শিয়া-সুন্নি বিরোধ ভুলে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর ডাক: মুফতি তাকি উসমানী

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান করণীয় নিয়ে সারা বিশ্বেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ইরানের ওপর হামলার পর মুসলিম বিশ্বের বিভক্তি নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ এবং পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম, মুফতি মোহাম্মদ তাকি উসমানী এক যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী বক্তব্য প্রদান করেছেন।

আপনি যদি মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং শিয়া-সুন্নি ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনাকে একটি পরিষ্কার ধারণা দেবে।

করাচির দারুল উলুমে দেয়া এক বিশেষ বক্তব্যে মুফতি তাকি উসমানী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বর্তমান সময়টি শিয়া-সুন্নি মতবিরোধ উসকে দেওয়ার নয়, বরং আগ্রাসী পরাশক্তিগুলোর (আমেরিকা ও ইসরাইল) বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর সময়। তিনি বিশ্বনেতাদের এই আগ্রাসনকে “আন্তর্জাতিক গুন্ডামি” আখ্যা দিয়ে মুসলিম বিশ্বকে পারস্পরিক বিভেদ ভুলে কৌশলগত প্রজ্ঞা ও ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।

মুফতি তাকি উসমানীর ঐক্যের ডাক কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সম্প্রতি আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই শিয়া-সুন্নি আকিদাগত পার্থক্যের কারণে এই হামলার পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেন। ঠিক এই সময়ে পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুফতি তাকি উসমানী তার বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন:

১. শিয়া-সুন্নি বিরোধ বনাম মুসলিম উম্মাহর সংহতি

মুফতি উসমানী আক্ষেপ করে বলেন, কিছু মানুষ বলছে “তারা তো শিয়া ছিল, তাদের সাথে আমাদের মতভেদ আছে”। কিন্তু তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমেরিকা ও ইসরাইল খামেনিকে এজন্য হত্যা করেনি যে তিনি শিয়া ছিলেন; বরং তারা তার ওপর হামলা করেছে মুসলিম বিশ্বের একজন প্রভাবশালী প্রতিনিধি হিসেবে। তাই আকিদাগত মতভেদ থাকলেও একজন মুসলিম হিসেবে এই মুহূর্তে ইরানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা অপরিহার্য।

২. পরাশক্তির চক্রান্ত ও বৈশ্বিক গুন্ডামি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করে তিনি একে “বৈশ্বিক গুন্ডামি” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

  • যখন ইচ্ছা তখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবনে বোমাবর্ষণ করে তাকে হত্যা করা হচ্ছে।
  • জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন বা কোনো নৈতিকতার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
  • আলোচনার টেবিলে ইরান কিছু শর্ত মেনে নিলেও, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসঘাতকতা করে হঠাৎ আলোচনা ছেড়ে গিয়ে হামলা চালিয়েছে।
See also  বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্ণর কে?

৩. বিভাজনের রাজনীতি ও মুসলিমদের দুর্বলতা

মুফতি তাকি উসমানী সতর্ক করে বলেন, বাইরের শক্তিগুলো দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় মতপার্থক্যগুলোকে পুঁজি করে ষড়যন্ত্র করে আসছে। পরাশক্তিগুলোর কাছে কোনো রাষ্ট্র সুন্নি নাকি শিয়া—সেটি মূল বিবেচ্য নয়; তাদের আসল লক্ষ্য হলো সেই রাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্ব এবং ইসলামী বিশ্বে তার প্রভাব খর্ব করা।

মুসলিম উম্মাহর বর্তমান করণীয়

মুফতি তাকি উসমানীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে মুসলিম বিশ্ব ও সাধারণ মুসলমানদের জন্য যে রূপরেখা পাওয়া যায়:

  1. উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার: শিয়া-সুন্নি বিভেদ ছড়ায় এমন যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্য বা কিতাবী বিতর্ক এই মুহূর্তে পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি।
  2. রাজনৈতিক সংহতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা: তাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়ে এখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক সংহতি বেশি প্রয়োজন।
  3. পরোক্ষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকা: মুসলিমরা যখন একে অপরকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে, তখন তারা আসলে পরোক্ষভাবে পরাশক্তিগুলোর এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে, যারা মুসলিমদের বিভক্ত দেখতে চায়।
  4. ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ: ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিমরা যখনই ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, বাইরের কোনো শক্তিই তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি।
  5. আবেগের বদলে প্রজ্ঞা: বর্তমান অস্থির সময়ে নিছক আবেগ দিয়ে নয়, বরং কৌশলগত প্রজ্ঞা ও ধৈর্য ধারণ করে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন: মুফতি তাকি উসমানী কে?

উত্তর: মুফতি মোহাম্মদ তাকি উসমানী হলেন পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত, লেখক এবং পাকিস্তানের ফেডারেল শরীয়ত আদালতের সাবেক বিচারপতি। তিনি ইসলামী অর্থনীতি ও ফিকহ শাস্ত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

প্রশ্ন: ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় মুফতি তাকি উসমানীর অবস্থান কী?

উত্তর: তিনি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে আমেরিকা ও ইসরাইলের “বৈশ্বিক গুন্ডামি” ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তিনি শিয়া-সুন্নি মতভেদ ভুলে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

See also  ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বিএনপির ৭ নারী এমপির চমক

প্রশ্ন: আমেরিকা ও ইসরাইল কেন মুসলিম বিশ্বে বিভেদ তৈরি করতে চায়?

উত্তর: মুফতি তাকি উসমানীর মতে, পরাশক্তিগুলো মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল ও বিভক্ত দেখতে চায়। তারা অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় মতপার্থক্যকে পুঁজি করে মুসলিম দেশগুলোর কৌশলগত প্রভাব ও শক্তি খর্ব করতে চায়।

প্রশ্ন: বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মুসলমানদের করণীয় কী?

উত্তর: সাধারণ মুসলমানদের উচিত বিভেদমূলক ও উসকানিমূলক আলোচনা পরিহার করা, আবেগের বশবর্তী না হয়ে কৌশলগত প্রজ্ঞা অবলম্বন করা এবং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

Leave a Comment