বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার: কেন এটি আকাশের বিস্ময় এবং বিমান ভ্রমণে সেরা?

বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার কেন এটি আকাশের বিস্ময় এবং বিমান ভ্রমণে সেরা

বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার (Boeing 787 Dreamliner) বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক এবং যাত্রীবান্ধব বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এক কথায় এর বিশেষত্ব হলো এর তৈরি কাঠামো এবং প্রযুক্তি। এটিই প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান যার মূল কাঠামোর ৫০% কম্পোজিট বা কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি, যা একে হালকা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী করে তুলেছে। এছাড়া এর বড় জানালা, ইলেকট্রনিক ডিমিং এবং কেবিনের আরামদায়ক প্রেশার যাত্রীদের ভ্রমণ ক্লান্তি (Jet Lag) কমাতে সাহায্য করে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর বহরে এই বিমান যুক্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশি যাত্রীদের কাছে ড্রিমলাইনার একটি গর্বের নাম। চলুন বিস্তারিত জেনে নিই, কেন এই বিমানটি অন্য সবার চেয়ে আলাদা।

বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এর বিশেষত্ব কি?

বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারকে বলা হয় “গেম চেঞ্জার”। এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে যা একে অন্যান্য বিমান থেকে আলাদা করে:

১. কার্বন ফাইবার বা কম্পোজিট বডি

সাধারণত বিমানের বডি অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু ড্রিমলাইনারের বডির প্রায় ৫০ শতাংশই কার্বন ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার (Carbon Fiber Reinforced Polymer) দিয়ে তৈরি। এটি অ্যালুমিনিয়ামের চেয়ে শক্ত কিন্তু ওজনে অনেক হালকা। হালকা হওয়ার কারণে এটি কম জ্বালানিতে বেশি দূর পথ পাড়ি দিতে পারে।

২. বড় জানালা ও স্মার্ট গ্লাস

ড্রিমলাইনারের জানালাগুলো সাধারণ বিমানের চেয়ে প্রায় ৩০% বড়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এতে কোনো প্লাস্টিকের শেড বা ঢাকনা নেই। এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে Electrochromic (Smart Glass) প্রযুক্তি। যাত্রী বোতাম টিপে জানালার কাঁচের রঙ পরিবর্তন করে আলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

৩. জেট ল্যাগ বা ভ্রমণ ক্লান্তি হ্রাস

ড্রিমলাইনারের কেবিন প্রেশার বা বায়ুর চাপ ৬,০০০ ফুট উচ্চতার সমান রাখা হয় (যেখানে অন্যান্য বিমানে ৮,০০০ ফুট ধরা হয়)। এর ফলে শরীরে অক্সিজেনের শোষণ ভালো হয় এবং যাত্রীদের মাথাব্যথা বা ক্লান্তি কম অনুভূত হয়। এছাড়া এর কেবিনে আর্দ্রতার (Humidity) পরিমাণ বেশি থাকে, যা গলা ও চোখ শুকিয়ে যাওয়া রোধ করে।

৪. জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব

উন্নত অ্যারোডাইনামিক্স এবং রোলস-রয়েস বা জিই (GE) এর আধুনিক ইঞ্জিনের কারণে এটি সমমানের অন্যান্য বিমানের চেয়ে ২০-২৫% কম জ্বালানি খরচ করে। এটি পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর।

বোয়িং ৭৭৭ কি ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের চেয়ে বড়?

অনেকের মনেই এই প্রশ্নটি থাকে। সহজ উত্তর হলো— হ্যাঁ, বোয়িং ৭৭৭ (Boeing 777) সাধারণত ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের চেয়ে আকারে বড় এবং বেশি যাত্রী বহন করতে পারে।

একটি তুলনামূলক চার্ট দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে:

বৈশিষ্ট্যবোয়িং ৭৮৭ (Dreamliner)বোয়িং ৭৭৭ (Triple Seven)
আয়তনমাঝারি থেকে বড় (Mid-size wide-body)বড় (Large wide-body)
দৈর্ঘ্য১৮৬ – ২২৪ ফুট (ভ্যারিয়েন্ট ভেদে)২০৯ – ২৪২ ফুট (ভ্যারিয়েন্ট ভেদে)
সিট ক্যাপাসিটি২৪০ – ৩৩০ জন (গড়)৩৫০ – ৪৫০+ জন (গড়)
রেঞ্জদীর্ঘ পাল্লা (Long Haul)দীর্ঘ পাল্লা (Long Haul)
ফিউজলেজসরু (তুলনামূলক)প্রশস্ত

বোয়িং ৭৭৭ হলো “হাই ক্যাপাসিটি” রুটের জন্য, আর ৭৮৭ হলো “পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট” কানেক্টিভিটির জন্য যেখানে মাঝারি সংখ্যক যাত্রী নিয়ে অনেক দূরে যাওয়া যায়।

৭৮৭ ড্রিমলাইনারে কতগুলো সিট থাকে?

ড্রিমলাইনারের সিট সংখ্যা নির্ভর করে এর মডেল (ভ্যারিয়েন্ট) এবং এয়ারলাইন্স কিভাবে সিট সাজাচ্ছে (Configuration) তার ওপর। তবে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে:

  • 787-8: প্রায় ২৪২ জন যাত্রী (দুই ক্লাসে)
  • 787-9: প্রায় ২৯০ জন যাত্রী (দুই ক্লাসে)
  • 787-10: প্রায় ৩৩০ জন যাত্রী (দুই ক্লাসে)

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স)

আমাদের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর বহরে ড্রিমলাইনারের দুইটি ভ্যারিয়েন্ট রয়েছে। তাদের সিট বিন্যাস নিম্নরূপ:

  1. বোয়িং ৭৮৭-৮ (আকাশবীণা, হংসবলাকা, গাঙচিল, রাজহংস): মোট সিট ২৭১টি (২৪টি বিজনেস ক্লাস + ২৪৭টি ইকোনমি ক্লাস)।
  2. বোয়িং ৭৮৭-৯ (সোনার তরী, অচিন পাখি): মোট সিট ২৯৮টি (৩০টি বিজনেস ক্লাস + ২৬৮টি ইকোনমি ক্লাস)।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ড্রিমলাইনারের ডানাগুলো বাঁকানো কেন?

উত্তর: ড্রিমলাইনারের ডানাগুলো অত্যন্ত নমনীয় (Flexible)। ওড়ার সময় এগুলো ওপরের দিকে অনেকটা ধনুকের মতো বেঁকে যায়। একে বলা হয় Raked Wingtips। এটি বাতাসের বাধা (Drag) কমায় এবং জ্বালানি সাশ্রয় করতে সাহায্য করে।

২. ৭৮৭ ড্রিমলাইনার কি নিরাপদ?

উত্তর: অবশ্যই। বোয়িং ৭৮৭ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিমান হিসেবে স্বীকৃত। এর উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম এবং আধুনিক প্রযুক্তি পাইলটদের জন্য বিমান চালানো সহজ ও নিরাপদ করেছে।

৩. ঢাকা থেকে কোন রুটে ড্রিমলাইনার চলে?

উত্তর: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তাদের ড্রিমলাইনারগুলো দিয়ে সাধারণত লন্ডন, ম্যানচেস্টার, টরন্টো, জেদ্দা এবং মদিনার মতো দীর্ঘ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। এছাড়াও মাঝে মাঝে সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুর রুটেও এটি দেখা যায়।

৪. ড্রিমলাইনারের ইঞ্জিনের পেছনের খাঁজকাটা অংশটি কী?

উত্তর: ইঞ্জিনের পেছনের এই খাঁজকাটা ডিজাইনকে বলা হয় Chevrons। এটি ইঞ্জিনের শব্দ কমাতে সাহায্য করে, যার ফলে কেবিনের ভেতর এবং বাইরের পরিবেশ শান্ত থাকে।

পরিশেষে

বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার শুধুমাত্র একটি বিমান নয়, এটি এভিয়েশন প্রযুক্তির একটি মাস্টারপিস। আপনি যদি দীর্ঘ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন এবং আপনার রুটে যদি ড্রিমলাইনার থাকে, তবে নিঃসন্দেহে এটি আপনার যাত্রাকে আরও আরামদায়ক করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্র্যান্ড নিউ ড্রিমলাইনারগুলো এক নতুন অভিজ্ঞতার দ্বার উন্মোচন করেছে।

Leave a Comment

Scroll to Top