রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। আর এই মাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ফজিলতপূর্ণ রাত হলো ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদর। আমাদের সমাজে অনেকেরই ধারণা ২৭ রমজানের রাতই হলো শবে কদর। কিন্তু পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আলোকে ২৭ রমজানই কি শবে কদর? নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে?
আপনি যদি শবে কদরের সঠিক সময়, এর ফজিলত এবং এই রাতে নবী কারীম (সা.)-এর আমল সম্পর্কে জানতে চান, তবে প্রখ্যাত আলেম মুফতি আব্দুল মালেকের আলোচনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা এই সম্পূর্ণ গাইডলাইনটি আপনার জন্য।
২৭ রমজানই কি নিশ্চিত শবে কদর? না, ২৭ রমজানই যে নিশ্চিত শবে কদর হবে, ইসলামে এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। মুফতি আব্দুল মালেকের মতে, শবে কদর রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বিজোড় রাতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯) হতে পারে। ২৭ রমজানে শবে কদর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকলেও, এটি প্রতি বছর পরিবর্তন হতে পারে। তাই শুধুমাত্র ২৭ রমজানের আশায় বসে না থেকে শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই ইবাদত করা উচিত।
২৭ রমজানকে কেন শবে কদর ভাবা হয়?
আমাদের সমাজে ২৭ রমজানের রাতকে ঘিরে শবে কদরের বিশাল আয়োজন দেখা যায়। কিন্তু হাদিস শরীফে শবে কদরকে একটি নির্দিষ্ট রাতে সীমাবদ্ধ করা হয়নি।
- পরিবর্তনশীল রাত: লাইলাতুল কদর একটি আসমানি বা ঊর্ধ্বজগতের বিষয়। প্রতি বছর এটি একই তারিখে হবে, এমনটা জরুরি নয়। বিভিন্ন আলামত থেকে বোঝা যায়, এটি পরিবর্তনশীল। এক রমজানে ২১ তারিখে হলে, অন্য রমজানে তা ২৫ বা ২৭ তারিখে হতে পারে।
- প্রবল সম্ভাবনা: আলেমদের মতে ২৭ রমজানে শবে কদর হওয়ার একটি প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।
আল্লাহ কেন শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ গোপন রাখলেন?
হাদিস শরীফে এসেছে, নবী কারীম (সা.) শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ জানানোর জন্য সাহাবীদের কাছে আসছিলেন। কিন্তু সে সময় দুজন ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত ছিলেন।
- এই ঝগড়ার কারণে আল্লাহ তায়ালা শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখের জ্ঞান (এলেম) উঠিয়ে নেন।
- এর মাধ্যমে উম্মতকে সতর্ক করা হয়েছে যে, ঝগড়া-বিবাদ বা কলহ আল্লাহর রহমত ও বরকত নষ্ট করে দেয়।
তবে এর পেছনে একটি বড় কল্যাণও নিহিত রয়েছে। নবী (সা.) বলেছেন, হয়তো এর মধ্যেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। কারণ তারিখ নির্দিষ্ট না থাকায় মুসলমানরা রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই শবে কদরের গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত করবে, ফলে তাদের সওয়াব ও ফায়দা অনেকগুণ বেড়ে যাবে।
শবে কদর পেতে আমাদের করণীয় আমল
মুফতি আব্দুল মালেক শবে কদরের বরকত ও কল্যাণ লাভের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট আমলের কথা বলেছেন:
১. ইতিকাফ করা
শবে কদর পাওয়ার সবচেয়ে সেরা উপায় হলো মসজিদে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইতিকাফ করা। যদি পুরো ১০ দিন ইতিকাফ করা সম্ভব না হয়, তবে বেশি বেশি নফল ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে সময় কাটানো উচিত।
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া
শবে কদরের ফজিলত পেতে হলে অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (বিশেষ করে মাগরিব, এশা এবং ফজর) মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। সারারাত নফল ইবাদত করে ফজরের নামাজ জামাতে না পড়া বা ঘুমিয়ে থাকা মোটেও উচিত নয়।
৩. গুনাহ ও অহেতুক কাজ থেকে বিরত থাকা
রমজান মাসে, বিশেষ করে শেষ দশকে অহেতুক, গুনাহ ও পাপ কাজ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। সিয়ামের হক আদায় করলেই আল্লাহ এই রাতের বরকত দান করবেন।
৪. নবী (সা.)-এর শেষ দশকের আমল অনুসরণ করা
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের শেষ দশক শুরু হলে নবী কারীম (সা.) ইবাদতের জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়তেন এবং চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়ে যেতেন।
- তিনি নিজে সারারাত জাগতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদতের জন্য জাগিয়ে দিতেন।
- অন্যান্য সময়ের তুলনায় শেষ দশকে তিনি তেলাওয়াত, তাহাজ্জুদ এবং জিকিরে বেশি মোজাহাদা (পরিশ্রম) করতেন।
৫. স্বাস্থ্য ও ডিউটি ঠিক রাখা
যদি কারও শারীরিক অসুস্থতা থাকে বা সকালে জরুরি ডিউটি থাকে, তবে তার জন্য সারারাত জাগা জরুরি নয়। সে কিছুটা সময় ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিয়ে তারপর ইবাদত করবে। ডিউটি বা ফরজ কাজ বাদ দিয়ে নফল ইবাদতে মগ্ন থাকার প্রয়োজন নেই।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: শবে কদর রমজানের কত তারিখে হয়?
উত্তর: শবে কদর রমজানের শেষ দশকের (২০ রমজানের পর থেকে) যেকোনো বিজোড় রাতে হতে পারে। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ রমজানের রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
প্রশ্ন: ২৭ রমজানে কি শবে কদর হয় না?
উত্তর: ২৭ রমজানে শবে কদর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি প্রতি বছর একই তারিখে হয় না, পরিবর্তনশীল। তাই শুধু ২৭ তারিখের আশায় না থেকে শেষ দশকের সব বিজোড় রাতেই ইবাদত করা উত্তম।
প্রশ্ন: শবে কদরের রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কী?
উত্তর: এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা। এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী তাহাজ্জুদ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির এবং ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা।
প্রশ্ন: সারারাত জেগে ইবাদত করে ফজরের নামাজ না পড়লে কি সওয়াব হবে?
উত্তর: না। ফরজ নামাজের গুরুত্ব নফল ইবাদতের চেয়ে অনেক বেশি। সারারাত নফল ইবাদত করে ফজরের ফরজ নামাজ জামাতে আদায় না করলে বা ঘুমিয়ে থাকলে শবে কদরের পূর্ণ হক আদায় হয় না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের শেষ দশকে ইবাদত করার এবং লাইলাতুল কদরের ফজিলত নসিব করুন। আমিন।
I’m Md Parvez Hossen. I’m professional Blogger and SEO expert. I’m Living in USA.