রোজা রাখার বয়স কত? ছেলে ও মেয়েদের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিধান

রমজান মাস এলেই অভিভাবক হিসেবে আমাদের মনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে সন্তানদের ঠিক কত বছর বয়স থেকে রোজা রাখা বাধ্যতামূলক? বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাবা-মায়েরা সন্তানদের শারীরিক সক্ষমতা ও ধর্মীয় আইন বা বিধান নিয়ে চিন্তিত থাকেন।

আপনি যদি জানতে চান রোজা রাখার বয়স কত এবং কখন থেকে এটি ফরজ হয়, তবে এই আর্টিকেলটি আপনাকে একটি পরিষ্কার ধারণা দেবে। চলুন, ইসলামি শরীয়তের নির্ভরযোগ্য ফিকহ ও আইন অনুযায়ী সঠিক তথ্যগুলো জেনে নিই।

রোজা রাখার বয়স কত?

ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, ছেলে ও মেয়েদের ওপর রোজা ফরজ হয় মূলত তারা প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ/বালেগা) হওয়ার পর। বয়সের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা এর একমাত্র মাপকাঠি নয়, বরং শারীরিক পরিবর্তনই এর মূল ভিত্তি। তবে সাধারণত:

  • মেয়েদের কত বছর বয়সে রোজা ফরজ হয়: ৯ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে (ঋতুস্রাব বা অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ প্রকাশের পর)।
  • ছেলেদের কত বছর বয়সে রোজা ফরজ হয়: ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে (স্বপ্নদোষ বা অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ প্রকাশের পর)।
  • সন্তানকে কত বছর বয়সে রোজা রাখার নির্দেশ দিতে হয়: ৭ বছর বয়সে।
  • কত বছর বয়সে রোজা না রাখলে মৃদু প্রহার করা যায়: সন্তানের বয়স ১০ বছর হলে (শারীরিকভাবে সক্ষম হওয়ার শর্তে)।
  • কত হিজরী কোন মাসে রোজা ফরজ হয়: ২য় হিজরির শাবান মাসে।

কত বছর বয়স থেকে রোজা ফরজ হয়?

ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি হলো রোজা বা সিয়াম। তবে শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর শরীয়তের কোনো বিধান বা আইন বাধ্যতামূলক (ফরজ) নয়। রোজা ফরজ হওয়ার প্রধান ও প্রথম শর্ত হলো ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বা বালেগ হওয়া। ছেলে ও মেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার লক্ষণ ও সময়সীমা ভিন্ন।

ছেলেদের কত বছর বয়সে রোজা ফরজ হয়?

ছেলেদের ক্ষেত্রে রোজা ফরজ হওয়ার মূল শর্ত হলো শারীরিক পূর্ণতা লাভ করা।

See also  ChatGPT নাকি Perplexity AI: Which is Better

১. লক্ষণ: যখন কোনো ছেলের প্রথম স্বপ্নদোষ হয় বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অন্যান্য প্রাকৃত শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ পায়, তখন থেকেই তার ওপর নামাজ ও রোজা ফরজ হয়ে যায়।

২. সাধারণ বয়সসীমা: বাংলাদেশের আবহাওয়া ও শারীরিক গঠন অনুযায়ী সাধারণত ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে ছেলেরা বালেগ হয়।

৩. সর্বোচ্চ বয়স: যদি ১৫ বছর বয়স (চন্দ্র মাস বা হিজরি বর্ষ অনুযায়ী) পূর্ণ হওয়ার পরও কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তবে ইসলামি আইন (ফিকহ) অনুযায়ী ১৫ বছর পূর্ণ হলেই তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হবে। তখন থেকেই তার ওপর রোজা রাখা বাধ্যতামূলক।

মেয়েদের কত বছর বয়সে রোজা ফরজ হয়?

মেয়েদের ক্ষেত্রেও শারীরিক পরিবর্তনই রোজা ফরজ হওয়ার প্রধান নির্দেশক।

১. লক্ষণ: যখন কোনো মেয়ের প্রথম মাসিক বা ঋতুস্রাব (হায়েজ) শুরু হয়, তখন থেকেই সে ইসলামি আইনে ‘বালেগা’ হিসেবে গণ্য হয়। এই সময় থেকেই তার ওপর রোজা ফরজ।

২. সাধারণ বয়সসীমা: সাধারণত ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্কা হয়ে থাকে।

৩. সর্বোচ্চ বয়স: মেয়েদের ক্ষেত্রেও যদি ১৫ বছর (হিজরি বর্ষ অনুযায়ী) পূর্ণ হওয়ার পরও কোনো শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তবে ১৫ বছর বয়স থেকেই তাকে প্রাপ্তবয়স্কা ধরা হবে।

সন্তানদের রোজা রাখার প্রশিক্ষণ ও নিয়ম-কানুন

বাঙালি সমাজে অনেক অভিভাবক স্নেহের বশবর্তী হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও সন্তানদের রোজা রাখতে দেন না, যা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী। আবার অনেকে অতি উৎসাহে একদম ছোট বাচ্চাদের রোজা রাখতে বাধ্য করেন, যা স্বাস্থ্যকর নয়। এ বিষয়ে ইসলামের একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ম রয়েছে।

সন্তানকে কত বছর বয়সে রোজা রাখার নির্দেশ দিতে হয়?

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দাও…” (আবু দাউদ: ৪৯৫)

See also  AI.com ডোমেইন বিক্রি হলো ৭০ মিলিয়ন ডলারে

ইসলামি আইনজ্ঞ ও স্কলারগণ এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে (কিয়াস করে) বলেছেন, সন্তান যখন ৭ বছর বয়সে পৌঁছাবে, তখন তাদের নামাজের পাশাপাশি রোজা রাখার জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। এই বয়সে রোজা ফরজ নয়, তবে তাদের রোজা রাখতে উৎসাহিত করতে হবে যাতে তারা অভ্যস্ত হতে পারে।

কত বছর বয়সে রোজা না রাখলে মৃদু প্রহার করা যায়?

নামাজ সম্পর্কিত উল্লিখিত হাদিসের শেষাংশে বলা হয়েছে, “আর যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়, তখন (নামাজ না পড়লে) তাদের প্রহার করো…”

এই বিধিমালার আলোকে ফিকহবিদগণ বলেন, সন্তানের বয়স যখন ১০ বছর হবে, তখন তাকে রোজা রাখার জন্য কঠোরভাবে তাগিদ দিতে হবে। যদি সন্তান শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল হয়, তবে রোজা না রাখলে শাসনস্বরূপ তাকে মৃদু প্রহার করা যায়। তবে এর কিছু নিয়ম রয়েছে:

  • প্রহার যেন কোনোভাবেই চেহারা বা স্পর্শকাতর অঙ্গে না হয়।
  • এটি হবে কেবলই সতর্কতামূলক, যাতে শরীরে কোনো দাগ না পড়ে বা ব্যথা না পায়।
  • সন্তান যদি শারীরিকভাবে দুর্বল হয় বা রোজা রাখলে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে কোনোভাবেই জোর করা বা মারা যাবে না।

রোজার বিধান কবে আসে?

অনেকেই রোজার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আইন জারির সময়কাল সম্পর্কে জানতে চান।

কত হিজরী কোন মাসে রোজা ফরজ হয়?

উম্মতে মোহাম্মদীর ওপর পবিত্র রমজান মাসের রোজা ফরজ হয় ২য় হিজরির শাবান মাসে। মদিনায় হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ থেকে ১৮৫ নম্বর আয়াত নাজিল করার মাধ্যমে মুমিনদের ওপর মাসব্যাপী রোজা পালন করাকে একটি অবশ্য পালনীয় আইন বা ফরজ হিসেবে নির্ধারণ করেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১৫ বছরের আগে লক্ষণ প্রকাশ না পেলে কি রোজা রাখতে হবে?

না, ১৫ বছর বয়সের আগে যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কোনো শারীরিক লক্ষণ (যেমন: মাসিক বা স্বপ্নদোষ) প্রকাশ না পায়, তবে রোজা ফরজ বা বাধ্যতামূলক নয়। তবে ১০ বছর বয়স থেকে শারীরিক সক্ষমতা থাকলে অভ্যাসের জন্য রোজা রাখা উচিত।

See also  কি কি কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না

শারীরিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ বালেগ সন্তানের কি রোজা মাফ আছে?

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর রোজা ফরজ। তবে সন্তান যদি এমন অসুস্থ হয় যে রোজা রাখলে বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা আছে (যা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারা প্রমাণিত), তবে সে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত রোজা ভাঙতে পারবে। পরবর্তীতে সুস্থ হলে এই রোজাগুলোর কাজা আদায় করা বাধ্যতামূলক।

ছোট শিশুদের ‘হাফ রোজা’ রাখার নিয়ম কি ইসলামে আছে?

ইসলামি আইনে ‘অর্ধেক রোজা’ বলে কিছু নেই। রোজা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবেই রাখতে হয়। তবে ৭-৯ বছরের শিশুদের রোজার প্রতি আগ্রহ গড়ে তোলার জন্য অভিভাবকরা যদি দুপুর পর্যন্ত না খাইয়ে রেখে উৎসাহ দেন, সেটি কেবলই একটি মানসিক প্রশিক্ষণ। এটি মূল রোজা হিসেবে গণ্য হবে না।

শেষকথা

সন্তানদের সঠিক ধর্মীয় আইনের শিক্ষা দেওয়া ও নিয়ম-নীতির মধ্যে বড় করা প্রত্যেক অভিভাবকের দায়িত্ব। “রোজা রাখার বয়স কত” এই প্রশ্নের সবচেয়ে বাস্তব ও সঠিক উত্তর হলো শারীরিক পূর্ণতা লাভ করা। তাই বয়স ১৫ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, শারীরিক লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথেই সন্তানদের রোজা পালনে সচেতন করুন।

Leave a Comment