৃশ্য দেখে অনেকেই অবাক হন, অনেকে আবার ভয়ও পান। কিন্তু এর পেছনে কোনো অলৌকিক বা অশুভ কারণ নেই, আছে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ (Total Lunar Eclipse), আর সাধারণ মানুষের কাছে এটিই ‘ব্লাড মুন’ (Blood Moon) বা রক্ত চাঁদ।
ব্লাড মুন কি? (What is Blood Moon)
‘ব্লাড মুন’ শব্দটি কোনো আলাদা বা নতুন মহাজাগতিক ঘটনা নয়। এটি আসলে একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের (Total Lunar Eclipse) সময় চাঁদের একটি বিশেষ রূপ। যখন পৃথিবী, সূর্য এবং চাঁদ মহাকাশে ঠিক এক সরলরেখায় এসে পড়ে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গাঢ় ছায়া (Umbra) চাঁদকে পুরোপুরি ঢেকে দেয়, তখন চাঁদ কালো না হয়ে রক্তের মতো গাঢ় লাল বা কমলা-তামাটে রঙ ধারণ করে। এই অবস্থাকেই বলা হয় ব্লাড মুন বা রক্ত চাঁদ।
যদিও ‘ব্লাড মুন’ কোনো বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় এবং এমনকি NASA-ও তাদের বর্ণনায় এই শব্দটি ব্যবহার করে।
Lunar Eclipse কেন হয়? চন্দ্রগ্রহণের কারণ
চন্দ্রগ্রহণ বোঝার জন্য আপনাকে তিনটি মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান বুঝতে হবে — সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ।
চন্দ্রগ্রহণ হওয়ার ধাপগুলো:
- চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।
- চন্দ্রগ্রহণ শুধুমাত্র পূর্ণিমার (Full Moon) রাতেই হতে পারে, যখন চাঁদ পৃথিবীর ঠিক বিপরীত দিকে থাকে।
- যখন সূর্য এবং চাঁদের মাঝখানে পৃথিবী চলে আসে এবং তিনটি বস্তু একই সরলরেখায় অবস্থান করে, তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে।
- পৃথিবীর ছায়ার দুটি অংশ থাকে। অভ্যন্তরীণ গাঢ় ছায়া বা Umbra এবং বাইরের হালকা ছায়া বা Penumbra।
- যখন চাঁদ Umbra-র মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে যায়, তখন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হয় এবং ব্লাড মুন দেখা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের সাথে ৫ ডিগ্রি কোণে হেলানো থাকার কারণে প্রতি পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণ হয় না।
চাঁদ লাল হওয়ার কারণ কি?
গ্রহণের সময় চাঁদ কালো না হয়ে লাল কেন হয়? এটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন। এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।
আমরা জানি, সূর্যের সাদা আলো আসলে সাতটি রঙের মিশ্রণ। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের এই আলোকে ফিল্টার করে। বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণাগুলো সূর্যের নীল আলো বেশি ছড়িয়ে দেয় (এই কারণেই দিনের বেলায় আকাশ নীল দেখায়)। কিন্তু লাল ও কমলা আলো কম বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সামনে এগিয়ে যায়।
চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের চারপাশ দিয়ে বেঁকে যাওয়া এই লাল-কমলা আলোই চাঁদে পৌঁছায় এবং চাঁদ রক্তের মতো লাল দেখায়। এই বৈজ্ঞানিক ঘটনাটিকে বলা হয় Rayleigh Scattering।
🔬 সহজ উদাহরণ: সূর্যাস্তের সময় আকাশ যেভাবে লাল-কমলা হয়, ঠিক সেই একই কারণে ব্লাড মুনের সময় চাঁদ লাল হয়। পার্থক্য হলো, সূর্যাস্তে সূর্যের আলো সরাসরি আমাদের চোখে আসে, আর ব্লাড মুনে সেই ফিল্টার হওয়া আলো চাঁদে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে।
সুপার ব্লাড মুন কেন হয়?
সুপার ব্লাড মুন হলো দুটি বিরল মহাজাগতিক ঘটনার মিলন —
- সুপার মুন (Supermoon): যখন চাঁদ তার কক্ষপথে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে (Perigee) থাকে, তখন চাঁদকে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৪% বড় এবং ৩০% উজ্জ্বল দেখায়।
- ব্লাড মুন (Blood Moon): পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ লাল হয়।
যখন এই দুটো একসাথে ঘটে অর্থাৎ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবীর খুব কাছে থাকে তখন তাকে বলা হয় সুপার ব্লাড মুন। ৩ মার্চ ২০২৬-এর গ্রহণটি একটি সাধারণ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ, সুপার ব্লাড মুন নয়।
ব্লাড মুন কত বছর পরপর হয়?
অনেকেই জিজ্ঞেস করেন ব্লাড মুন কত বছর পরপর হয়। ব্লাড মুন কোনো নির্দিষ্ট বছর পরপর হয় না। এটি নির্ভর করে সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদের অবস্থানের ওপর। সাধারণভাবে, পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বা ব্লাড মুন প্রতি দুই থেকে তিন বছরে একবার হয়। তবে কখনো কখনো একই বছরে দুটো পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণও হতে পারে।
আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের তালিকা:
- ৩ মার্চ ২০২৬ — পরবর্তী ব্লাড মুন
- ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮ — এরপরের পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ
ব্লাড মুন ২০২৬ — বাংলাদেশের সময়সূচি
পরবর্তী ব্লাড মুন হবে ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে। বাংলাদেশ সময় (BST, UTC+6) অনুযায়ী এর বিস্তারিত সময়সূচি নিচে দেওয়া হলো:
| গ্রহণের ধাপ | বাংলাদেশ সময় (BST) |
| Penumbral শুরু (প্রথম হালকা ছায়া) | দুপুর ২:৪৪ |
| আংশিক গ্রহণ শুরু (Partial শুরু) | বিকাল ৩:৫০ |
| পূর্ণ গ্রহণ শুরু (Totality শুরু) | বিকাল ৫:০৪ |
| সর্বোচ্চ গ্রহণ (Greatest Eclipse) | বিকাল ৫:৩৩ |
| পূর্ণ গ্রহণ শেষ (Totality শেষ) | সন্ধ্যা ৬:০৩ |
| আংশিক গ্রহণ শেষ | সন্ধ্যা ৭:১৩ |
| Penumbral শেষ (সম্পূর্ণ শেষ) | রাত ৮:১৮ |
বাংলাদেশ থেকে কি ব্লাড মুন ২০২৬ দেখা যাবে?
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর একটু জটিল। সরাসরি বলতে গেলে, ঢাকা বা বাংলাদেশের অন্য কোনো স্থান থেকে ৩ মার্চ ২০২৬-এর পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সরাসরি সম্পূর্ণরূপে দেখা যাবে না।
কারণ, পূর্ণ গ্রহণ যখন শুরু হয় (বিকাল ৫:০৪) এবং সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকে (বিকাল ৫:৩৩), তখন বাংলাদেশে দিনের বেলা থাকে এবং চাঁদ দিগন্তের নিচে থাকে।
তবে, সূর্যাস্তের পর ঢাকার আকাশে চাঁদ উদয় হওয়ার সময় পূর্ণ গ্রহণের শেষ পর্যায় এবং আংশিক গ্রহণের শেষ অংশ দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, আকাশ পরিষ্কার থাকলে বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৫:৩০-এর পর থেকে পূর্ব দিগন্তে চাঁদ উঠলেই তা কিছুটা লালচে বা তামাটে দেখাতে পারে। পূর্ণ গ্রহণের সমাপ্তি (সন্ধ্যা ৬:০৩) এবং এরপরের আংশিক গ্রহণের সমাপ্তি পর্যায় বাংলাদেশে দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ব্লাড মুন বা রক্ত চাঁদ দেখার সেরা উপায়
এই মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করার জন্য আপনার কোনো বিশেষ সরঞ্জাম লাগবে না। আপনি খালি চোখেই এটি নিরাপদে দেখতে পারবেন।
প্রস্তুতি নিন এভাবে:
- তারিখ ও সময়: ৩ মার্চ ২০২৬, বিকাল ৫:৩০ থেকে পূর্ব দিগন্তে নজর রাখুন।
- খোলা জায়গা: বাড়ির ছাদ, খোলা মাঠ বা নদীর তীর থেকে দেখলে ভালো দৃশ্য পাওয়া যাবে।
- দিক: চাঁদ পূর্ব দিগন্তে উঠবে।
- ফটোগ্রাফি: স্মার্টফোন বা ক্যামেরায় ট্রাইপড ব্যবহার করলে ভালো ছবি পাবেন। ম্যানুয়াল মোডে ISO কমিয়ে শাটার স্পিড একটু বাড়ান।
Blood Moon-এর রহস্য
ইতিহাস জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মে ব্লাড মুন নিয়ে নানা বিশ্বাস প্রচলিত আছে। বৈজ্ঞানিকভাবে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি না থাকলেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এগুলো জানা থাকা আকর্ষণীয়।
- ইনকা সভ্যতা: তারা বিশ্বাস করত একটি জাগুয়ার চাঁদকে আক্রমণ করছে। গ্রহণ শেষ হলে মনে করত যোদ্ধারা জাগুয়ারকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
- মেসোপটেমিয়া: প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা মনে করত চন্দ্রগ্রহণ রাজার জন্য খারাপ লক্ষণ।
- ইসলাম: ইসলামে চন্দ্রগ্রহণের সময় বিশেষ নামাজ পড়ার বিধান আছে (সালাতুল কুসুফ), যা আল্লাহর কুদরত স্মরণ করার সুযোগ। তবে এটিকে অশুভ লক্ষণ মনে করার কোনো ইসলামিক ভিত্তি নেই।
❓ প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ব্লাড মুন কি ক্ষতিকর?
না, ব্লাড মুন মানুষের জন্য কোনোভাবেই ক্ষতিকর নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জ্যোতির্বিজ্ঞানিক ঘটনা। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের আলো দেখলে চোখের কোনো ক্ষতি হয় না। সূর্যগ্রহণের মতো বিশেষ চশমার প্রয়োজন নেই।
পরবর্তী সম্পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বা রক্ত চাঁদ কবে?
৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ (ব্লাড মুন) হবে। এরপর ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবার একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে।
চাঁদ গ্রহণ ২০২৬ বাংলাদেশে কখন দেখা যাবে?
বাংলাদেশ সময় ৩ মার্চ ২০২৬, বিকাল ৫:৩৩ নাগাদ সর্বোচ্চ গ্রহণ হবে। সেদিন সন্ধ্যায় চাঁদ উঠলে গ্রহণের শেষ পর্যায় এবং লালচে রঙ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। পূর্ণ গ্রহণ সম্পূর্ণভাবে দেখার জন্য বাংলাদেশের অবস্থান আদর্শ নয়, তবে আংশিক গ্রহণের একটি অংশ অবশ্যই দেখতে পারবেন।
তথ্যসূত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা (Sources):
- NASA — Solar System Exploration
- TimeAndDate.com
- TheSkyLive.com
- BBC Sky at Night Magazine
দ্রষ্টব্য: আর্টিকেলের সকল সময়সূচি UTC+6 (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টাইম) অনুযায়ী। আবহাওয়ার কারণে দৃশ্যমানতা পরিবর্তন হতে পারে। আবহাওয়ার কারণে দৃশ্যমানতা পরিবর্তন হতে পারে।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

