নাসার আর্টেমিস-২ (Artemis II) মিশনের নভোচারীরা মহাকাশে ‘আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স’ (iPhone 17 Pro Max) ব্যবহার করে পৃথিবী ও চাঁদের বিস্ময়কর ছবি তুলেছেন। এর মধ্যে পৃথিবীর দিন-রাতের বিভাজন রেখা (Terminator line), রাতের উজ্জ্বল আলো এবং মহাকাশ থেকে সাইক্লোনের দৃশ্য উল্লেখযোগ্য। স্মার্টফোন ফটোগ্রাফির ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী মাইলফলক।
মহাকাশে ছবি তোলার কথা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নাসার বিশাল সব স্যাটেলাইট বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের কথা। কিন্তু কেমন হবে যদি পকেটে থাকা সাধারণ একটি স্মার্টফোন দিয়েই মহাকাশের অবিশ্বাস্য সব ছবি তোলা যায়?
ভাবুন তো, পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে ছুটে চলা কোনো মহাকাশযান থেকে শুধু একটি আইফোন দিয়ে পৃথিবীর এমন ছবি তোলা হলো, যা দেখে স্বয়ং বিজ্ঞানীরাও হতবাক! হ্যাঁ, ঠিক এমনই এক সায়েন্স ফিকশনের মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন আর্টেমিস-২ মিশনের সাহসী নভোচারীরা।
আপনি যদি মহাকাশপ্রেমী হয়ে থাকেন অথবা স্মার্টফোন ফটোগ্রাফি নিয়ে আপনার চরম আগ্রহ থাকে, তবে আজকের এই লেখাটি আপনার ভাবনার জগৎ বদলে দেবে।
চলুন, স্মার্টফোনের লেন্স দিয়ে মহাকাশের এই শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রা শুরু করা যাক!
আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের ম্যাজিক!
স্মার্টফোনের ক্যামেরা প্রযুক্তি যে কতটা উন্নত হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আর্টেমিস-২ মিশনের সাম্প্রতিক কিছু ছবি। সোশ্যাল মিডিয়ায় নাসার অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা বেশ কিছু ছবি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় চমকটি আসে যখন জানা যায়, পৃথিবীর দিন এবং রাতের পার্থক্য বোঝানো অসাধারণ সেই ছবিগুলো তোলা হয়েছে একটি ‘আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স’ (iPhone 17 Pro Max) দিয়ে!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
মহাকাশ থেকে তোলা সেই ঝকঝকে ছবি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই অবাক হয়েছেন। একজন মন্তব্য করেছেন, “এটি সর্বকালের সেরা ‘শট অন আইফোন’ (Shot on iPhone)!” সত্যিই তাই, অ্যাপলের এই ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসটি প্রমাণ করেছে যে, শুধু পৃথিবীতে নয়, পৃথিবীর বাইরে মহাশূন্যের চরম প্রতিকূল পরিবেশেও এর ক্যামেরা লেন্স অবিশ্বাস্যভাবে কাজ করতে সক্ষম। এটি স্মার্টফোনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘ফ্রি মার্কেটিং’ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
দিন-রাতের বিভাজন: পৃথিবীর ‘টার্মিনেটর রেখা’ দর্শন
নাসার শেয়ার করা ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে পৃথিবীর একটি বিশেষ ছবি। মহাকাশযান ‘ওরিয়ন’ (Orion Capsule) থেকে তোলা এই ছবিতে পৃথিবীর ঠিক মাঝখান দিয়ে একটি স্পষ্ট রেখা দেখা যায়।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘টার্মিনেটর লাইন’ (Terminator Line)।
- টার্মিনেটর লাইন কী? এটি মূলত পৃথিবীর সেই বিভাজন রেখা, যা দিন এবং রাতকে আলাদা করে।
ছবিটিতে পৃথিবীর একপাশে যখন সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে, ঠিক তখনই অন্যপাশে বিরাজ করছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অন্ধকারের সেই অংশটিও মানুষের তৈরি বৈদ্যুতিক আলোতে (Nighttime glow) জ্বলজ্বল করছিল।
শাটার স্পিডের জাদুতে পৃথিবীর রাতের রূপ
আর্টেমিস-২ মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman) দেখিয়েছেন কীভাবে শুধুমাত্র ক্যামেরার ‘শাটার স্পিড’ পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ছবি পাওয়া সম্ভব।
আপনিও যদি আপনার স্মার্টফোন দিয়ে রাতের আকাশে এমন চমৎকার ছবি তুলতে চান, তবে নিচের ৩টি ধাপ অনুসরণ করতে পারেন:
এক্সপোজার (Exposure) ও শাটার স্পিড সেটিং
প্রথমে আপনার ফোনের ক্যামেরার ‘Pro’ বা ‘Manual’ মোড চালু করুন। আইফোনের ক্ষেত্রে এক্সপোজার সেটিংসে যান।
শাটার স্পিড কমানো বা বাড়ানো
রিড ওয়াইজম্যান ঠিক কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি ছবি তোলেন। প্রথমটিতে তিনি দীর্ঘ শাটার স্পিড (Longer Shutter Speed) ব্যবহার করেন, ফলে পৃথিবী থেকে প্রচুর আলো লেন্সে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়টিতে তিনি সংক্ষিপ্ত শাটার স্পিড (Shorter Shutter Speed) ব্যবহার করেন।
রাতের গ্লো বা আলো ধারণ
শাটার স্পিড কমানোর ফলে পৃথিবীর রাতের বেলায় শহরগুলোর বৈদ্যুতিক আলোর যে আভা (Nighttime glow), তা ক্যামেরায় চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। অন্ধকারেও আলো ধারণ করার এই কৌশলটি অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির (Astrophotography) মূল চাবিকাঠি।
মহাকাশ থেকে সাইক্লোন মালিয়া ও চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠ
আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীদের তোলা ছবিগুলো শুধু সুন্দরই নয়, এগুলো বিজ্ঞানীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিচ্ছে।
মহাকাশ থেকে ঘূর্ণিঝড় পর্যবেক্ষণ
আবহাওয়াবিদ ক্রিস মার্টজ (Chris Martz) মহাকাশ থেকে তোলা একটি ছবি বিশ্লেষণ করে সলোমন সাগর (Solomon Sea), কুইন্সল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝামাঝি জায়গায় একটি বিশাল ঘূর্ণিঝড় বা ‘ট্রপিক্যাল সাইক্লোন মালিয়া’ (Tropical Cyclone Malia) শনাক্ত করেন। পৃথিবী থেকে হাজার মাইল দূরে বসে একটি স্মার্টফোনের ক্যামেরায় এত নিখুঁতভাবে একটি ঘূর্ণিঝড়ের মেঘের কুণ্ডলী ধারণ করাটা সত্যিই অভাবনীয়!
চাঁদের দূরবর্তী পৃষ্ঠ (The Far Side of the Moon)
আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের শুধু একটি দিকই দেখতে পাই। কিন্তু আর্টেমিস-২ এর ক্রুরা মানব ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে চাঁদের দূরবর্তী পৃষ্ঠ বা ‘ফার সাইড’ (Far side of the moon) নিজ চোখে দেখেছেন এবং ক্যামেরাবন্দি করেছেন। ছবিতে চাঁদের পরিচিত কালো দাগগুলোর (Dark splotches) পাশাপাশি এর অদেখা অংশের রহস্যময় গহ্বরগুলোও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
আর্টেমিস-২ এর নভোচারীদের মহাকাশের জীবন ও খাদ্যাভ্যাস
মহাকাশে ছবি তোলার পাশাপাশি নভোচারীদের দৈনন্দিন জীবনও খুব চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে ভিডিও এবং ছবিগুলোতে।
শূন্য মাধ্যাকর্ষণে খাবার (Space Food)
পৃথিবীর মতো মহাকাশে প্লেটে করে খাবার খাওয়ার কোনো উপায় নেই। শূন্য মাধ্যাকর্ষণে সব খাবারই প্লাস্টিক বা মেটালিক ব্যাগে (Metallic bags) সংরক্ষণ করা হয়।
কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনের (Jeremy Hansen) ডিনারের মেন্যুতে কী ছিল জানেন?
- চিকেন নুডলস স্যুপ (Chicken noodle soup)
- রোস্টেড টার্কি (Roasted turkey)
- ক্রিমি ম্যাক অ্যান্ড চিজ (Creamy mac and cheese)
- শ্রিম্প ককটেল (Shrimp cocktail)
এই খাবারগুলো সাধারণত ডিহাইড্রেটেড বা পানিশূন্য অবস্থায় থাকে। খাওয়ার আগে এর মধ্যে বিশেষ উপায়ে পানি মেশানো হয়। যেমন, শ্রিম্প ককটেলটিতে পানি মেশানোর পর চিংড়িগুলো সেই পানি শুষে নেয় এবং নভোচারীদের মতে এটি খেতে বেশ সুস্বাদু!
প্রথম চুলের বেণী ও রুটিন
মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ (Christina Koch) মহাকাশে তার ভেসে থাকা চুলের একটি দারুণ ছবি ইন্সটাগ্রামে শেয়ার করেন। ক্যাপশনে রসিকতা করে লেখেন, “পৃথিবীর কক্ষপথ ত্যাগ করা প্রথম চুলের বেণী (First braids to leave Earth orbit)!”
এছাড়া শূন্য মাধ্যাকর্ষণে স্লিপিং ব্যাগে দেয়ালের সাথে শরীর আটকে ঘুমানো থেকে শুরু করে ভেসে ভেসে দাঁড়ি শেভ করা— সবকিছুই তাদের নিত্যদিনের রুটিন। এমনকি ঘুম থেকে উঠে তারা জনপ্রিয় গান “পিং পনি ক্লাব” (Pink Pony Club) শুনে দিন শুরু করেন!
ফরাসি ভাষায় চাঁদের সাথে কথা!
এই মিশনে আরেকটি মজার ইতিহাস তৈরি হয়েছে। জেরেমি হ্যানসেন ইতিহাসের প্রথম কানাডিয়ান এবং প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে চাঁদের উদ্দেশ্যে ফরাসি ভাষায় (French) কথা বলেছেন।
তিনি মহাকাশযান থেকে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমরা এখানে যা করছি, তা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করার জন্য।” —
স্মার্টফোন অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞান এবং অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই দামি ডিএসএলআর (DSLR) বা টেলিস্কোপ না থাকায় হতাশ হন।
কিন্তু নাসার এই আর্টেমিস-২ মিশন প্রমাণ করল, ইচ্ছা এবং সঠিক কৌশল জানা থাকলে একটি ভালো মানের স্মার্টফোন দিয়েই চমৎকার ছবি তোলা সম্ভব।
- প্রো-টিপস: বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে আলোক দূষণ (Light Pollution) কম, যেমন— বান্দরবান, সেন্টমার্টিন বা তেঁতুলিয়া, সেখান থেকে স্মার্টফোনের ‘Night Mode’ বা ‘Pro Mode’ ব্যবহার করে দীর্ঘ এক্সপোজারে মিল্কিওয়ে বা গ্যালাক্সির চমৎকার ছবি তোলা সম্ভব।
সাধারণ মানুষের প্রশ্নসমূহ
প্রশ্ন ১: আইফোন দিয়ে মহাকাশে ছবি তোলা কি আসলেই সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। মহাকাশযানের ভেতরে এবং এর বিশেষ কাঁচের জানালার ভেতর দিয়ে স্মার্টফোনের ক্যামেরা চমৎকার কাজ করে। আর্টেমিস-২ এর ক্রুরা আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স ব্যবহার করে এর প্রমাণ দিয়েছেন।
প্রশ্ন ২: মহাকাশে আইফোনের শাটার স্পিড কীভাবে কাজ করে?
উত্তর: পৃথিবীর মতোই মহাকাশেও ম্যানুয়াল মোডে শাটার স্পিড নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শাটার স্পিড কমিয়ে ক্যামেরার লেন্সে বেশি আলো প্রবেশ করিয়ে পৃথিবীর রাতের বেলার উজ্জ্বল শহরের ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: আর্টেমিস-২ মিশনে কতজন নভোচারী রয়েছেন?
উত্তর: এই মিশনে মোট ৪ জন নভোচারী রয়েছেন— কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন।
প্রশ্ন ৪: মহাকাশ থেকে কি পৃথিবীর আবহাওয়া বোঝা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, মহাকাশ থেকে পৃথিবীর মেঘের গতিবিধি এবং ঘূর্ণিঝড় খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যেমন এই মিশনে ট্রপিক্যাল সাইক্লোন মালিয়া-র ছবি তোলা হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: চাঁদের ‘ফার সাইড’ বা অন্ধকার দিক কী?
উত্তর: পৃথিবী থেকে চাঁদের যে অংশটি কখনোই দেখা যায় না, তাকে চাঁদের ফার সাইড বা দূরবর্তী পৃষ্ঠ বলা হয়। আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই অংশটি নিজ চোখে দেখেছেন।
শেষকথা
“আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের ক্যামেরায় পৃথিবীর বাইরের ছবি”— এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত চমক নয়, এটি মানবজাতির অসীম সক্ষমতার একটি প্রতীক।
আর্টেমিস-২ মিশন আমাদের শিখিয়েছে যে, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধনে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। একটি সাধারণ স্মার্টফোন যে একদিন মহাকাশের গভীর অন্ধকারের বুক চিরে পৃথিবীর দিন-রাতের বিভাজন রেখা বা চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠের ছবি তুলবে, তা হয়তো কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল।
নাসার এই ঐতিহাসিক মিশন এবং নভোচারীদের কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
ভবিষ্যতে কি আমরা সাধারণ মানুষেরাও স্মার্টফোন হাতে মহাকাশ ভ্রমণে যেতে পারব? আর্টেমিস-২ মিশনের এই চমৎকার ছবিগুলো নিয়ে আপনার মতামত আমাদের কমেন্ট করে জানান।
তথ্যপ্রযুক্তি এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের এমন আরও রোমাঞ্চকর আপডেট পেতে আর্টিকেলটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং আমাদের সাথেই থাকুন!
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind Banglakathan.com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.”

