ভূমিকম্প থেকে বাঁচার ১০টি কার্যকরী উপায়

ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যার পূর্বাভাস দেওয়া বর্তমান বিজ্ঞানে এখনও সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ভূমিকম্পে যত মানুষ মারা যায়, তার চেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় আতঙ্কের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ায়।

আপনি কি জানেন, ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় বা সঠিক প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব? আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ভূমিকম্পের সময় আপনার ও আপনার পরিবারের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও আমাদের প্রস্তুতি

 

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে একটি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।

নিচে ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে করণীয়গুলো ভাগ করে দেওয়া হলো।

ভূমিকম্পের আগে প্রস্তুতি

 

ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর প্রস্তুতির সময় থাকে না। তাই আগে থেকেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

    • ইমার্জেন্সি কিট প্রস্তুত রাখুন: একটি ব্যাগে শুকনো খাবার, পানি, টর্চলাইট, ব্যাটারি, ফার্স্ট এইড বক্স এবং জরুরি নথিপত্র হাতের কাছে রাখুন।

    • আসবাবপত্র ফিক্সিং: ঘরের ভারী আলমারি, বুকশেলফ বা শোকেস দেয়ালের সাথে ভালোভাবে আটকে রাখুন, যাতে কম্পনে তা গায়ের ওপর না পড়ে।

    • নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করা: বাসার প্রতিটি রুমের কোন জায়গাটি সবচেয়ে নিরাপদ (যেমন শক্ত টেবিলের নিচে বা পিলারের কাছে), তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন।

Shutterstock

ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয়

 

ভূমিকম্প সাধারণত ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিটের মতো স্থায়ী হয়। এই অল্প সময়েই আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে “Drop, Cover, and Hold On” মেথডটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

যদি আপনি ঘরের ভেতরে থাকেন:

 

১. Drop (নিচু হন): কম্পন অনুভব করলেই সাথে সাথে মাটিতে বসে পড়ুন।

২. Cover (আড়াল নিন): একটি শক্ত টেবিল বা ডেস্খ এর নিচে আশ্রয় নিন। যদি টেবিল না থাকে, তবে হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রুমের কোনো কোণায় (Interior Corner) বসে পড়ুন।

৩. Hold On (ধরে রাখুন): কম্পন না থামা পর্যন্ত টেবিলের পায়া শক্ত করে ধরে রাখুন।

সতর্কতা: ভূমিকম্পের সময় কখনোই সিঁড়ি বা লিফট ব্যবহার করবেন না। এবং দৌড়াদৌড়ি করে ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না, এতে আহতের ঝুঁকি বাড়ে।

Getty Images

যদি আপনি বাইরে থাকেন:

 

  • খোলা জায়গায় চলে যান।

  • বড় বিল্ডিং, ইলেকট্রিক খুঁটি, গাছ বা বিলবোর্ড থেকে দূরে থাকুন।

  • মাথা রক্ষা করতে প্রয়োজনে ব্যাগ বা হাত ব্যবহার করুন।

যদি গাড়িতে থাকেন:

 

  • গাড়ি রাস্তার পাশে নিরাপদ স্থানে থামিয়ে দিন।

  • ফ্লাইওভার বা ব্রিজের ওপর গাড়ি থামাবেন না।

  • কম্পন থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করুন।

ভূমিকম্প থামার পর করণীয়

 

কম্পন থামলেই বিপদ শেষ নয়। এরপরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মানতে হয়।

  • আফটারশক (Aftershock) এর জন্য প্রস্তুত থাকুন: মূল ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট আরও কিছু কম্পন হতে পারে, যা দুর্বল বিল্ডিংয়ের জন্য বিপজ্জনক।

  • গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন চেক করুন: দিয়াশলাই বা আগুন জ্বালাবেন না। গ্যাসের গন্ধ পেলে দ্রুত মেইন সুইচ বন্ধ করে জানালা খুলে দিন।

  • রেডিও বা সোশ্যাল মিডিয়া মনিটর করুন: সরকারি নির্দেশনা বা আবহাওয়া বার্তার দিকে নজর রাখুন।

সাধারণ কিছু ভুল ধারণা

 

জনমনে ভূমিকম্প নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

ভুল ধারণা (Myth) সঠিক তথ্য (Fact)
দরজার চৌকাঠের নিচে দাঁড়ানো নিরাপদ। আধুনিক বাড়িগুলোতে দরজার চৌকাঠ খুব একটা মজবুত হয় না, তাই টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া বেশি নিরাপদ।
ভূমিকম্প হলে দৌড়ে বাইরে যাওয়া উচিত। দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়ে বা ওপর থেকে কিছু পড়ে আহত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
“ট্রায়াঙ্গেল অফ লাইফ” মেথড সেরা। রেড ক্রস এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে “Drop, Cover, and Hold On” মেথডটিই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ও পরীক্ষিত।

আপনার বাড়ি কি ভূমিকম্প সহনীয়?

 

ভূমিকম্প থেকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য আপনার ভবনটি বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি কিনা তা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিয়ে বিল্ডিংয়ের “Retrofitting” বা সংস্কার করিয়ে নিতে পারেন।

এক নজরে টিপস:

 

  • মাথার ওপর ভারী কোনো বস্তু রাখবেন না।

  • ঘুমানোর সময় বিছানার পাশে মোবাইল ও টর্চ রাখুন।

  • পরিবারের সবার সাথে একটি ‘মিটিং পয়েন্ট’ ঠিক করে রাখুন, যাতে দুর্যোগের পর সবাই সেখানে একত্রিত হতে পারেন।

উপসংহার

 

ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো মানসিক দৃঢ়তা। আতঙ্কিত না হয়ে উপরের নিয়মগুলো মেনে চললে আপনি নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন। মনে রাখবেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আটকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে।

আপনার পরিচিতদের সচেতন করতে এই আর্টিকেলটি শেয়ার করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top