সরকারি অর্থ ছাড়াই ১ কি.মি. রাস্তা! কুমিল্লার তরুণদের অবাক করা কীর্তি

সরকারি বরাদ্দের আশায় বসে না থেকে নিজেদের উদ্যোগে এবং অর্থায়নে গ্রামের চেহারা পাল্টে দিয়েছে একদল তরুণ। কুমিল্লার দেবীদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়নের চানপুর গ্রামে ঘটেছে এই অনন্য ঘটনা। প্রায় ৫০০ যুবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এক নান্দনিক সড়ক, যা এখন পুরো উপজেলার মডেল।

আজকের আর্টিকেলে আমরা জানাবো, কীভাবে সরকারি সাহায্য ছাড়াই এই অসাধ্য সাধন করল তরুণরা এবং তাদের এই উদ্যোগ থেকে আমাদের কী শেখার আছে।

তারুণ্যের শক্তিতে বদলে যাওয়া চানপুর গ্রাম

 

এক সময় চানপুর গ্রামের এই স্থানটি ছিল অবহেলিত। সেখানে একটি খাল ছিল, যার ওপর দিয়ে কৃষকদের যাতায়াত করতে হতো। কোনো রাস্তা বা বসার জায়গা না থাকায় কৃষিকাজ করতে গিয়ে কৃষকরা চরম ভোগান্তির শিকার হতেন।

২০১৪ সালের আগে এই রাস্তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু গ্রামের যুবসমাজ হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। তারা প্রমাণ করেছে, “ঐক্যই শক্তি, ঐক্যই মুক্তি।”

সমস্যা থেকে সমাধানের যাত্রা

 

ভিডিওর তথ্য এবং স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই মহৎ উদ্যোগের পেছনের গল্পটি বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক:

  • স্বেচ্ছাশ্রম ও অর্থায়ন: গ্রামের প্রায় ৫০০ যুবক নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে এবং কায়িক পরিশ্রম করে এই ১ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করে।

  • প্রকৃতির ছোঁয়া: শুধু রাস্তা তৈরি করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। রাস্তার দুই পাশে রোপণ করেছে অসংখ্য গাছ।

  • নান্দনিকতা: প্রতিটি গাছ রং করা হয়েছে এবং রাস্তায় স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৫০০ সড়কবাতি।

দ্রষ্টব্য: এই উদ্যোগটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে প্রশাসনিক অপেক্ষার চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার শক্তি অনেক বেশি।

এলাকাটি এখন ‘ভাইরাল’ পর্যটন কেন্দ্র

 

চানপুর গ্রামের এই রাস্তাটি এখন আর সাধারণ কোনো গ্রামীণ সড়ক নয়। এটি এখন দর্শনার্থীদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে আশেপাশের এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন।

কেন মানুষ এখানে ভিড় করছে?

  • রাস্তার দুই পাশের সারিবদ্ধ গাছ ও সবুজ পরিবেশ।

  • বসার জন্য সুন্দর জায়গা, যা আগে ছিল না।

  • পরিচ্ছন্ন ও মনোরম পরিবেশ যা ছবি তোলার জন্য আদর্শ।

ভিডিওতে একজন দর্শনার্থী বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জায়গাটি ভাইরাল হয়েছে দেখে আমি আমার বন্ধুকে নিয়ে এখানে ঘুরতে এসেছি। পরিবেশটা সত্যিই চমৎকার।”

অভিজ্ঞতার আলোকে

 

আমরা ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এই প্রজেক্টটি কেবল একটি রাস্তা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক বিপ্লব। ‘ভাতধর সংগঠন’ নামক স্থানীয় একটি যুব সংগঠনের নেতৃত্বে এই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।

এই উদ্যোগের বিশেষ দিকসমূহ: ১. কৃষকবান্ধব: কৃষকরা এখন কাজের ফাঁকে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারেন। ২. পরিবেশবান্ধব: প্রচুর গাছ লাগানোর ফলে এলাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে। ৩. মডেল প্রকল্প: উপজেলা প্রশাসন এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে এবং অন্য এলাকার জন্য এটিকে একটি মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

 

উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ফতেহাবাদ ইউনিয়নের এই রাস্তাটি পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তারা অভিভূত হন।

  • সরকারি আশ্বাস: ভবিষ্যতে এলাকাবাসী আবেদন করলে উপজেলা পরিষদ থেকে রাস্তাটির আরও উন্নয়নের জন্য সহায়তা প্রদান করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

  • দৃষ্টান্ত স্থাপন: এই সংগঠনকে অনুসরণ করে দেশের প্রতিটি যুবসমাজ এগিয়ে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

পরিশেষ

 

কুমিল্লার দেবীদ্বারের চানপুর গ্রামের তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে, সদিচ্ছা থাকলে সরকারি অনুদান ছাড়াও সমাজের উন্নয়ন সম্ভব। তাদের এই ১ কিলোমিটার রাস্তাটি এখন ঐক্যের প্রতীক। আপনার এলাকাতেও কি এমন কোনো সমস্যা আছে? অন্যের অপেক্ষায় না থেকে আজই সংঘবদ্ধ হোন, হয়তো আপনার হাত ধরেই বদলে যাবে আপনার গ্রামের চিত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top