ইনডাকশন নাকি ইনফ্রারেড কুকার: আপনার জন্য কোনটি ভালো?

বাংলাদেশে বর্তমানে এলপিজি (LPG) সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি এবং লাইনের গ্যাসের সংকটের কারণে অনেকেই বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু বাজারে গিয়ে ক্রেতারা সবচেয়ে বড় যে কনফিউশনে পড়েন তা হলো ইনডাকশন কুকার (Induction Cooker) কিনবেন নাকি ইনফ্রারেড কুকার (Infrared Cooker)?

দুটো প্রযুক্তিরই আলাদা সুবিধা এবং অসুবিধা রয়েছে। আপনি যদি বিদ্যুৎ বিল, হাঁড়ি-পাতিলের ধরন এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চান, তবে এই সম্পূর্ণ এবং তথ্যভিত্তিক আর্টিকেলটি আপনার জন্য।

Which is better induction or infrared cooker? (কোনটি বেশি ভালো?)

আপনার প্রধান লক্ষ্য যদি হয় বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং দ্রুত রান্না করা, তবে নিঃসন্দেহে ইনডাকশন কুকার সেরা। কারণ এটি সরাসরি পাত্রকে গরম করে, ফলে তাপের কোনো অপচয় হয় না। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো, এতে শুধু সমান তলার ম্যাগনেটিক বা স্টিলের হাঁড়ি ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে, আপনার যদি যেকোনো ধরনের হাঁড়ি (যেমন: মাটি, অ্যালুমিনিয়াম, কাঁচ বা কাস্ট আয়রন) ব্যবহারের প্রয়োজন হয়, তবে ইনফ্রারেড কুকার আপনার জন্য ভালো বিকল্প। তবে মনে রাখবেন, ইনফ্রারেডে বিদ্যুৎ খরচ ইনডাকশনের তুলনায় কিছুটা বেশি হয়।

ইনফ্রারেড কুকার কীভাবে কাজ করে? (How infrared cooker works)

ইনফ্রারেড কুকার মূলত আধুনিক প্রযুক্তির হ্যালোজেন ল্যাম্প বা শক্তিশালী নাইক্রোম কয়েল ব্যবহার করে তাপ উৎপন্ন করে। আপনি যখন চুলাটি চালু করেন, তখন এর ভেতরের কয়েলগুলো ইনফ্রারেড রেডিয়েশন (তাপীয় রশ্মি) তৈরি করে। এই তীব্র তাপ কুকারের উপরের সিরামিক গ্লাস ভেদ করে সরাসরি পাত্রে পৌঁছায় এবং পাত্রটিকে গরম করে।

যেহেতু এটি রেডিয়েশনের মাধ্যমে সরাসরি তাপ উৎপন্ন করে উপরিভাগ গরম করে, তাই পাত্রটি লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, কাঁচ বা মাটির—যাই হোক না কেন, খুব সহজেই রান্না করা সম্ভব হয়।

বিদ্যুৎ খরচ: Induction vs Infrared Cooker Electricity Consumption

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিল একটি বড় চিন্তার বিষয়। চলুন দেখি কোনটি বেশি সাশ্রয়ী:

  • ইনডাকশন কুকার: এটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে। এর ফলে চুলা গরম না হয়ে সরাসরি পাত্রটি গরম হয়। এর থার্মাল এফিশিয়েন্সি (তাপীয় কার্যকারিতা) প্রায় ৮৫-৯০%। অর্থাৎ, উৎপন্ন তাপের প্রায় পুরোটাই রান্নার কাজে লাগে। ফলে এটি অনেক কম বিদ্যুৎ খরচ করে এবং দ্রুত রান্না শেষ করে।
  • ইনফ্রারেড কুকার: এটি আগে নিজের সিরামিক গ্লাস গরম করে, এরপর সেই তাপে পাত্র গরম হয়। এর থার্মাল এফিশিয়েন্সি প্রায় ৭০%। অর্থাৎ, চারপাশের বাতাসে কিছুটা তাপ ছড়িয়ে পড়ে ও অপচয় হয়। তাই ইনডাকশনের তুলনায় ইনফ্রারেড কুকারে বিদ্যুৎ খরচ ১০-১৫% বেশি হয় এবং রান্না হতেও সামান্য বেশি সময় লাগে।
See also  Infinix GT 50 Pro: সম্পূর্ণ রিভিউ ও দাম

সুবিধা ও অসুবিধা (Induction vs Infrared Cooker Pros and Cons)

সঠিক চুলা বেছে নিতে দুটিরই সুবিধা-অসুবিধা জানা জরুরি:

ইনডাকশন কুকারের সুবিধা-অসুবিধা

সুবিধা:

  • অত্যন্ত দ্রুত গরম হয়, ফলে রান্না তাড়াতাড়ি শেষ হয়।
  • বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী (মাসের বিদ্যুৎ বিল কম আসে)।
  • চুলা নিজে গরম হয় না, শুধু পাত্র গরম হয়। ফলে হাত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম।

অসুবিধা:

  • সব ধরনের পাত্র (অ্যালুমিনিয়াম, মাটি) ব্যবহার করা যায় না। শুধুমাত্র ম্যাগনেটিক বটম (Induction base) পাত্র লাগে।

ইনফ্রারেড কুকারের সুবিধা-অসুবিধা

সুবিধা:

  • যেকোনো ধরনের সমতল তলার পাত্র (অ্যালুমিনিয়াম, কাঁচ, সিরামিক, নন-স্টিক) ব্যবহার করা যায়।
  • সরাসরি রুটি সেঁকা বা বারবিকিউ গ্রিল করার কাজ করা যায়।

অসুবিধা:

  • বিদ্যুৎ খরচ অপেক্ষাকৃত বেশি।
  • রান্নার সময় চুলার উপরিভাগ প্রচণ্ড গরম হয়, তাই হাত লাগলে পুড়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।
  • বন্ধ করার পরও বেশ কিছুক্ষণ গ্লাস প্যানেল গরম থাকে।

ইনফ্রারেড কুকার বনাম হট প্লেট: কোনটি ভালো? (Infrared Cooker vs Hot Plate Which is Better)

অনেকেই পুরোনো কয়েলওয়ালা হট প্লেট এবং ইনফ্রারেড কুকারকে একই জিনিস মনে করেন।

  • হট প্লেট (Hot Plate): এটি মূলত একটি মেটাল প্লেট যা সরাসরি বৈদ্যুতিক কয়েলের মাধ্যমে গরম হয়। এটি গরম হতে অনেক বেশি সময় নেয়, প্রচুর বিদ্যুৎ টানে এবং এর তাপ নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন।
  • ইনফ্রারেড কুকার: এটি হট প্লেটের একটি আধুনিক এবং অত্যন্ত উন্নত সংস্করণ। এটি হট প্লেটের চেয়ে অনেক দ্রুত গরম হয়, তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ খরচ করে এবং ডিজিটাল প্যানেলের মাধ্যমে সহজে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

চূড়ান্ত রায়: হট প্লেটের চেয়ে ইনফ্রারেড কুকার সব দিক দিয়েই অনেক বেশি উন্নত, ভালো এবং নিরাপদ।

ইনফ্রারেড কুকার কি নিরাপদ? (Is infrared cooker safe / Infrared cooker side effects)

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, Is infrared induction cooker safe? হ্যাঁ, ইনফ্রারেড কুকার স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এটি যে “ইনফ্রারেড” বা অবলোহিত রশ্মি ব্যবহার করে, তা সূর্যের তাপের মতোই প্রাকৃতিক এবং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক নয়। এর রেডিয়েশন থেকে ক্যান্সার বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

See also  Men's Individual Large Hill ২০২৬: শিডিউল ও লাইভ আপডেট

সতর্কতা ও সাইড ইফেক্ট:

এর একমাত্র ঝুঁকির দিক হলো এর “উপরিভাগের অত্যধিক তাপমাত্রা”। রান্নার সময় গ্লাস প্যানেলটি ৪০০-৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম হতে পারে। তাই ভুলবশত হাত লাগলে মারাত্মকভাবে পুড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বাড়িতে ছোট বাচ্চা থাকলে এটি ব্যবহারের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক।

ইনফ্রারেড কুকার কীভাবে ব্যবহার করবেন? (How to use infrared cooker)

এটি ব্যবহার করা খুবই সহজ। সঠিক ব্যবহারের জন্য নিচের স্টেপ-বাই-স্টেপ নিয়মগুলো অনুসরণ করুন:

  1. সঠিক পাত্র বসানো: প্রথমে কুকারের সিরামিক প্লেটের ঠিক মাঝখানে একটি সমতল তলার হাঁড়ি বা কড়াই বসান।
  2. পাওয়ার সংযোগ: কুকারটি সরাসরি দেয়ালের সকেটে প্লাগ করুন (নিরাপত্তার জন্য সস্তা মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার না করাই ভালো)।
  3. চালু করা: ‘On/Off’ বোতাম চেপে চুলা চালু করুন।
  4. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: আপনার রান্নার ধরন অনুযায়ী (যেমন- Fry, Soup, Boil) মেনু সিলেক্ট করুন এবং + বা – বোতাম চেপে প্রয়োজনমতো তাপমাত্রা ঠিক করে নিন।
  5. বন্ধ করার সঠিক নিয়ম: রান্না শেষে অফ বোতাম চাপুন। তবে সাথে সাথে প্লাগ খুলবেন না। চুলার ভেতরের কুলিং ফ্যানটি চুলাকে ঠান্ডা করার জন্য কিছুক্ষণ চলতে থাকবে। ফ্যান নিজে থেকে বন্ধ হওয়ার পর মেইন সুইচ অফ করুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. গ্যাস নাকি ইলেকট্রিক কুকার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনটি সাশ্রয়ী?

উত্তর: বর্তমান বিদ্যুতের দাম হিসাব করলে, প্রিপেইড মিটারে লাইনের গ্যাস ব্যবহারের চেয়ে ইলেকট্রিক কুকারে খরচ কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে বোতলজাত এলপিজি (LPG) সিলিন্ডারের বর্তমান চড়া দামের তুলনায় ইনডাকশন কুকার ব্যবহার করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

২. আমি কি ইনফ্রারেড কুকারে প্লাস্টিক বা গলে যেতে পারে এমন কিছু রাখতে পারব?

উত্তর: একেবারেই না। ইনফ্রারেড কুকারের উপরিভাগ প্রচণ্ড গরম হয়, তাই এর ওপর বা খুব কাছাকাছি প্লাস্টিক বা গলে যায় এমন কোনো বস্তু রাখা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

See also  নগদ একাউন্ট খোলার নিয়ম ২০২৫

৩. ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকারের দাম কেমন?

উত্তর: সাধারণত বাংলাদেশের বাজারে ভালো মানের (যেমন: Walton, Vision, Miyako) ইনডাকশন এবং ইনফ্রারেড কুকারের দাম প্রায় কাছাকাছি (৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকার মধ্যে)। তবে ব্র্যান্ড ও ফিচারের ওপর ভিত্তি করে দাম কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: এই আর্টিকেলের তথ্যসমূহ বিভিন্ন স্বনামধন্য ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ডের ম্যানুয়াল, বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল এবং ব্যবহারকারীদের দীর্ঘমেয়াদী বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ডাবল চেক ও যাচাই করে লেখা হয়েছে।

Leave a Comment