মক ভোটিং কী? ইভিএমে ‘টেস্ট ভোট’ বা মহড়া কেন জরুরি?

নির্বাচন বা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ভোটারদের আস্থা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম (EVM) ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন থাকে। এই সংশয় দূর করার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো ‘মক ভোটিং’ (Mock Voting)

সহজ কথায়, এটি হলো আসল ভোটের আগে একটি “টেস্ট ভোট” বা “মহড়া”। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানবো মক ভোটিং আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি জানা আপনার জন্য কেন জরুরি।

মক ভোটিং বা মক পোল (Mock Poll) কী?

 

মক ভোটিং হলো নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। আসল ভোট শুরু হওয়ার আগে ভোটারদের ইভিএম মেশিনের সাথে পরিচিত করা এবং ভোটিং মেশিনগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করার জন্য এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।

“মক ভোটিং হলো নির্বাচনের মূল দিন বা তার আগে আয়োজিত একটি ‘ডামি ভোটিং’ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে প্রতিটি ভোট সঠিকভাবে রেকর্ড হচ্ছে এবং মেশিনে আগে থেকে কোনো ভোট জমা নেই।”

মক ভোটিং সাধারণত দুই ধরনের হয়:

 

১. জনসচেতনতামূলক মক ভোটিং: নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ভোটারদের ইভিএম ব্যবহার শেখানোর জন্য আয়োজন করা হয়।

২. নির্বাচনের দিনের মক পোল: ভোটের দিন সকালবেলায় পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে মেশিন চেকিং-এর জন্য করা হয়।

 

মক ভোটিং কেন করা হয়?

 

মক ভোটিং শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এর পেছনে বেশ কিছু টেকনিক্যাল এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। নিচে এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলো তুলে ধরা হলো:

  • স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: ইভিএম মেশিনে আগে থেকেই কোনো প্রার্থীর নামে ভোট জমা হয়ে আছে কি না, তা পোলিং এজেন্টদের সামনে প্রমাণ করা।

  • মেশিনের কার্যকারিতা যাচাই: প্রতিটি বোতাম (Button) এবং ব্যালট ইউনিট ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা।

  • ভোটারদের ভয় কাটানো: যারা প্রথমবার ইভিএমে ভোট দেবেন, তাদের জড়তা কাটাতে এবং পদ্ধতিটি হাতে-কলমে শিখিয়ে দিতে এটি সাহায্য করে।

  • ফলাফল যাচাই: মক ভোটে দেওয়া ভোটের সংখ্যার সাথে মেশিনের গণনাকৃত রেজাল্ট মিলছে কি না, তা তাৎক্ষণিক যাচাই করা হয়।

মক ভোটিং কীভাবে কাজ করে?

 

নির্বাচনের দিন সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর ঠিক আগে (সাধারণত সকাল ৭টা বা ৮টার দিকে) প্রিসাইডিং অফিসারের নেতৃত্বে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

১. মেশিন সেটআপ ও জিরো চেক

 

প্রথমে প্রিসাইডিং অফিসার সকল প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের সামনে ইভিএম মেশিনটি অন করেন এবং দেখান যে মেশিনে কোনো ভোট জমা নেই (Total Vote: 0)।

২. ডামি ভোট প্রদান

 

উপস্থিত পোলিং এজেন্ট এবং নির্বাচনী কর্মকর্তারা দৈবচয়নভাবে (Randomly) বিভিন্ন প্রার্থীর প্রতীকে ভোট দেন। সাধারণত প্রতিটি প্রতীকে অন্তত একটি করে ভোট দিয়ে বাটনগুলো চেক করা হয়।

বিশেষ নোট: নিয়ম অনুযায়ী মক পোলে কমপক্ষে ৫০টি ভোট কাস্ট করা হয় (এটি দেশের নিয়মভেদে ভিন্ন হতে পারে)।

৩. ফলাফল মিলিয়ে দেখা

 

ভোট দেওয়া শেষ হলে ‘Close’ বাটন চেপে মক পোল শেষ করা হয়। এরপর ‘Result’ বাটন চেপে দেখা হয়, যেই প্রতীকে যতগুলো ভোট দেওয়া হয়েছিল, মেশিন ঠিক সেই সংখ্যাই দেখাচ্ছে কি না।

৪. ক্লিয়ার বা ডিলিট

 

ফলাফল মিলে গেলে, আসল ভোট শুরুর আগে ‘Clear’ বাটন চেপে মক ভোটিংয়ের সমস্ত ডেটা মুছে ফেলা হয়। মেশিনটি আবার শূন্য (0) অবস্থায় আনা হয় এবং সিলগালা করে আসল ভোটের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

 

মক ভোটিং বনাম আসল ভোট: পার্থক্য কী?

 

পাঠকদের সুবিধার্থে নিচে একটি ছকের মাধ্যমে মূল পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বিষয় মক ভোটিং (Mock Voting) আসল ভোট (Real Voting)
উদ্দেশ্য মেশিন চেক করা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রতিনিধি নির্বাচন করা।
গণনা ফলাফলে এই ভোট যোগ হয় না। এই ভোটেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়।
রেকর্ড ভোট শেষে মুছে ফেলা (Delete) হয়। স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়।
অংশগ্রহণকারী পোলিং এজেন্ট ও কর্মকর্তারা। সাধারণ ভোটাররা।

নতুন ভোটারদের জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

 

আপনার এলাকায় যদি নির্বাচন কমিশন কোনো ‘মক ভোটিং মেলা’ বা প্রদর্শনীর আয়োজন করে, তবে সেখানে অংশগ্রহণ করা উচিত। কারণ:

  • বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন: আপনার আঙুলের ছাপ মিলছে কি না তা আগে থেকেই যাচাই করে নিতে পারবেন।

  • ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে: আসল ভোটের দিন তাড়াহুড়ো বা টেনশনে ভুল বোতাম চাপার ঝুঁকি থাকে না।

  • সময় বাঁচায়: প্রক্রিয়াটি জানা থাকলে ভোট দিতে আপনার মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

 

১. মক ভোটিং-এর ভোট কি আসল ফলাফলে যোগ হয়?

উত্তর: না, একদমই না। আসল ভোট শুরুর আগেই মক ভোটিংয়ের সমস্ত ডেটা এজেন্টদের সামনে মুছে (Clear) ফেলা হয়।

২. আমি কি মক ভোটিংয়ে অংশ নিতে পারব?

উত্তর: নির্বাচনের কয়েক দিন আগে জনসচেতনতার জন্য যে মক ভোটিং হয়, সেখানে সাধারণ জনগণ অংশ নিতে পারেন। তবে ভোটের দিন সকালে যে টেকনিক্যাল মক পোল হয়, তা শুধুমাত্র নির্বাচনী কর্মকর্তা ও এজেন্টদের জন্য।

৩. ইভিএম-এ মক ভোটিং কেন নিরাপদ?

উত্তর: কারণ এটি অফলাইন ব্যাটারি চালিত ডিভাইসে হয় এবং ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকে না, তাই হ্যাক করা বা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

শেষ কথা

 

গণতন্ত্রের চর্চায় প্রতিটি ভোটের মূল্য অপরিসীম। আর সেই ভোট যেন সঠিক জায়গায় পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই মক ভোটিং-এর ব্যবস্থা। প্রযুক্তি ভীতি দূর করে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যান এবং আপনার নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করুন।

আপনার জন্য পরবর্তী ধাপ: আপনার এলাকায় কবে মক ভোটিং প্রদর্শনী হচ্ছে তা জানতে নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা স্থানীয় নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top